আধুনিক ফুটবলে একটি স্পষ্ট প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে— খেলোয়াড়রা তাদের বয়স ৩০-এর কোঠার শেষ দিকে গিয়েও দাপটের সঙ্গে খেলা চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রশিক্ষণ, স্পোর্টস মেডিসিন, পুষ্টি ও পুনর্বাসন পদ্ধতির উন্নতির বদৌলতে তারকা খেলোয়াড়দের ৩৫ বছর পার করা এখন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্প্যানিশ দৈনিক এএস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গেটাফের মেডিকেল সার্ভিসের পরিচালক ক্রিস্টোফার আইওলা এই পরিবর্তনের মূল কারণগুলো ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্য ও খাদ্যাভ্যাসে বাড়তি যত্ন নেওয়ার কথা বলেন, ‘খেলোয়াড়দের জন্য পুষ্টির বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে। আজকাল কোনো অতিরিক্ত ওজনের খেলোয়াড়কে মাঠে খেলতে দেখা প্রায় অসম্ভব।’
আইওলা আরও যোগ করেন, ‘পুরোনো দিনে ম্যারাডোনা কিন্তু পেশীবহুল শরীরের অধিকারী ছিলেন না, অথচ তিনিই ছিলেন বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়। অন্যদিকে আজকের একজন ফুটবলার মূলত একজন নিখুঁত অ্যাথলেট।’
ক্লাবগুলোর ভেতরের মেডিকেল সরঞ্জামের অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে। তিনি বললেন, ‘১৯৯৮ সালে আমি যখন গেটাফেতে যোগ দিই, তখন আমার সাথে মাত্র একজন মাসাজ প্রদানকারী ছিলেন এবং আমরা দুজন একসাথে যাতায়াত করতাম। আর আজ আমাদের মেডিকেল স্টাফেই রয়েছে ১৫ জন সদস্য।’

বর্তমানে এই পুরো ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ম্যাগনেসিয়াম ও ক্রিয়েটিনের মতো পরিপূরক উপাদান, যা কোনো ঘাটতি আছে কি না তা শনাক্ত করতে পর্যায়ক্রমিক পরীক্ষার মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হয়। এছাড়া থার্মাল ইমেজিংয়ের মাধ্যমে পেশীর ক্লান্তি এবং অক্সিডেশন মার্কার পরিমাপ করা হয়। ফিজিওথেরাপি ও রিকভারির মধ্যে রয়েছে ওয়েভ থেরাপি, ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স, প্রেশার চেম্বার, হাইড্রোথেরাপি, সাউনা ও জাকুজি।
আইওলা নিশ্চিত করেন যে, এসব পদ্ধতি অক্সিডেশন কমায়, অক্সিজেন সরবরাহ উন্নত করে এবং শরীরের ধকল কাটিয়ে উঠতে গতি আনে। এগুলো খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ার দীর্ঘায়িত করছে এবং প্রথম ও দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাবগুলোর ড্রেসিংরুমকে প্রায় এক একটি ‘পরীক্ষাগারে’ রূপান্তর করেছে।
একটি রেকর্ড পরিসংখ্যান
৩৫ বছরের সীমা পার করা তারকাদের তালিকার দিকে তাকালেই এই প্রবণতা পরিষ্কার বোঝা যায়। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো (৪১), লুকা মদ্রিচ (৪০), লিওনেল মেসি (৩৯), ইয়াগো আসপাস (৩৮), রবার্ট লেভানডফস্কি (৩৭) এবং কেভিন ডি ব্রুইনা (৩৫)।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপে রেকর্ড সংখ্যক আটজন খেলোয়াড় অংশগ্রহণ করেছেন যাদের বয়স ৪০ বা তার বেশি। ৪৩ বছর বয়সী স্কটিশ খেলোয়াড় ক্রেগ গর্ডন এই তালিকার শীর্ষে ছিলেন, যার সাথে যুক্ত ছিলেন রোনালদো, মদ্রিচ, মেক্সিকোর গিলের্মো ওচোয়া, জার্মানির ম্যানুয়েল ন্যয়ার, বসনিয়ার এদিন জেকো, কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনহা এবং উরুগুয়ের গোলরক্ষক ফের্নান্দো মুসলেরা।
তুলনা হিসেবে বলা যায়, ১৯৩০ থেকে ১৯৭৮ সালের মধ্যে বিশ্বকাপগুলোতে ৪০ বা তার বেশি বয়সী কোনো খেলোয়াড় অংশ নেননি।
তবে এর মাঝেও ইংলিশ খেলোয়াড় হোরেস হ্যারি লো এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত হয়ে আছেন। ১৯৩৫ সালে লা লিগায় রিয়াল সোসিয়েদাদের হয়ে ৪৮ বছর বয়সে তিনি একটি ম্যাচ খেলেছিলেন। কারণ দল মাত্র ১১ জন খেলোয়াড় নিয়ে সফর করেছিল এবং যাত্রা পথে তাদের একজন অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। এজন্য তাকে বাধ্যতামূলক মাঠে নামতে হয়েছিল।
স্প্যানিশ লিগে দীর্ঘ সময় খেলা সবচেয়ে বয়স্ক খেলোয়াড় হলেন হোয়াকিন সানচেজ। তিনি ৪১ বছর বয়সে তার শেষ ম্যাচগুলো খেলেছেন।

লা লিগায় ‘বুড়োদের’ দাপট
৪০ বছর বয়স পর্যন্ত খেলে যাওয়া স্প্যানিশ ফুটবলের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে রয়েছে। সান্তি কাজোরলা (৪১) এবং আদ্রিয়ান (৩৯) সম্প্রতি অবসর নিয়েছেন। যেখানে ৪১-এর কোঠায় পৌঁছাতে যাওয়া রাউল আলবিওল ইতালির ক্লাব পিসার হয়ে খেলা চালিয়ে যাচ্ছেন। পেপে রেইনা নন, বরং পিচু কুয়েলার (৪২) খেলছেন মায়োর্কার হয়ে, ক্রিশ্চিয়ান স্টুয়ানি (৩৯) জিরোনার হয়ে এবং গোলরক্ষক দিতুরো খেলছেন এলচের হয়ে।
হোসে লুইস মোরালেসও বর্তমানে কোনো ক্লাব না থাকা সত্ত্বেও অবসর নিতে নারাজ। আসপাস (৩৮) সেলতার সাথে চুক্তি নবায়ন করেছেন এবং হুয়ান কার্লোস (৩৮) ২০২৬-২০২৭ মৌসুমে জিরোনার হয়ে খেলা চালিয়ে যাবেন।
এফএইচএম
