বিশ্বকাপে যেমন তারকার জন্ম হয়, তেমনই তারকার পতনও হয়। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব আসর থেকেও বেশ কয়েকজন তারকা খেলোয়াড় সারাজীবনের জন্য বুট তুলে রাখলেন। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পরপরই।
নেইমার (ব্রাজিল, বয়স: ৩৮)
শেষ ষোলোতে নরওয়ের কাছে হারের পর ব্রাজিলের বিদায় নিশ্চিত হয়। তারপর নেইমার বলেন, ‘এখানে মেটলাইফে শুরু হয়েছিল, আর এখানেই শেষ করলাম। এবার সব শেষ।’
বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলা এই ব্রাজিলিয়ান তারকাকে বিশ্বকাপ ছাড়াই আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ করতে হলো। ব্রাজিলের সমর্থকদের কাছে রোনালদো বা পেলের সমপর্যায়ের প্রতীক হয়ে ওঠা নেইমারকে কোচ কার্লো আনচেলত্তি এই টুর্নামেন্টে খুব একটা খেলাননি। তবে ১৬ বছর আগে যে মাঠে ব্রাজিলের হয়ে তার অভিষেক হয়েছিল, সেই একই মাঠে নিজের শেষ ম্যাচে তিনি একটি গোল পান।
মানুয়েল ন্যয়ার (জার্মানি, বয়স: ৪০)
‘এমন তিক্ত সমাপ্তি সত্ত্বেও আমি এই সিদ্ধান্তে অনুশোচনা করি না।’ বলেছেন ন্যয়ার।
পাঁচটি বিশ্বকাপ খেলার পর জার্মানির এই বিখ্যাত গোলরক্ষক একটি বিশ্বকাপ ট্রফি (২০১৪) নিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেন। ২০২৪ ইউরো শেষেই তিনি অবসর নিয়েছিলেন, তবে ৪০ বছর বয়সে এই বিশ্বকাপের জন্য আবার ফেরত আসেন। প্যারাগুয়ের কাছে পেনাল্টি শুটআউটে জার্মানির বেদনাদায়ক হারের পর তিনি বিদায়ের ঘোষণা দেন।
গিলেরমো ওচোয়া (মেক্সিকো, বয়স: ৪১)
মেক্সিকো জাতীয় দলের ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘমেয়াদী এই ফুটবলার নিজ দেশের সমর্থকদের সামনে এস্তাদিও অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে শেষ ম্যাচ খেলার সুযোগ পান। মেক্সিকোর গ্রুপ পর্বের তৃতীয় ম্যাচে চেক রিপাবলিকের বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ের শেষ মুহূর্তে কোচ হাভিয়ের আগিরে তাকে আবেগপ্লুতভাবে মাঠে নামান। এর মাধ্যমেই ছয়টি বিশ্বকাপ খেলে ওচোয়া ফুটবল ক্যারিয়ারের ইতি টানেন।
প্যাট্রিক শিক (চেক রিপাবলিক, বয়স: ৩০)
‘আজ আমার জাতীয় দলের অধ্যায় শেষ হচ্ছে। প্রতিটি ম্যাচ, প্রতিটি গোল এবং গর্বের সাথে চেক রিপাবলিকের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ দেওয়ার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ,’ বললেন শিক।
২০২০ ইউরোতে দুর্দান্ত পারফর্ম করা শিক এই গ্রীষ্মে চেক রিপাবলিকের হয়ে বিশ্বকাপে আত্মপ্রকাশ করেন। তবে জয়হীনভাবে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেওয়া চেক রিপাবলিকের জন্য এটি ছিল হতাশাজনক। শেষ ম্যাচের পরেই ৩০ বছর বয়সী শিক জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন।
রিয়াদ মাহরেজ (আলজেরিয়া, বয়স: ৩৫)
‘ছোটবেলা থেকেই আলজেরিয়ার হয়ে খেলা আমার স্বপ্ন ছিল। দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করতে পারাটা ছিল আমার জন্য অনেক বড় সম্মান এবং গর্বের,’ বিদায়ের ঘোষণায় বলেন মাহরেজ।
সাবেক প্রিমিয়ার লিগ তারকা ও আলজেরিয়ার কিংবদন্তি মাহরেজ ২০১৪ সালে বিশ্বকাপে অভিষেক করেছিলেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর তিনি দেশকে আবারো বিশ্বকাপে নিয়ে আসেন এবং গ্রুপ পর্বে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে দুটি গোল করে আলজেরিয়াকে নকআউট পর্বে তুলতে সাহায্য করেন। রাউন্ড অফ ৩২-এ সুইজারল্যান্ডের কাছে ২-০ গোলে হেরে বিদায় নেওয়ার পর তিনি জাতীয় দলকে বিদায় জানান।
সাদিও মানে (সেনেগাল, বয়স: ৩৪)
‘জেনে রাখুন, আমি এই পতাকার জন্য আমার সবকিছু উৎসর্গ করেছি। আমি আমার সেরাটা দিয়েছি এবং সবসময় স্বদেশের জন্য লড়াই করেছি,’ অবসরের ঘোষণায় বলেন মানে।
সেনেগালের সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় সাদিও মানে বেলজিয়ামের কাছে শেষ ৩২ এ অন্তিম মুহূর্তের অতিরিক্ত সময়ের গোল খেয়ে হারের পর অবসরের ঘোষণা দেন। ২০১৮ সালে খেললেও ২০২২ সালে ইনজুরির কারণে খেলতে পারেননি তিনি। বিদায়বেলায় সেনেগালের সমর্থকদের প্রতি ধন্যবাদ ও ভালোবাসার বার্তা দেন এই মহাতারকা।
এনার ভ্যালেন্সিয়া (ইকুয়েডর, বয়স: ৩৬)
‘জাতীয় দলের হয়ে আমি আমার শেষ ম্যাচটি খেলে ফেলেছি,’ জাতীয় দলের জার্সি খুলে রাখতে গিয়ে বলেন ভ্যালেন্সিয়া।
২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপে ৬টি ম্যাচ খেলে ৬টি গোল করা ভ্যালেন্সিয়া এবার টুর্নামেন্টে কোনো গোল পাননি। শেষ ৩২-এ মেক্সিকোর কাছে হেরে বিদায় নেওয়ার পর ইকুয়েডরের এই অধিনায়ক নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানেন।
নিকোলাস ওতামেন্দি (আর্জেন্টিনা, বয়স: ৩৮)
‘এটি আমার শেষ বিশ্বকাপ, এরপর থেকে আমি একজন সাধারণ ভক্ত হয়ে দল সমর্থন করব,’ সদ্যই অবসর নিয়েছেন ওতামেন্দি।
২০২২ বিশ্বকাপজয়ী এই আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার একটানা ১৭ বছর জাতীয় দলের হয়ে খেলার পর অবসরের ঘোষণা দেন। মার্চ মাসেই বিশ্বকাপের পর অবসরের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন ৩৮ বছর বয়সী এই তারকা ডিফেন্ডার।

মার্কো আরনাউটোভিচ (অস্ট্রিয়া, বয়স: ৩৭)
‘অস্ট্রিয়ার হয়ে খেলাটাই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য। এখন থেকে আমি আর আমার এই দ্বিতীয় পরিবারকে দেখতে পাব না ভেবেই কষ্ট হচ্ছে,’ বলছিলেন আরনাউটোভিচ।
অস্ট্রিয়ার সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা এবং সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা আরনাউটোভিচ স্পেনের কাছে ৩-০ গোলে হেরে শেষ ৩২ থেকে বিদায় নেওয়ার পর এক আবেগঘন বার্তায় সমর্থকদের বিদায় জানান।
ক্রেগ গর্ডন (স্কটল্যান্ড, বয়স: ৪৩)
‘আমি কখনই চাইনি এটা শেষ হোক, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে শেষ করতেই হয়।’
৪৩ বছর বয়সী এই অভিজ্ঞ স্কটিশ গোলরক্ষক জাতীয় দলের পাশাপাশি পুরো পেশাদার ফুটবল ক্যারিয়ার থেকেই অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন। ২০০৪ সালে অভিষেকের ২২ বছর পর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানলেন তিনি।
জ্য-মিশেল সেরি (আইভরি কোস্ট, বয়স: ৩৫)
‘জাতীয় দলে ১১ বছর এবং একটি বিশ্বকাপ খেলার পর, আজ আমি আমার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি ঘোষণা করছি,’ বলরলেন সেরি।
দীর্ঘ ১১ বছর আইভরি কোস্ট জাতীয় দলকে সার্ভিস দেওয়ার পর এবং নিজের ৬৪তম ম্যাচে প্রথম বিশ্বকাপ খেলে নরওয়ের কাছে হেরে বিদায় নেওয়ার পরেই বিদায়ের সিদ্ধান্ত নেন সেরি।
এফএইচএম
