বিশ্বকাপ ফাইনালে হতাশাজনক পারফরম্যান্স করে স্পেনের কাছে শিরোপা হারায় আর্জেন্টিনা। তারপর কোচ লিওনেল স্কালোনি খণ্ড খণ্ড অনুভূতি প্রকাশ করেছিলেন। কথা বলার সময় কাঁদতেও দেখা গেছে তাকে। কান্নার চোটে তো ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে কথাই বলতে পারেননি। সময় যত যাচ্ছে, সেই ব্যর্থতার ক্ষত শুকাতে শুরু করেছে। বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার এক সপ্তাহ পর নিজের আবেগ ঢেলে দিয়ে একটি খোলাচিঠি লিখলেন স্কালোনি।
বিশ্বকাপ শেষে দেশে ফিরে টানা কয়েকদিন ধরে জন্মস্থান পুখাতোয় ছিলেন স্কালোনি। স্থানীয় মানুষের অগাধ ভালোবাসা পাওয়ার পর তিনি তার সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি আবেগঘন চিঠি প্রকাশ করেছেন। নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে ও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে পাওয়া সমর্থনের জন্য সবাইকে ধন্যবাদ জানাতে চিঠিটি লেখেন তিনি, যা পোস্ট হওয়ার পর লাখ লাখ মানুষের প্রতিক্রিয়া ও সমর্থনমূলক বার্তা পেয়েছে।
শিরোপা জয়ের চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার হতাশাকে একটি বার্তায় তুলে ধরেন স্কালোনি। তার ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে পোস্ট করে তিনি লেখেন, ‘আমি দুঃখিত, আপনাদের জন্য আরেকটি কাপ নিয়ে আসতে পারলাম না।’ চিঠিতে সান্তা ফে-র এই অধিবাসী সেই ফাইনাল ম্যাচের পর তার মানসিক অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেন। তিনি লেখেন, ‘দুঃখ ও আনন্দ একসাথে মিশে গেছে, কান্না আর হাসি, যন্ত্রণা আর প্রশান্তি।’ এছাড়া তিনি দলের নিষ্ঠার প্রশংসা করেন এবং জানান যে স্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার সময় তিনি প্রায়শই তার খেলোয়াড়দের ‘আমার যোদ্ধারা’ বলে সম্বোধন করেন।
চিঠির অন্যতম একটি শক্তিশালী অংশ ছিল যারা টুর্নামেন্ট চলাকালে দলকে নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, তাদের উদ্দেশ্যে। তিনি এই সমালোচনার তীব্রতা বোঝাতে বড় হাতের অক্ষরে লেখেন, ‘বরফঠান্ডা জলের ধাক্কা সহ্য করা (যে মানুষেরা আমাদের চেনেও না)।’ কোচের মতে, এই প্রতিকূলতা কাটিয়ে ওঠার ক্ষমতাই হলো ‘আসল ট্রফি’।
‘একটি ঘটনাবহুল সপ্তাহের পর যেখানে বিষাদের সাথে আনন্দ, কান্নার সাথে হাসি, দুশ্চিন্তার সাথে স্বস্তি এবং উত্তেজনার সাথে প্রশান্তি মিশে গেছে, অবশেষে আমি কয়েকটি কথা লিখতে বসতে পারছি। আপনারা তো জানেনই যে আমি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুব একটা পছন্দ করি না। তবুও বার্তাটি আপনাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য এটিই হয়তো সেরা মাধ্যম।
আমার শুধু এটাই বলতে ইচ্ছা করছে—আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত যে আপনাদের জন্য আরেকটি ট্রফি নিয়ে আসতে পারিনি এবং এমন এক নতুন আনন্দ দিতে পারিনি, যা হয়তো কয়েকদিনের জন্য হলেও জীবনের সব কঠিন বাস্তবতাকে ভুলিয়ে দিত। তবে আমি চাই আপনারা সেই বিষয়গুলো মনে রাখুন, যা আমরা এই খেলোয়াড়দের দলের মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি—আমার ‘যোদ্ধারা’, যেভাবে আমি স্ত্রীর সাথে কথা বলার সময় ওদের পরিচয় দিতাম।
আমাদের প্রচেষ্টা, ইচ্ছা, তীব্র আকাঙ্ক্ষা, ‘আমি পারবো’ বিশ্বাস, সমস্ত প্রতিকূলতার মাঝেও হার না মানা মনোভাব, নিজের সবটুকু উজাড় করে দেওয়া (এমনকি যখন আর সামর্থ্য অবশিষ্ট থাকে না), অবমাননাকর মন্তব্য সহ্য করা (এমন মানুষের কাছ থেকে যারা আমাদের চেনেও না), শান্ত ও ধৈর্যশীল থাকা এবং যখন পা দুটো মস্তিষ্কের নির্দেশ মানতে চায় না তখনও সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা... এটাই তো আসল ট্রফি। আমার কোচিং স্টাফ, খেলোয়াড়রা, এএফএ-এর কর্মচারী যারা নীরবে কাজ করে গেছেন আমাদের সুবিধার্থে এবং আপনাদের প্রত্যেককে অশেষ ধন্যবাদ আমাদের এত ভালোবাসার দেওয়ার জন্য।
লিওনেল স্কালোনি পুনশ্চ: যার একজন আর্জেন্টাইন বন্ধু আছে, তার কাছে একটি রত্ন আছে।’
দলের দৈনন্দিন কাজের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অবদানের স্বীকৃতিও দিয়েছেন স্কালোনি। কোচ তার খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ এবং এএফএ-র সমস্ত কর্মীদের ধন্যবাদ জানান। একই সাথে যারা পর্দার অন্তরালে থেকে কাজ করে সহযোগিতা করেছেন, তাদের বিশেষ প্রশংসা করেন। চিঠিটি তিনি শেষ করেছেন ভাইরাল হওয়া আরেকটি বাক্য দিয়ে, ‘যার একজন আর্জেন্টাইন বন্ধু আছে, তার কাছে অমূল্য সম্পদ আছে।’
স্কালোনি পুখাতো ছাড়ার পরপরই পোস্টটি সামনে আসে। তাতে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে পুনরায় প্রশ্ন উঠেছে। যদিও তিনি বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের সাথে তার বর্তমান চুক্তির মেয়াদ ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে এবং তিনি তার পদে থাকবেন কি না তা এখনো নিশ্চিত করেননি। তবু এএফএ তাকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়ার পরিকল্পনা বহাল রেখেছে।
এফএইচএম
