বিজ্ঞাপন

ফিফা বনাম ফুটবল বিশ্ব : এখন কী হবে?

ফিফা বনাম ফুটবল বিশ্ব : এখন কী হবে?

হঠাৎ করেই এমন এক ঘোষণা আসে, যা ইউরোপীয় ফুটবল অঙ্গনে তুমুল আলোড়ন তুলেছে। ঘোষণাটি এসেছে গতকাল বৃহস্পতিবার। প্রভাবের দিক থেকে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফার এর চেয়ে বড় পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ ছিল না।

উয়েফা জানায়, ‘উয়েফা এবং এর সদস্যভুক্ত জাতীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনগুলো ফিফার কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে না।’

মাত্র কয়েকটি শব্দ। কিন্তু সেই কয়েকটি শব্দই ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর পরিকল্পনার প্রতি উয়েফার চূড়ান্ত বার্তা পৌঁছে দেয়। মূলত, বিশ্বকাপসহ ফিফার বিভিন্ন প্রতিযোগিতা পরিচালনার জন্য গঠিত একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ২০ শতাংশ শেয়ার বিক্রির পরিকল্পনা করছিলেন ফিফা সভাপতি।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, কোম্পানিটির নিয়ন্ত্রণ ফিফার হাতেই থাকবে। তবে এর অর্থায়নের একটি অংশ আসবে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে। তাদের মধ্যে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই জোশুয়া কুশনারও।

এখন কী হবে?

এই পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যাবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না কেউ। পোল্যান্ডে আগামী পাঁচই সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া অনূর্ধ্ব-২০ নারী বিশ্বকাপে এই সিদ্ধান্তের কী প্রভাব পড়বে, এমন প্রশ্নে ইউরোপীয় ফুটবলের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এর বাস্তব দিকগুলো সম্ভবত ভাবা হয়নি।’

ওই টুর্নামেন্টটিতে ইউরোপেরও বেশ কয়েকটি দেশের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। তবে ইনফান্তিনোর প্রস্তাবিত অর্থায়ন চুক্তি অনুমোদিত হলেই কেবল বয়কটে যাবে উয়েফা।

আগামী ১৯ শে সেপ্টেম্বরের মধ্যে ফিফার সদস্য দেশগুলোকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে তারা ফিফার এই অর্থায়ন পরিকল্পনায় সম্মতি দেবে কি না। সম্মতি দিলে আগামী পহেলা জানুয়ারি প্রতিটি সদস্য এককালীন দুই কোটি ডলার করে পাবে।

তাই, ওই সময়ের মধ্যে বয়কট কার্যকর হলে চলমান অনূর্ধ্ব-২০ নারী বিশ্বকাপের কোয়ার্টার-ফাইনাল বা সেমিফাইনালের আগেই কিছু দেশ টুর্নামেন্ট থেকে সরে দাঁড়াতে পারে। ফিফার পরবর্তী সিনিয়র প্রতিযোগিতা হলো অক্টোবরে নারী বিশ্বকাপের প্লে-অফ, যেখানে ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডসহ কয়েকটি দল অংশ নেবে।

উয়েফার সহ-সভাপতি এবং ওয়েলসের সাবেক ফুটবলার লরা ম্যাকঅ্যালিস্টার বিবিসি রেডিও ফাইভ লাইভকে বলেন, ‘শরতে নারী বিশ্বকাপের প্লে-অফে খেলবে ওয়েলস। আমরা যদি মূল পর্বে জায়গা করে নিতে পারি, সেটিই হবে বিশ্বকাপে আমাদের প্রথম অংশগ্রহণ।’

তিনি বলেন, ‘ওই প্রতিযোগিতায় অংশ না নেওয়ার কথা কেউ কল্পনাও করতে পারে না।’ আরও বলেন, ‘তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করে বলা দরকার যে এই পরিস্থিতির জন্য উয়েফা দায়ী নয়। এই সংকট তৈরি করেছে ফিফা। কেউই চায় না খেলোয়াড়রা ক্ষতিগ্রস্ত হোক, কিংবা সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতাগুলো থেকে কোনো দেশ বঞ্চিত হোক। আমাদেরকে এক কোণঠাসা অবস্থায় ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এর দায় ফিফার।’

ইনফান্তিনো কি টিকতে পারবেন?

এখন কী ঘটবে, তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছেন না। আর ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর ভবিষ্যৎ কী হবে, সেটিও অনিশ্চিত।

উয়েফার বিবৃতির পর এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি ফিফা। তবে এরই মধ্যে উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনকাকাফও পৃথক এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তাদের ৪১টি সদস্যই ফিফার এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।

তবে এক অর্থে এটি শুধু ফিফা বনাম উয়েফার বিরোধ নয়। ইংল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান ডেবি হিউইট ফিফারও সহ-সভাপতি। বৃহস্পতিবার উয়েফার জরুরি বৈঠকে তিনি প্রকাশ্যেই এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করেন।

পরে এক বিবৃতিতে ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বা এফএ জানায়, এ বিষয়ে তারা ‘ইউরোপের সহকর্মীদের পাশে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে’ রয়েছে। স্কটিশ এফএ সভাপতি মাইক মুলরানেও ফিফার ফিন্যান্স কমিটির চেয়ারম্যান। স্কটিশ এফএ-ও এক বিবৃতিতে জানায়, তারা উয়েফার অবস্থানের সঙ্গে "সম্পূর্ণ একমত"। 

এ পর্যন্ত যারা প্রকাশ্যে কথা বলেছেন, তাদের বক্তব্যে বারবার দু'টি অভিযোগ উঠে এসেছে। তাদের ক্ষোভ শুধু প্রস্তাবটি নিয়েই নয়; বরং ইনফান্তিনো যে ফিফার নিজের সহকর্মীদের সঙ্গেও যথাযথ পরামর্শ ও আলোচনা না করেই এটি সামনে এনেছেন, সেটি নিয়েও। উয়েফার জরুরি বৈঠকের পরিবেশ কেমন ছিল, এমন প্রশ্নের জবাবে এক সূত্রের এক শব্দের উত্তর ছিল, ‘ক্ষোভ’।

২০১৬ সালে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (এএফসি) তৎকালীন সভাপতি শেখ সালমান আল-খলিফার ৮৮ ভোটের বিপরীতে ১১৫ ভোট পেয়ে ফিফার সভাপতি নির্বাচিত হন জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। আগামী বছরের মার্চে চতুর্থ মেয়াদের জন্য আবারও তার নির্বাচনে দাঁড়ানোর কথা। এ সপ্তাহের আগে পর্যন্ত ধারণা ছিল যে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছাড়াই তিনি আবারও নির্বাচিত হবেন।

ইউরোপের কয়েকটি দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন জাতীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এরই মধ্যে আগামী নির্বাচনে ৫৬ বছর বয়সী ইনফান্তিনোকেই সমর্থনের ইচ্ছার কথা জানিয়েছে।

তবে একাধিক সূত্র বলছে, ইনফান্তিনোর নতুন অর্থায়ন পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করার পাশাপাশি কনকাকাফের অধিকাংশ সদস্য সংস্থাই বিশ্ব ফুটবল পরিচালনায় তার সক্ষমতার ওপর আস্থা হারাচ্ছে, আর অনেকে সেই আস্থা ইতোমধ্যে পুরোপুরি হারিয়েছে। ফলে এখন তার বিপক্ষে একজন প্রার্থী দাঁড় করানোর আলোচনাও শুরু হয়েছে।

সম্ভাব্য নাম হিসেবে উঠে এসেছে নাসের আল-খেলাইফির নাম। বিষয়টি অস্বাভাবিক নয়। কাতারের আল-খেলাইফি বর্তমানে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি। তিনি শুধু টানা দুইবারের চ্যাম্পিয়ন্স লিগজয়ী প্যারিস সেন্ট-জার্মেইনের (পিএসজি) সভাপতি নন, ইউরোপের ক্লাবগুলোরও অন্যতম শীর্ষ নেতা।

২০২১ সালে ইউরোপিয়ান সুপার লিগের বিতর্কের পর, তৎকালীন ইউরোপিয়ান ক্লাবস অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃত্ব নেন আল-খেলাইফি। পরে সংগঠনটির নাম বদলে ইউরোপিয়ান ফুটবল ক্লাবস রাখা হয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, তার নেতৃত্বে সদস্যসংখ্যা বেড়ে ৮০০-এর বেশি হয়েছে। বড় ক্লাবগুলোর মধ্যে এখন শুধু রিয়াল মাদ্রিদই এই সংগঠনের বাইরে রয়েছে।

তাত্ত্বিকভাবে ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য আল-খেলাইফিকেই সবচেয়ে শক্তিশালী প্রার্থী মনে করা হয়। তবে তিনি নিজে এতে আগ্রহী নন। বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে জানতে চাইলে ৫২ বছর বয়সী আল-খেলাইফি'র ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বিবিসিকে জানায়, ‘তিনি সত্যিই, সত্যিই, সত্যিই এই দায়িত্ব চান না।’

ইতিহাস বলছে, দায়িত্বে থাকা কোনো ফিফা সভাপতিকে সাধারণত নির্বাচনে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয় না। সর্বশেষ ১৯৭৪ সালে ইংল্যান্ডের স্যার স্ট্যানলি রাউস নির্বাচনে ব্রাজিলের জোয়াও হাভেলাঞ্জের কাছে হেরেছিলেন। ইনফান্তিনো সভাপতি পদে টিকে থাকতে পারবেন কি না, এমন প্রশ্নে উয়েফার সহ-সভাপতি লরা ম্যাকঅ্যালিস্টার বলেন, "সত্যি বলতে আমি জানি না।"

একই প্রশ্ন করা হয়েছিল ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক চেয়ারম্যান ডেভিড বার্নস্টেইনকেও।

তিনি বলেন, ‘এটি যদি একটি সাধারণ প্রতিষ্ঠান হতো, তাহলে এত বড় ঘটনার কারণে সম্ভবত তাকে পদ ছাড়তে বাধ্য করা হতো। কিন্তু ফিফা কোনো সাধারণ প্রতিষ্ঠান নয়। জাতীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনগুলোর পর্যাপ্ত সমর্থন থাকলে তিনি এই দায়িত্বে বহাল থাকবেন।’

উয়েফার সাবেক প্রধান নির্বাহী লার্স-ক্রিস্টার ওলসনও বিবিসিকে বলেন যে ইনফান্তিনো এই ইস্যুতে অতিরিক্ত ঝুঁকি নিয়েছেন, ফলে তার পদও এখন হুমকির মুখে। তার মতে, ফিফায় এমন সংস্কার আনা উচিত, যাতে সভাপতির পদটি বিভিন্ন মহাদেশীয় ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিনিধিদের মধ্যে পর্যায়ক্রমে পরিবর্তিত হয়। এতে একজন ব্যক্তির হাতে দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার প্রবণতা কমবে। উদাহরণ হিসেবে তিনি ইনফান্তিনো, তার পূর্বসূরি সেপ ব্ল্যাটার এবং ব্রাজিলের জোয়াও হাভেলাঞ্জের কথা উল্লেখ করেন।

ইনফান্তিনোকে পদ থেকে সরানো উচিত কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ওলসনের মন্তব্য, ‘আমার মনে হয়, সেটিই হবে বিশ্ব ফুটবলের জন্য একটি নতুন শুরুর সুযোগ।’

উয়েফা কি ফিফা থেকে আলাদা হয়ে যেতে পারে?

ফিফার ২১১টি সদস্য জাতীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের মধ্যে উয়েফার সদস্য মাত্র ৫৫টি। তবে মাঠের পারফরম্যান্সের দিক থেকে মহাদেশীয় ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে উয়েফাই।

ফিফার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ তিনটি প্রতিযোগিতা–বিশ্বকাপ, নারী বিশ্বকাপ ও ক্লাব বিশ্বকাপের সর্বশেষ আসরে সেমিফাইনালে ওঠা চারটি দলের মধ্যে তিনটিই ছিল উয়েফার সদস্য দেশের বা ক্লাবের।

ফিফার কোনো প্রতিযোগিতায় ইউরোপের অংশগ্রহণ না থাকলে এর বাণিজ্যিক প্রভাব হবে ব্যাপক। সে ক্ষেত্রে সদস্য জাতীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনগুলোর কাছে পাঠানো চিঠিতে ইনফান্তিনো যে চার হাজার কোটি ডলারের (প্রায় তিন হাজার কোটি পাউন্ড) প্রকল্পের কথা বলেছেন, সেই লক্ষ্য অর্জনের সম্ভাবনাও প্রায় থাকবে না।

তবে ডেভিড বার্নস্টেইনের বিশ্বাস, শেষ পর্যন্ত একটি সমাধান বের হবে। তার ভাষায়, ‘দীর্ঘমেয়াদে ফুটবল দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাবে, এটা আমি বিশ্বাস করি না। কারণ এতে সবারই ক্ষতি হবে।’ তিনি বলেন, ‘ফিফার পক্ষে ইউরোপীয় দলগুলোকে ছাড়া প্রতিযোগিতা আয়োজন করা সম্ভব নয়। আবার ইউরোপের পক্ষেও ফিফার প্রতিযোগিতার বাইরে থাকা সম্ভব নয়।’

বার্নস্টেইনের মতে, ‘এই মুহূর্তে ইনফান্তিনোকেই পিছু হটতে হবে। এই চুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। এটি বন্ধুদের মধ্যে করা একটি চুক্তি, যা সঠিক নয়। যদি মূলধন সংগ্রহের প্রয়োজন হয়, তাহলে সেটির আরও ভালো উপায় আছে।’

বিবিসি বাংলা