যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন এক বিতর্কে ক্ষোভে ফুঁসছে বিশ্ব ফুটবল। সদ্য সমাপ্ত ৪৮ দলের সর্ববৃহৎ বিশ্বকাপের সাফল্যের পরপরই নতুন একটি বাণিজ্যিক উদ্যোগের কথা সামনে এনেছে ফিফা। বিশ্বকাপের স্বত্ব এবার ব্যক্তিমালিকানাধীন সংস্থার কাছে বিক্রি করে দিতে চাচ্ছে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনো।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, ফিফা নিজেদের বৈশ্বিক ইভেন্ট ও বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ২০ বিলিয়ন (২ হাজার কোটি) ডলার মূল্যের একটি আলাদা প্রতিষ্ঠান গঠনের পরিকল্পনা করছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ (এফএফই)। এই মূল প্রতিষ্ঠানের ২০ শতাংশ শেয়ার প্রাইভেট বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে প্রাথমিক পর্যায়ে ৪.২ বিলিয়ন (৪২০ কোটি) ডলার তুলে নিতে চায় সংস্থাটি।
প্রস্তাবিত এই বাণিজ্যিক পরিকল্পনার নেতৃত্ব দিচ্ছে মার্কিন ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্ম ‘থ্রাইভ ইটারনাল’, যার প্রতিষ্ঠাতা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই জোশুয়া কুশনার। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস ও দ্য টাইমস প্রথম এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। দ্য টাইমস-এর দাবি, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনো ব্যক্তিগতভাবেও কয়েক কোটি পাউন্ডের আর্থিক সুবিধা পেতে পারেন।
কোন মডেলে হাঁটছে ফিফা?
ফিফার বিভিন্ন টুর্নামেন্ট থেকে কোটি কোটি ডলার আয় হয়, যার সিংহভাগই আসে সম্প্রচার স্বত্ব, স্পনসরশিপ ও অন্যান্য বাণিজ্যিক চুক্তি থেকে। এরপরও নতুন আরেকটি সংস্থা তৈরি করতে চায় ফিফা। বিশ্বকাপ ও ক্লাব বিশ্বকাপের মতো প্রতিযোগিতা পরিচালনা করা হবে ওই সংস্থার মাধ্যমে।
প্রস্তাবটি পাস হলে প্রতিটি সদস্য দেশ এককালীন দুই কোটি ডলারসহ চার বছর মেয়াদি চক্রে মোট চার কোটি ডলার (প্রায় ৫০০ কোটি টাকা) পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা পাবে। আর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে সহায়তার পরিমাণ কমে দাঁড়াবে মাত্র এক কোটি ডলারে।

তবে পরিকল্পনাটি কার্যকর করতে হলে প্রথমে ফিফার ৩৮ সদস্যের কাউন্সিল এবং ২১১টি সদস্য এসোসিয়েশনের সংখ্যাগরিষ্ঠের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। ফিফা জানিয়েছে, খুব শিগগিরই কাউন্সিলের সামনে প্রস্তাবটি উপস্থাপন করা হবে।
ফিফা বলেছে, এফএফই গঠিত হলেও সংস্থাটি এর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছেই রাখবে। পাশাপাশি ফুটবলের পরিচালনা, প্রতিযোগিতা, ম্যাচ সূচি এবং সব ধরনের নিয়ন্ত্রক ও ক্রীড়াসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার একচ্ছত্র ক্ষমতাও ফিফার হাতেই থাকবে।
প্রস্তাবটি পাস হলে প্রতিটি সদস্য দেশ এককালীন দুই কোটি ডলারসহ চার বছর মেয়াদি চক্রে মোট চার কোটি ডলার (প্রায় ৫০০ কোটি টাকা) পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা পাবে। আর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে সহায়তার পরিমাণ কমে দাঁড়াবে মাত্র এক কোটি ডলারে।
সংস্থাটির দাবি, এফএফইর প্রাথমিক ইকুইটি মূল্যায়ন হবে ২০ বিলিয়ন ডলার। ফিফা আরও জানিয়েছে, তাদের প্রতিটি সদস্য এসোসিয়েশনকে এককালীন ২ কোটি ডলারের অংশীদারিত্ব কেনার সুযোগ দেওয়া হবে। যদিও এটি মোট মালিকানার মাত্র ০.১ শতাংশ, তবুও ফিফার ছোট বা অপেক্ষাকৃত দরিদ্র সদস্য দেশগুলোর জন্য এটি একটি বড় অঙ্কের বিনিয়োগের সুযোগ।
গত জুনে, বিশ্বকাপ শুরুর আগে ফিফা জানিয়েছিল, ২০২৬ সালের জন্য তাদের আয় ৭ বিলিয়ন ইউরো ছাড়িয়ে নতুন রেকর্ড গড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। এবারই প্রথম ৪৮ দল নিয়ে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইতোমধ্যে ভবিষ্যতে টুর্নামেন্টটি ৬৪ দলে উন্নীত করার বিষয়েও আলোচনা চলছে।
আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, এটি অনেকটাই ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলের মতো, এখন বহু খেলাধুলা যেদিকে ঝুঁকে পড়েছে। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের জনপ্রিয় আসর ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগকে (আইপিএল) এক্ষেত্রে মডেল বলা যায়, যারা শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছে। ২০০৮ সালে যাত্রা শুরু করা আইপিএলের বাজারমূল্য চলতি বছরে ১১ শতাংশের বেশি বেড়ে ২০.৬ বিলিয়ন (২ হাজার ৬০ কোটি) ডলারে পৌঁছেছে। তবে প্রতিযোগিতাটির দলগুলোর মালিকানায় রয়েছেন সংখ্যাগরিষ্ঠ বিনিয়োগকারীরা (মেজরিটি ইনভেস্টর), ফলে প্রতিযোগিতাটি কীভাবে পরিচালিত হবে সে ব্যাপারে তাদের উল্লেখযোগ্য প্রভাব থাকে।
অন্যদিকে, অন্যান্য মডেল—যেমন আইপিএলের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে গড়া ইংল্যান্ড ও ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ডের (ইসিবি) ‘দ্য হান্ড্রেড’—দলগুলোর মালিকানা (মাইনরিটি ওনারশিপ) বিক্রি করেছে। এর ফলে, টুর্নামেন্টের মূল নিয়ন্ত্রণ ইসিবির হাতেই রয়ে গেছে। ফিফাও ঠিক একই প্রস্তাব দিচ্ছে—বিশ্বকাপ ও এর ইভেন্টগুলোর যে অংশ তারা ব্যক্তিগতভাবে বিক্রি করতে চায়, সেখানে তারা এই মডেলই অনুসরণ করবে। তা সত্ত্বেও, শেয়ার তো শেয়ারই। ক্রিকেটের ‘দ্য হান্ড্রেড’ কিংবা ফিফা বিশ্বকাপ—যেখানেই হোক না কেন, নতুন বিনিয়োগকারীরা কোটি কোটি টাকা ঢাললে অন্তত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের মতামত শুনতেই হবে, এমনটাই আশা করবে তারা।
ফিফার ডেডলাইন ও উয়েফার হুঁশিয়ারি
ফিফার ২১১টি সদস্য দেশকে আগামী ১৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে স্বাক্ষর করার সময়সীমা বেধে দেওয়া হয়েছে। যে দেশগুলো রাজি হবে, তারা ২০ মিলিয়ন (২ কোটি) ডলারের এককালীন অনুদান পাবে। আর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে সহায়তার পরিমাণ কমে দাঁড়াবে মাত্র এক কোটি ডলারে।
এদিকে, ফিফার এই পরিকল্পনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে তীব্র প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। ফিফা যদি বিশ্বকাপের মালিকানা বেসরকারি সংস্থাকে বিক্রি করে, তাহলে পরের বিশ্বকাপ বয়কট করতে পারে উয়েফা। ইতোমধ্যে ৫৫টি সদস্য দেশের ফুটবল সংস্থার সঙ্গে জরুরি বৈঠক ডেকেছে উয়েফা। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, বিশ্বজয়ী স্পেন বা ফ্রান্স, জার্মানি, ইংল্যান্ডের মতো বড় দলগুলোকে কি পরের বিশ্বকাপে দেখা যাবে না?
ঘটনাচক্রে পরের বার স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কোয় হবে বিশ্বকাপ। তিন আয়োজক দেশের মধ্যে দু’টিই ইউরোপের। তারা যদি বিশ্বকাপ বয়কট করে তাহলে তাদের দেশে প্রতিযোগিতা হবে কীভাবে? ফলে সব মিলিয়ে এক জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

ফিফার পরিকল্পনা জানার পর যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামও মন্তব্য করে ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন, ‘ফুটবল বিনিয়োগকারীদের সম্পত্তি নয়।’ পাশাপাশি উয়েফা একটি বিবৃতিতে বলেছে, ‘ফিফা এমন একটা সীমারেখা পার করতে চাইছে, যেটা করা উচিত নয়। উয়েফা খুব গুরুত্ব গিয়ে বিষয়টা দেখছে। প্রত্যেক ফুটবল সংস্থার এটাই করা উচিত। প্রতিটা লিগ, ক্লাব, ফুটবলার, সমর্থক, যারাই ফুটবলের উন্নতি চায়, তাদের উচিত এগিয়ে আসা।’
উয়েফা তাদের বিবৃতিতে আরও বলেছে, ‘ফুটবলের আত্মা বিক্রি করা যায় না। আমরা কেউ ফুটবলের মালিক নই। ফুটবল ফিফার সম্পত্তি নয়। ওরা কিছুই বিক্রি করতে পারবে না।’ উয়েফার কথা থেকে পরিষ্কার, ফিফা কোনও সিদ্ধান্ত নিলে বিশ্বফুটবলের ছবিটাই বদলে যেতে পারে।
প্রসঙ্গত, ফিফার ২১১ সদস্যের মধ্যে ইউরোপের দেশের সংখ্যা ৫৫টি। ইউরোপের দেশগুলো যদি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে অনড় থাকে, তবে তারা ফিফার সব টুর্নামেন্ট ‘বয়কট’ করার মতো কঠোর পদক্ষেপও নিতে পারে। উল্লেখ্য, শেষ আটটি বিশ্বকাপের ছয়টিই জিতেছে ইউরোপীয় দলগুলো। লাতিন আমেরিকার বাইরে গত ৭৬ বছরে অন্য কোনো মহাদেশের দল বিশ্বকাপ জয়ে সাফল্য পায়নি। ফলে ইউয়েফা যদি টুর্নামেন্ট বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়, তবে ইনফান্তিনোর ২০ বিলিয়ন ডলারের স্বপ্ন বড় ধরণের সংকটের মুখে পড়বে।
২০২৬ বিশ্বকাপে টিকিটের আকাশচুম্বী মূল্য এবং ম্যাচ চলাকালীন অতিরিক্ত ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ দিয়ে বাণিজ্য করার যে অভিযোগ ফিফার বিরুদ্ধে উঠেছিল, বিশ্বকাপের স্বত্ব বিক্রির এই পদক্ষেপে তা আরও চরম রূপ নিল। ফুটবল কি আসলেই কোটিপতিদের ব্যবসায়িক পণ্যে পরিণত হতে যাচ্ছে—এখন সেটিই দেখার অপেক্ষা।
মুখ খুললেন ফিফা সভাপতি
ফুটবলের নতুন বাণিজ্যিক মডেলের প্রস্তাব নিয়ে মুখ খুলেছেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনো। বিষয়টিকে তিনি একটি ‘সুযোগ’ হিসেবে উল্লেখ করলেও এতে যুক্ত হওয়া বাধ্যতামূলক নয় বলে জানিয়েছেন।

বুধবার এক ভিডিও বার্তায় নিজের ভাবনার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন ফিফা সভাপতি। ইনফ্যান্তিনো বলেন, ফুটবলের যে খাতগুলোয় সবচেয়ে বেশি অর্থ প্রয়োজন, সেগুলোতে বর্তমানে বাণিজ্যিক আয়ের খুব সামান্য অংশই পৌঁছায়। আরও বলেন, ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ বা এফএফই মূলত একটি প্রস্তাব বা আহ্বান। এটি একটি গণতান্ত্রিক আলোচনার প্রক্রিয়ার অংশ। সর্বোপরি এটি একটি সুযোগ, কোনো বাধ্যবাধকতা নয়।’
এফআই
