নতুন কুঁড়ি ২০২৫-২৬ মৌসুমের সমাপনী হয়েছে গতকাল। যেখানে নারী ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে রংপুর অঞ্চল। এদিন আলাদা করে ফুটবলে ম্যাচে নজর কেড়েছেন এক ফুটবলার। ম্যাচের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দর্শকদের চোখ ছিল তার দিকে। একজন আদর্শ নাম্বার নাইনের মতোই যেন সারা মাঠজুড়ে খেলেছেন।
যখনই বল পায়ে সুযোগ পেয়েছেন তখনই গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন তিনি। নতুন কুঁড়ির বালিকা ফুটবলের ফাইনালে রংপুর অঞ্চলের ৯ নম্বর জার্সিধারী সেই ফুটবলারের নাম স্মৃতি কিসকো। সোমবার আর্মি স্টেডিয়ামে রাজশাহী অঞ্চলকে ৪-০ গোলে হারিয়ে শিরোপা জিতে নেয় রংপুর। দলের চার গোলের দুটি করেন এই কিশোরী।
পুরো টুর্নামেন্টে আট গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কারও জিতে নিয়েছেন কিসকো। কিন্তু ফুটবল মাঠের বাইরে এই খেলোয়াড়ের জীবন একেবারেই ভিন্ন। ছোট বয়সেই বাবাকে হারিয়েছেন স্মৃতি। ফলে সংসারের পুরো দায়িত্ব তার মায়ের কাঁধে। অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করেই কোনোভাবে সংসার চালান তিনি।
ম্যাচ শেষে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পরও নিজের সাফল্যের কথা বলতে গিয়ে খুব বেশি উচ্ছ্বাস দেখাননি স্মৃতি। তবে কণ্ঠে ছিল পরিশ্রমের তৃপ্তি। তিনি বলেন, ‘ভালো। চ্যাম্পিয়ন হয়েছি, ভালো খেলেছি। এখন ভালো লাগছে যে চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। রংপুর থেকে এতদূর এসেছি, চ্যাম্পিয়ন হয়েছি, খুব ভালো লাগছে।’
ফুটবলের সঙ্গে তার পরিচয়ও হয়েছে খুব ছোটবেলা থেকেই। রংপুরের একাডেমিতেই বেড়ে উঠেছেন তিনি। নতুন কুঁড়ি শুরু হওয়ার আগেও নিয়মিত অনুশীলন করতেন স্মৃতি, ‘শুরুটা আমার বাসার ওদিক দিয়ে। আমি একাডেমিতে থাকি। ওখানে প্র্যাকটিস করি, ওখানে থাকি, ওখানে সব করি। ওখানে প্র্যাকটিস ভালো হয়।’
পরিবারের সমর্থনের কথা বলতে গিয়ে স্মৃতি বলেন, ‘পরিবার থেকে অনেক ভালো সাপোর্ট দেয়। অনেক। আমার বাবা নেই। মা কৃষি কাজ করে। আমার মা কৃষিকাজ করেই চালায়। আমরাতো দুই বোন। আমার বড় দিদি আছে, বিয়ে হয়েছে। এখন তো স্বামীর বাড়ি থাকে। আমার মা থাকে বাড়িতে আর আমি তো একাডেমিতে থাকি। হ্যাঁ, সাপোর্ট দেয় আমার দিদি। আমার ভাই নেই। দিদি আর তার স্বামীর সাপোর্ট আমার জন্য বড় পাওয়া।’
পরে নিজ একাডেমির কোচদের নিয়ে স্মৃতি বলেন, ‘হ্যাঁ, আমার প্র্যাকটিস হয় ওরকমই। আমাদের শেখায় ওরকমই কোচ। আমরা ওভাবে শিখছি, ওভাবে আমরা খেলছি।’ দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়তে হয়েছে সঙ্গে কিসকোর সমাজের মানসিকতার সঙ্গেও লড়তে হয়েছে, 'হ্যাঁ, বলে যে মেয়ে মানুষ ফুটবল খেলা যায় না, ওটা করা যায় না, এটা করা যায় না। আমার মাও শোনে না মানুষের কথা, আমিও শুনি নাই। না শুনে তো এখানে আসছি।’
এত বড় সাফল্যের কথাও শুরুতে মাকে জানাতে পারেননি। পরে কোচের কাছ থেকে মোবাইল নিয়ে কল করেছেন, ‘মোবাইল না থাকায় মায়ের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলতে পারি না। অনেকদিন পরপর কথা হয়। আজকেও মাকে শুরুতে কল দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু নিজের তো আর মোবাইল নেই!’

পরে একাডেমির খরচের প্রসঙ্গে স্মৃতি বলেন, ‘একাডেমিতেই থাকি। আবাসিক ব্যবস্থা আছে। ওখানে আমাদের কোচ মিলন স্যার (মিলন মিয়া) খাওয়ায়। উনিই আমাদের সব দেখভাল করেন। ওনার কারণেই আজ এই পর্যন্ত আসতে পেরেছি।’
নিজে ভালো খেলে, চ্যাম্পিয়ন হয়েও ফাইনালে খেলতে না পারা সতীর্থকেও ভোলেননি কিসকো। মাথায় ৯ শেলাই নিয়েও খেলতে চেয়েছিলেন রংপুরের আরেক ফুটবলার অনন্যা। সতীর্থ অনন্যা থাকলে দল আরও ভালো খেলতে পারত বলে বিশ্বাস তার, ‘আরেকটু দরকার ছিল আমাদের ওই যে আমাদের একটা আপু অনন্যা, ও থাকলে আরও ভালো হইতো। ও না থাকায় আমাদের দল একটু দুর্বল ছিল। ও থাকলে আরও ভালো করতাম।’
এসএইচ/এফআই
