তরুণ ও অভিজ্ঞদের মিশেলে গড়া দল নিয়ে ১৬ বছর পর এবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে স্পেন। লামিনে ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামসের মতো তরুণ সেনসেশনরা অভিষেক আসর খেলতে নেমেই পরলেন বিশ্বসেরার মুকুট। অথচ আফ্রিকা মহাদেশ ছেড়ে এই দুই তারকার পরিবারের স্পেনে অভিবাসনের শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না।
বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে স্পেনের শিরোপা জয়ের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিনন্দনের বন্যা বয়ে যায়। তবে এর মাঝে নজর কেড়েছে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন নিকো উইলিয়ামসের বড় ভাই ইনিয়াকি উইলিয়ামস আর্থারের আবেগঘন বার্তা। ঘানায় বংশোদ্ভূত এই ফুটবলার তার ভাইকে মনে করিয়ে দিয়েছেন, শুধু বিশ্বকাপ জয়ই নয়, একজন আন্তর্জাতিক অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে ওঠাই নিকো উইলিয়ামসের সবচেয়ে বড় অর্জন।

নিজের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে ইনিয়াকি লেখেন, ‘ভাই, তুমি বিশ্বকাপ জিতেছ। ইতিহাস গড়েছ। কিন্তু ট্রফির চেয়েও বড় বিষয়– তুমি লাখো অভিবাসী পরিবারকে, আমাদের গর্বিত বাবা-মায়ের মতো মানুষদের, এই বিশ্বাস দিয়েছ যে একদিন তাদের সন্তানরাও তোমার মতো স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে। একইসঙ্গে লাখো স্প্যানিশ মানুষও আমাদের গল্পের সঙ্গে নিজেদের মিল খুঁজে পাবে।’
‘এটি শুধু আমাদের গল্প নয়, বরং তাদের সবার গল্প, যারা উন্নত ভবিষ্যতের আশায় সবকিছু ছেড়ে নতুন দেশে পাড়ি জমায়। তুমি সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দেখিয়ে দিয়েছ, কঠোর পরিশ্রম আর নিষ্ঠা থাকলে সবকিছুই সম্ভব। আজ পুরো বিশ্ব তোমাকে আরও ভালোভাবে চিনেছে, আর তুমি আমাদের নাম ইতিহাসে চিরদিনের জন্য লিখে দিয়েছ। আমি তোমাকে শ্রদ্ধা করি। আমি তোমাকে ভালোবাসি। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।’
নিকো উইলিয়ামসের পরিবারের সংগ্রাম
গত ১২ জুলাই বিশ্বকাপ চলাকালে ২৪ বছরে পা দেন নিকোলাস (নিকো) উইলিয়ামস। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠার পরও তার পরিবার হয়তো কখনো কল্পনা করেনি, স্পেনের নাভারা প্রদেশের পাম্পলোনায় জন্ম নেওয়া সেই ছেলেটিই একদিন ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ট্রফি উঁচিয়ে ধরবে। নিকো ও তার বড় ভাই ইনিয়াকি দুজনই স্পেনে জন্ম ও বেড়ে ওঠেন। তবে তাদের বাবা ফেলিক্স উইলিয়ামস এবং মা মারিয়া আর্থার ঘানার বাসিন্দা ছিলেন।

উন্নত জীবনের আশায় ১৯৯০ দশকের শুরুতে ইউরোপে পাড়ি জমান নিকো-ইনিয়াকির বাবা-মা। ইউরোপে পৌঁছাতে তাদের পায়ে হেঁটে সাহারা মরুভূমির বড় অংশ অতিক্রম করতে হয়। পর্যাপ্ত খাবার বা পানি ছাড়াই প্রচণ্ড গরমের মধ্যে তারা এই বিপজ্জনক যাত্রা সম্পন্ন করেন। বহু বছর পর দুই ভাই জানতে পারেন, তাদের মা তখন খালি পায়ে এবং অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় সেই যাত্রায় অংশ নিয়েছিলেন।
স্পেনের উত্তর আফ্রিকান শহর মেলিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের আটক করা হয়। পরে একজন আইনজীবীর সহায়তায় তারা রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেন। সে সময় ঘানায় চলমান গৃহযুদ্ধের কারণে আইনজীবী তাদের লাইবেরিয়ার নাগরিক পরিচয় দিতে পরামর্শ দেন। সে অনুসারে রাজনৈতিক সুরক্ষা পাওয়ার পর তাদের বিলবাওয়ে পাঠানো হয়। সেখানে ফাদার ইনিয়াকি মারদোনেস তাদের সহায়তা করেন। কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অংশ হিসেবে মারিয়া ও ফেলিক্স তাদের বড় ছেলের নাম রাখেন ‘ইনিয়াকি’।
যদিও পরিবার চালানোর মতো পর্যাপ্ত কাজ না পেয়ে ফেলিক্স পরে লন্ডনে চলে যান। সেখানে চেলসির একটি শপিং সেন্টারের ফুড কোর্টে টেবিল পরিষ্কার করার পাশাপাশি নিরাপত্তারক্ষীর কাজও করেন তিনি। এমনকি চেলসি স্টেডিয়ামের আশপাশেও ফেলিক্স দায়িত্ব পালন করেছেন। এদিকে, মা একসঙ্গে তিনটি কাজ করতেন, আর বাবা ইংল্যান্ড থেকে অর্থ পাঠাতেন। সেই সময় ছোট ভাই নিকোর দেখভালের দায়িত্ব অনেকটাই ছিল ইনিয়াকির কাঁধে।

এ প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে নিকো বলেছিলেন, ‘সে আমার আদর্শ, সে–ই আমার সবকিছু। বাবা-মা এবং আমাকে খাবার, স্কুলে যাওয়া ও পোশাকের ব্যবস্থা করতে সে সাহায্য করেছে। সে আমাকে ভুল ধরিয়ে দেয়, পরামর্শ দেয়, একই কাজ সবসময়ই করেছে। আমাদের বোঝাপড়া খুবই ভালো। সে শুধু আমার ভাই নয়, আমার কাছে বাবার মতো একজন মানুষ।’
কঠিন জীবনসংগ্রামের মাঝেও ফুটবলই হয়ে ওঠে দুই ভাইয়ের স্বপ্নপূরণের পথ। ২০২১ সালের ২৮ এপ্রিল অ্যাথলেটিক ক্লাব ও রিয়াল ভায়াদোলিদের ২-২ ড্র ম্যাচে বদলি হিসেবে একসঙ্গে মাঠে নেমে তারা ১৯৮৬ সালের পর বিলবাওয়ের হয়ে একই ম্যাচে খেলা প্রথম সহোদর জুটি হন। স্পেনে জন্ম হলেও অবশ্য ইনিয়াকি বেছে নেন বাবা-মায়ের শিকড় ঘানাকে আর নিকো স্পেনের হয়ে খেলে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।
দাদির পথ ধরে স্পেনে লামিনে ইয়ামালের পরিবার
বার্সেলোনার স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড লামিনে ইয়ামাল নাসরাউই এবানার জীবনও অভিবাসনের ইতিহাসে গড়া। তার বাবা মুনির নাসরাউই মরক্কোতে জন্মগ্রহণ করেন, আর মা শেইলা এবানা ইকুয়েটোরিয়াল গিনির বাসিন্দা। তবে তাদের পরিচয়ের আগেই পৃথকভাবে তাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল স্পেনে।
সবার আগে স্পেনে আসেন লামিনের দাদি ফাতিমা রোমানি নাসরাউই। লামিনের ভাষ্য অনুযায়ী, তার দাদি একাই মরক্কো ছেড়ে অনুমতি ছাড়াই একটি বাসে ওঠেন। বাসটি আলজেসিরাস ও গ্রানাডা হয়ে কাতালোনিয়ার মাতারো শহরে পৌঁছায়। সেখানে স্থায়ী হওয়ার পর দিন-রাত পরিশ্রম করে তিনি সন্তানদের স্পেনে নিয়ে আসার মতো অর্থ জোগাড় করেন। পরে লামিনের বাবা-মায়ের পরিচয় হয় এবং তারা বার্সেলোনার উপকণ্ঠে বসবাস শুরু করেন।

মুনির-এবানা দম্পতি ছেলে সন্তান আগমনের খবর জানার পর সিদ্ধান্ত নেন, জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে আর্থিক সহায়তা করা দুই ব্যক্তির নাম মিলিয়ে সন্তানের নাম রাখবেন ‘লামিনে ইয়ামাল’। শৈশবে বার্সেলোনার দরিদ্রতম দুটি এলাকা– গ্রানোলিয়ার্স ও রোকাফোন্দার রাস্তায় অনেকটা সময় কেটেছে ইয়ামালের। সেখানকার সিমেন্টের মাঠেই ফুটবলের হাতেখড়ি, যেখানে তার প্রতিভা নজরে পড়ে বার্সেলোনার কোচদের।
৬ বছর বয়সে তিনি বার্সেলোনার যুব একাডেমি ‘লা মাসিয়া’য় যোগ দেন। লিওনেল মেসি ও আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার মতো কিংবদন্তিদের পথ অনুসরণ করে সেখানেই ঘটে তার ফুটবলের বিকাশ। মাত্র ১৬ বছর ৫৭ দিন বয়সে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে স্পেন জাতীয় দলে অভিষেক ও গোল করে দেশটির ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হন ইয়ামাল। এক বছর পর জেতেন ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ। আর ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে স্পেনের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মাধ্যমে হয়েছেন বিশ্বসেরা দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।
এএইচএস
