গতকাল (বৃহস্পতিবার) যেন এক বোমা ফাটাল ইউরোপের ফুটবল সংস্থা উয়েফা। বিশ্বকাপসহ বড় টুর্নামেন্টে ফিফার বেসরকারি বিনিয়োগ আনার পরিকল্পনায় তারা বলেছে, ‘উয়েফা ও তার সহযোগী অ্যাসোসিয়েশনগুলো ফিফা প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে না।’
ফিফা ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (এফএফই)’ নামে ২ হাজার কোটি ডলার মূল্যের একটি নতুন প্রতিষ্ঠান গঠনের পরিকল্পনা ঘোষণা করে। প্রস্তাব অনুযায়ী, এই প্রতিষ্ঠানের ২০ শতাংশ শেয়ার বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করা হবে। ফিফার ২১১ সদস্যদেশের ভোটে আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর এই প্রস্তাবের ভাগ্য নির্ধারণ হবে। কেউই নিশ্চিত হতে পারছেন না, এখন ঠিক কী ঘটতে চলেছে। আর ইনফান্তিনোর ভবিষ্যৎই বা কী, সেটাও কেউ জানেন না। উয়েফার বিবৃতির পর কনকাকাফ আরেকটি বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে যে তাদের ৪১টি সদস্য দেশই এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।
অথচ এটি কেবল ফিফার একার বিতর্ক নয়। ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ার ডেবি হিউইট ফিফার একজন সহসভাপতি। বৃহস্পতিবার উয়েফার জরুরি বৈঠকে তিনি এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। এফএ জানিয়েছে, তারা এই ইস্যুতে তাদের ‘ইউরোপীয় সহকর্মীদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছে।’
স্কটিশ এফএর সভাপতি মাইক মুলরানি ফিফার অর্থ কমিটিরও প্রধান। স্কটিশ এফএর দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তাদের সংস্থা উয়েফার অবস্থানের সঙ্গে ‘একবাক্যে একমত’। যারা মুখ খুলেছেন, তাদের ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়া থেকেই প্রকাশ পাচ্ছে যে ইনফান্তিনোর এই পরিকল্পনার পাশাপাশি তার পক্ষ থেকে কোনো ধরনের উপযুক্ত আলোচনা ও পরামর্শের অভাব, এমনকি ফিফা সহকর্মীদের সঙ্গেও আলাপ না করা নিয়ে চরম ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। উয়েফার জরুরি বৈঠকের পরিবেশ কেমন ছিল জানতে চাওয়া হলে এক সূত্র এক কথায় উত্তর দেন— ‘ক্ষোভ।’
২০১৬ সালে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের সভাপতি শেখ সালমান আল-খলিফাকে ১১৫-৮৮ ভোটে হারিয়ে ফিফা সভাপতি হন ইনফান্তিনো। আগামী মার্চে তার চতুর্থ মেয়াদের জন্য নির্বাচনে দাঁড়ানোর কথা রয়েছে। চলতি সপ্তাহের আগে পর্যন্ত ধারণা করা হচ্ছিল যে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পুনরায় নির্বাচিত হবেন। ইউরোপের কয়েকটিসহ বিশ্বজুড়ে একাধিক ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ৫৬ বছর বয়সী এই সংগঠককে সমর্থনের বিষয়টি ইতিমধ্যে নিশ্চিত করেছিল।
তবে সূত্রগুলোর মতে, ইনফান্তিনোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পাশাপাশি কনকাকাফের অধিকাংশ সদস্যই ফিফা সভাপতির ফুটবল পরিচালনার যোগ্যতার ওপর থেকে বিশ্বাস হারাচ্ছেন। হয়তো ইতিমধ্যেই তা হারিয়ে ফেলেছেন। এখন তার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য কাউকে খুঁজে বের করার আলোচনা চলছে।
এ ক্ষেত্রে নাসের আল-খেলাইফির নাম এসেছে। বিষয়টি বোঝা কঠিন নয়। কাতারি আল-খেলাইফি ইতিমধ্যেই ফুটবলের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। কেবল টানা দুই বারের চ্যাম্পিয়নস লিগ বিজয়ী প্যারিস সেন্ট জার্মেইর সভাপতি হওয়ার কারণেই নয়, ইউরোপীয় ক্লাবগুলোর নেতৃত্বের কারণেও।
পূর্বে এটি ‘ইউরোপিয়ান ক্লাবস অ্যাসোসিয়েশন’ নামে পরিচিত ছিল। ২০২১ সালে ইউরোপীয় সুপার লিগ ভেস্তে যাওয়ার ঠিক পর যে ঘটনা ফুটবলের ভিত্তি কাঁপিয়ে দিয়েছিল, আল-খেলাইফি এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন। আল-খেলাইফির আমলেই এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘ইউরোপিয়ান ফুটবল ক্লাবস’। আরও বড় বিষয় হলো, তিনি এর সদস্যসংখ্যা ৮০০-র বেশিতে উন্নীত করেছেন। বড় ক্লাবগুলোর মধ্যে কেবল রিয়াল মাদ্রিদই এর বাইরে রয়েছে।
তাত্ত্বিকভাবে ইনফান্তিনোকে চ্যালেঞ্জ জানানোর জন্য তিনিই সেরা ব্যক্তি হতে পারতেন। কিন্তু তিনি নিজে তা চান না। বৃহস্পতিবার বিষয়টি নিয়ে জানতে চাওয়া হলে ৫২ বছর বয়সী আল-খেলাইফির ঘনিষ্ঠ এক সূত্র জানান, ‘তিনি সত্যি, সত্যি, সত্যি এই পদটি চান না।’
ঐতিহাসিকভাবে ফিফায় দায়িত্বে থাকা বর্তমান সভাপতির বিরুদ্ধে সাধারণত কেউ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন না। নির্বাচনে হেরে যাওয়া শেষ ফিফা সভাপতি ছিলেন ইংল্যান্ডের স্যার স্ট্যানলি রৌস। তিনি ১৯৭৪ সালে ব্রাজিলের জোয়াও হাভেলাঞ্জের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। ইনফান্তিনো তার পদে টিকে থাকবেন কি না জানতে চাইলে উয়েফা সহসভাপতি লরা ম্যাকঅ্যালিস্টার বলেন, ‘সত্যি বলতে, আমি জানি না।’
বিবিসি স্পোর্টসের পক্ষ থেকে একই প্রশ্ন করা হয়েছিল সাবেক এফএ চেয়ারম্যান ডেভিড বার্নস্টাইনকেও। তিনি বলেন, ‘একটি সাধারণ প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের বিশাল মাপের কোনো ঘটনার পর কাউকে যদি নতি স্বীকার করতে হয়, তবে সম্ভবত তাকে পদত্যাগ করতেই হতো। তবে ফিফা কোনো সাধারণ প্রতিষ্ঠান নয়। যদি তার পেছনে পর্যাপ্তসংখ্যক জাতীয় অ্যাসোসিয়েশনের সমর্থন থাকে, তবে তিনি টিকে যাবেন।’
উয়েফার সাবেক প্রধান নির্বাহী লার্স-ক্রিস্টার ওলসন বিবিসিকে বলেছেন, ইনফান্তিনো অতিরিক্ত ঝুঁকি নিয়ে ফেলেছেন এবং এখন তার পদ ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তিনি পরামর্শ দেন যে, ফিফার এমন একটি সংস্কার আনা উচিত যেখানে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির হাতে অসীম ক্ষমতা না দিয়ে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন কনফেডারেশনের প্রতিনিধিদের সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। ইনফান্তিনোকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া উচিত কি না জানতে চাইলে ওলসন বলেন, ‘আমি মনে করি ফুটবলের জন্য এটি একটি নতুন সূচনা হওয়া উচিত।’
এফএইচএম
