ফুটবল বিশ্বকাপের মতো পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় টুর্নামেন্টকে ‘বেসরকারিকরণ’ করার এক গোপন প্রচেষ্টার খবর ফাঁস হতেই তোলপাড় শুরু হয়েছে বিশ্ব ফুটবলে। শীর্ষ পদের সুবিধা ও বিপুল অর্থ আত্মসাতের নানা বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর শেষ পর্যন্ত বিতর্কিত উদ্যোগটি থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা ফিফা। তবে বিশ্ব ফুটবলের নীতি-নির্ধারণী মহলে যে ফাটল তৈরি হয়েছে, তা সহজে কাটবে বলে মনে হচ্ছে না।
ব্রিটিশ প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য টাইমস ও টিএন-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। ফিফার বর্তমান সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো নিজেই নিজের বেতন এক লাফে ১০ গুণ বাড়িয়ে প্রায় ৩ কোটি ইউরো (যা সাড়ে ৩ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি) নির্ধারণের পরিকল্পনা করেছিলেন।
ফিফার নতুন এই উদ্যোগটির নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ (এফএফই)। পরিকল্পনা ছিল—বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব, স্পনসরশিপ, টিকিটিং ও অন্যান্য বাণিজ্যিক স্বত্ব একটি পৃথক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের অধীনে ন্যস্ত করা হবে। এই প্রতিষ্ঠানের ২০ শতাংশ শেয়ার কেনাবেচার সুযোগ দেওয়া হতো বাইরের কিছু বেসরকারি মূলধন বিনিয়োগকারী ও তহবিলের কাছে।
ফিফার বর্তমান সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো নিজেই নিজের বেতন এক লাফে ১০ গুণ বাড়িয়ে প্রায় ৩ কোটি ইউরো (যা সাড়ে ৩ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি) নির্ধারণের পরিকল্পনা করেছিলেন।
কথা ছিল, এই নতুন প্রকল্পের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) দায়িত্ব নেবেন খোদ ইনফান্তিনো। ফিফা সভাপতি হিসেবে বর্তমানে তিনি বার্ষিক প্রায় ৩০ লাখ ইউরো বেতন পান। কিন্তু নতুন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নিলে পারফরম্যান্স বোনাসসহ তার আয় দাঁড়াত ৩ কোটি ইউরোরও বেশি। অর্থাৎ, চোখের পলকে তার ব্যক্তিগত আয় ১০ গুণ বেড়ে যেত।

বেসরকারি তহবিল থেকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রায় ৩৬৫ কোটি ইউরো তোলার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি করা এই প্রজেক্টের পেছনে ছিল নির্দিষ্ট কিছু শীর্ষ কর্তার ব্যক্তিগত ফায়দা লোটার সুযোগ।সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত এই বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে বসানোর পরিকল্পনা ছিল প্যারিস সেন্ট জার্মেইর (পিএসজি) কাতারি সভাপতি নাসের আল-খেলাইফি, এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (এএফসি) প্রধান শেখ সালমান বিন ইব্রাহিম আল-খলিফা এবং কনকাকাফ প্রধান ভিক্টর মন্তালিয়ানির মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের।
এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই বিশ্ব ফুটবলের অন্যান্য সদস্য দেশগুলোর মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়। ছোট ও বাদ পড়া ফুটবল ফেডারেশনগুলো বিষয়টিকে ফুটবলের বিশ্বজনীন সম্পদ ব্যক্তিগত খাতে বিক্রি করে দেওয়ার এক ‘অশুভ’ চক্রান্ত হিসেবে দেখছে।
ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা ও এর সভাপতি আলেকসান্দার সেফেরিন এ পরিকল্পনার বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর অবস্থান নেন। উয়েফা স্বচ্ছতার চরম অভাবের অভিযোগ তুলে ইনফান্তিনোর ওপর থেকে আস্থা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। এমনকি ফিফার সব ধরনের টুর্নামেন্ট বয়কট করার হুমকিও দেয় তারা।
পরবর্তীতে কনকাকাফ এবং এএফসিও উয়েফার অবস্থানে সায় দিয়ে পুরো বিষয়টির পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত দাবি করে। চারদিক থেকে ধেয়ে আসা তীব্র বিক্ষোভের মুখে শেষ পর্যন্ত এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পুরো প্রজেক্টটি বাতিলের ঘোষণা দিতে বাধ্য হয় ফিফা। তবে এতকিছুর পরও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। ফিফা সভাপতির চেয়ার অনেকটাই নড়বড়ে হয়ে গেছে জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর। কদিন আগেও যাকে মনে হচ্ছিল, একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী। হঠাৎই যেন সব বদলে গেছে।
এফআই
