বিজ্ঞাপন

ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ: সবচেয়ে ধনী ফুটবল, সবচেয়ে দরিদ্র বাজেট

ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ: সবচেয়ে ধনী ফুটবল, সবচেয়ে দরিদ্র বাজেট

বিশ্ব ফুটবলে বিনিয়োগের জন্যই ইংলিশ প্রিমিয়ার লিঘ সবচেয়ে ধনী ও আকর্ষণীয় প্রতিযোগিতা। কিন্তু এর ক্লাবগুলোর আর্থিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। দলবদলে কোটি কোটি ইউরো লেনদেন হয়, কিছু ক্লাবের মূল্য শতকোটি; তারপরও সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে বেশিরভাগ ইংলিশ ফুটবল ক্লাব আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছে। 

স্প্যানিশ সংবাদপত্র এএস একটি সমীক্ষার প্রতিবেদন করেছে, যেখানে কনসাল্টেন্সি ফার্ম ‘বিডিও’ জানিয়েছে, শীর্ষ চার বিভাগের ৯০ শতাংশ ক্লাব আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। যদিও বাণিজ্যিক আয় ও টেলিভিশন সম্প্রচার স্বত্ব ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

২০২৬-২৭ মৌসুম সামনে রেখে ইংলিশ দলবদলের বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। একই সময়ে গত এক দশকের নামকরা দুই চ্যাম্পিয়ন একেবারে ভিন্ন ভবিষ্যৎ খুঁজছে। ভারতের বিলিয়নিয়ার মিত্তাল পরিবারের সমর্থিত এবং অমিত ভাটিয়ার নেতৃত্বাধীন একটি কনসোর্টিয়ামের কাছে ৪৯% পর্যন্ত সংখ্যালঘু শেয়ার বিক্রির বিষয়ে আলোচনা করছে লিভারপুল। এই চুক্তির মাধ্যমে ক্লাবটির মূল্য ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি হতে পারে। তাতে ফেনওয়ে স্পোর্টস গ্রুপ তাদের অধিকাংশ মালিকানা ধরে রেখেই নতুন মূলধন সংগ্রহের সুযোগ পাবে।

অন্যদিকে, লেস্টার সিটির থাই মালিক সংস্থা ‘কিং পাওয়ার’ ক্লাবটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিক্রির জন্য তুলে ধরেছে। সম্ভাব্য ক্রেতা খুঁজে বের করতে সিটি গ্রুপকে দায়িত্ব দেওয়ার পর ক্লাবটি তাদের আর্থিক অবস্থা এবং মাঠের পারফরম্যান্স উভয়কেই স্থিতিশীল করার আশা করছে। ২০১৬ সালে তাদের অবিস্মরণীয় প্রিমিয়ার লিগ জয়ের মাত্র ১০ বছর পর লেস্টার ৭১.১ মিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ৯৪ মিলিয়ন ডলার) লোকসান রেকর্ড করেছে এবং ইংল্যান্ডের তৃতীয় সারির ফুটবল লিগ ‘লিগ ওয়ান’-এ নেমে গেছে।

আয় বাড়লেও কেন ক্লাবগুলো আর্থিক লোকসান করছে?

লিভারপুল এবং লেস্টার সিটির এই বৈপরীত্যপূর্ণ ভাগ্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান 'বিডিও'-র সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। রিপোর্ট অনুযায়ী, ইংল্যান্ডের শীর্ষ চার পেশাদার বিভাগের প্রায় ৯০% ক্লাবই আর্থিক লোকসানের সম্মুখীন হতে যাচ্ছে।

আর্থিক স্থায়িত্ব নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ দূর করতে প্রিমিয়ার লিগ চলতি মৌসুমে নতুন খরচের নিয়ম চালু করেছে। প্রথম দলের স্কোয়াডের খরচ ক্লাবের মোট আয়ের ৮৫% এর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে।

‘চ্যানেল অ্যাসোসিয়াডোস’-এর ম্যানেজিং পার্টনার এবং ফুটবল অর্থায়নের বিশেষজ্ঞ ময়েসেস আসায়াগ বলেছেন, ‘ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ একটি নাজুক পর্যায় অতিক্রম করছে। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী লিগ হওয়া সত্ত্বেও, স্পন্সরশিপ ও সম্প্রচার স্বত্ব থেকে আয় বৃদ্ধির পরও, প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবগুলো লাভজনক থাকতে লড়াই করছে। এর প্রধান কারণ হলো পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি, খেলোয়াড়দের বেতন বৃদ্ধি এবং প্রতিযোগিতার ক্রমবর্ধমান স্তরের কারণে তৈরি হওয়া আর্থিক চাপ।’

Liverpool FC v Wrexham AFC - Pre-Season Friendly

দলবদলের খরচে আধিপত্য বজায় রেখেছে প্রিমিয়ার লিগ

আর্থিক চাপ থাকা সত্ত্বেও গ্রীষ্মকালীন দলবদলের বাজারে ইংলিশ ক্লাবগুলো ইউরোপের বাকি সব লিগের চেয়ে বেশি খরচ করে চলেছে।

‘ট্রান্সফারমার্কেট’-এর তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি খরচ করা শীর্ষ পাঁচটি লিগ হলো:

ইংল্যান্ড: ১.৬০ বিলিয়ন ডলার

ইতালি: ৬৭৩ মিলিয়ন ডলার

জার্মানি: ৪৯৯ মিলিয়ন ডলার

স্পেন: ৩৫৩ মিলিয়ন ডলার

ফ্রান্স: ২৮২ মিলিয়ন ডলার

শীর্ষ ১০-এর বাকি দেশ ও লিগগুলো হলো তুরস্ক (২৫৯ মিলিয়ন ডলার), পর্তুগাল (২০৬ মিলিয়ন ডলার), ইংল্যান্ডের চ্যাম্পিয়নশিপ (১৬৭ মিলিয়ন ডলার), সৌদি আরব (১০৩ মিলিয়ন ডলার) এবং নেদারল্যান্ডস (৯৫ মিলিয়ন ডলার)। ইউরোপীয় দলবদলের বাজার ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খোলা থাকবে।

এই গ্রীষ্মের সবচেয়ে ব্যয়বহুল পাঁচটি দলবদলের চারটিতেই জড়িত রয়েছে প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব, যার মধ্যে একটি এসেছে লা লিগা থেকে:

মরগান রজার্স, অ্যাস্টন ভিলা থেকে চেলসি: ১৫৯ মিলিয়ন ডলার

এলিয়ট অ্যান্ডারসন, নটিংহ্যাম ফরেস্ট থেকে ম্যানচেস্টার সিটিতে: ১৫৫ মিলিয়ন ডলার

স্যান্ড্রো টোনালি, নিউক্যাসেল ইউনাইটেড থেকে টটেনহ্যামে: ১২৪ মিলিয়ন ডলার

মাতেউস ফার্নান্দেস, ওয়েস্ট হ্যাম ইউনাইটেড থেকে টটেনহ্যামে: ১১৪ মিলিয়ন ডলার

অ্যান্থনি গর্ডন, নিউক্যাসেল ইউনাইটেড থেকে বার্সেলোনায়: ৯২ মিলিয়ন ডলার

বিনিয়োগকারীরা কেবল খেলোয়াড় নয়, ক্লাব কিনছেন

আসায়াগ মনে করেন, এই ব্যাপক লোকসান ঠেকাতে ফুটবলের আর্থিক নিয়ন্ত্রক কাঠামোগুলোকে আরও কার্যকর হতে হবে।

তিনি বলেন, ‘অধিকাংশ প্রিমিয়ার লিগ ক্লাবের এই লোকসানের ধারা প্রমাণ করে যে, ক্লাবগুলোর মধ্যে আর্থিক বা প্রতিযোগিতামূলক ভারসাম্যহীনতা তৈরি না করে লিগগুলোর দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে আর্থিক নিয়মাবলিকে আরও দক্ষ এবং ক্ষেত্রবিশেষে কঠোর করা প্রয়োজন।’

FBL-WC-2026-MATCH103-FRA-ENG

‘ফুটপ্রো এক্সপো’-র সিইও ভেরিডিয়ানো পিনহেইরো মনে করেন, বিনিয়োগের প্রতি এই আগ্রহ বৃদ্ধি খেলার এক বিশাল রূপান্তরকে প্রতিফলিত করে। ‘প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবগুলোর শেয়ার কেনার প্রতিযোগিতা নির্দেশ করে যে ফুটবল ঐতিহ্যবাহী লিগ ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে এখন বিশ্বব্যাপী একটি বিনোদন প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা কেবল খেলাধুলার ঐতিহ্য কিনছেন না; তারা বিশ্বব্যাপী দর্শক, ব্র্যান্ডের শক্তি এবং রেকর্ড পরিমাণ বাণিজ্যিক ও মিডিয়া আয় তৈরির ক্ষমতার ওপর বিনিয়োগ করছেন। এই খেলার আসল মূল্য নিহিত রয়েছে এটিকে বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত একটি বিনোদন পণ্যে রূপান্তরিত করার মধ্যে,’ পিনহেইরো বলেন।

বিশ্বজুড়ে ১৫০ জনেরও বেশি খেলোয়াড়ের প্রতিনিধিত্বকারী ‘পিঅ্যান্ডপি স্পোর্ট ম্যানেজমেন্ট’-এর সিইও ক্লাওদিও ফিওরিতো বলেছেন যে, বড় বিনিয়োগকারীদের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু এখন বদলে গেছে।

ফিওরিতো বলেন, ‘ইংলিশ ফুটবলের এই সাম্প্রতিক বিবর্তন একটি বিষয় স্পষ্ট করে দেয় যে, প্রধান মূলধন এখন খেলোয়াড় কেনার চেয়ে ক্লাবের শেয়ার কেনার দিকে স্থানান্তরিত হয়েছে। যেহেতু প্রিমিয়ার লিগ বাণিজ্যিক আয়ে রেকর্ড গড়ে চলেছে এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করছে, তাই খেলোয়াড়রা আর বিনিয়োগের চূড়ান্ত পণ্য মাত্র নয়; তারা এখন বিলিয়ন ডলার মূল্যের ক্লাবগুলোর মূল সম্পদে পরিণত হয়েছে।’

এফএইচএম