ফুটবলাররা ছুটেন বিশ্বকাপের ট্রফির উদ্দেশ্যে। সাংবাদিকরা ছুটেন তাদের খবরের পেছনে। এবার বিশ্বকাপ কাভার করতে সাংবাদিকদের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। একে তো তিন দেশে বিশ্বকাপ এরপর আমেরিকায় এক ভেন্যু থেকে আরেক ভেন্যুর দুরত্ব অনেক।
বিশ্বকাপে সমর্থক ও দর্শকরা সাধারণত খেলার দিনই টিভিতে চোখ কিংবা স্টেডিয়ামে উপস্থিত হন। সাংবাদিকদের খেলার আগে সংবাদ সম্মেলন-অনুশীলন কাভার করতে হয়। সংবাদ সম্মেলন-অনুশীলন কাভারও ছিল বেশ ব্যয়বহুল। খেলার এক দিন আগে এসব আনুষ্ঠানিকতায় ফিফা মিডিয়া শাটল দিয়েছে তবে সেই শাটল ধরতে অনেককে অনেক সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। অনুশীলন ভেন্যু সাধারণত শহর ও স্টেডিয়াম এলাকা থেকে খানিকটা দূরে। ফলে সেটা কাভার করতে প্রায় শ'খানেক ডলারও খরচ হয়।
গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলো নির্ধারিত। নক আউটে ছিল নাটকীয়তা। কোন দলের খেলা কোন ভেন্যুতে কার সঙ্গে পড়বে। সেটা ছিল বড় অনিশ্চয়তায়। এক শহর থেকে আরেক শহরে যাওয়ার টিকিট কাটতে অপেক্ষা করতে হয়েছে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। ফলে চড়া দামে ফ্লাইটের টিকিট কাটতে হয়েছে। বিমানের টিকিট অনেক দাম হয়ে যাওয়ায় কিছু ক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে ১৭-১৮ ঘন্টা বাস ভ্রমণও করতে হয়েছে। সেই বাস ভাড়াও স্বাভাবিক সময়ের বিমান ভাড়ার কাছাকাছি।
নিউইয়র্ক আমেরিকার সবচেয়ে ব্যস্ত ও জনবহুল শহর৷ এই শহরে মেট্রো ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে আন্তঃযাতায়াতে কিছুটা সময় লাগলেও ১০-১২ ডলারে দিনের পরিবহন ব্যয় মেটানো সম্ভব। আটলান্টা, কানসাস, ডালাস শহরে গণপরিবহন খুব কম এবং দীর্ঘ বিরতিতে চলাচল করে। ফলে উবার বা গাড়ি ভাড়া ছাড়া কোনোভাবেই যাতায়াত সম্ভবপর নয়। যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
সাংবাদিকরা তাও মাঝে মধ্যে ফিফা ও স্বাগতিকদের শাটল ব্যবহার করেছে। দর্শকদের পয়সা যেমন গেছে তেমনি সুযোগ সুবিধাও ছিল কম৷ ম্যাচের দিন গাড়ি পার্কিং স্টিকার না থাকলে অনেক দূর পর্যন্ত হাঁটতে হয়েছে। খেলার আগে ও পরে মিলিয়ে ঘন্টা খানেকের মতো৷ আবার গাড়ি পার্কিংয়ের অনুমতি নিলে গুণতে হয়েছে কয়েকশ ডলার। ম্যাচ টিকিটের চড়া দাম তো রয়েছেই।

অনুশীলন-সংবাদ সম্মেলন কাভার করে দ্রুত সংবাদ পাঠানোর তাড়া থাকে মিডিয়ার। অনেক স্টেডিয়াম ও অনুশীলন ভেন্যুতে মিডিয়া সেন্টার খানিকটা দূরে। এতে সময়ক্ষেপণ হয়েছে কিছুটা আবার সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়েছে সংবাদ সম্মেলন শেষ হওয়ার এক ঘন্টার মধ্যে মিডিয়া সেন্টার ক্লোজড। একটি সংবাদ সম্মেলনে একাধিক প্রতিবেদন, নিউজ নিয়ে ভাবতেও সময় লাগে। এক ঘন্টার মধ্যে অনেক সময় সম্ভব না হওয়ায় কিছু নিউজ করে কিংবা অর্ধেক কাজ করেও মিডিয়া সেন্টার ছাড়তে হয়েছে।
সময়ের সাথেও যুদ্ধ হয়েছে অনেক। নিউইয়র্ক থেকে বাংলাদেশ দশ ঘন্টা এগিয়ে। কানসাস থেকে আবার ১১ ঘন্টা। অনেক ম্যাচ স্থানীয় সময় রাত আটটায় শুরু হয়ে দশটার পর শেষ হয়েছে। ম্যাচের পর সংবাদ সম্মেলন কাভারের পরিকল্পনা থাকলেও অনেক সময় স্টেডিয়াম থেকে আবাসস্থলের দূরত্ব বিবেচনায় বাদ দিতে হয়েছে। বিশেষ করে আর্জেন্টিনার খেলার আগের দিন স্থানীয় সময় রাত আটটায় সাধারণত সংবাদ সম্মেলন করত। আধ ঘন্টার বেশি সময় চলা সেই সম্মেলনের দুই একটি নিউজ করেই ফেরার তাড়া থাকত। বাংলাদেশে যখন নিউজের সবচেয়ে পিক আউয়ার তখন আমেরিকায় ভোর কিংবা সকাল। নিউজের জন্য সময় যুদ্ধের পাশাপাশি শরীর ও মনকে নতুন আবহাওয়া এবং পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিতেও সময় লেগেছে।
৪৮ দলের বিশ্বকাপ নিয়ে শুরুতে অনেক আলোচনা-সমালোচনা ছিল। কেপ ভার্দে, কুরাসাও যাদের নাম অনেক মানুষ শোনেননি। এদের পারফরম্যান্সে সবাই এখন চেনে। প্রতিদ্বন্দ্বিতার মানে এই বিশ্বকাপ ছাপিয়ে গেছে বিগত অনেক আসরকেই। বিশ্বকাপ মানেই ব্রাজিল-জার্মানি ফেভারিট। সেই তকমাও খানিকটা ধাক্কা খেয়েছে ব্যাপকভাবে। দুই হেভিওয়েট দল যথাক্রমে প্রি কোয়ার্টার ও রাউন্ড অফ ৩২ থেকে বাদ পড়েছে।
এই বিশ্বকাপে মেসি-এমবাপেদের পারফরম্যান্স ছাপিয়ে ছিল রেফারিং ও ভিএআর বিতর্ক। রেফারিং বরাবরই থ্যাংকসলেস জব। তবে এবারের বিশ্বকাপে গোল হওয়ার পরও শারীরিক ভারসাম্য হারিয়ে ফরোয়ার্ড ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে ফাউলে গোল বাতিল হয়েছে। আবার অতি সামান্য ট্যাকেলেও পেনাল্টির বাঁশি বেজেছে। যা টুর্নামেন্টে ছিল আলোচিত।
এজেড/এইচজেএস
