খুলনা জেলা অনূর্ধ্ব-১৬ দলের অধিনায়ক, খেলেছেন বিভাগীয় দলেও। বাবার মৃত্যুর পর ব্যাট-বল ছেড়ে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে জীবিকার তাগিদে মালয়েশিয়ায়। বলা হচ্ছে, বর্তমান মালয়েশিয়া ক্রিকেট দলের ব্যাটার নাজমুস সাকিবের কথা।
প্রবাসে গিয়ে শ্রমিকের কাজ নিয়ে কাঁধে ৪০-৫০ কেজির কার্টন, এরপর রাতে একা একা ব্যাটিং অনুশীলন। দেশ ছাড়া সেই সাকিবকে ক্রিকেটই আবার ফিরিয়ে এনেছে নিজের দেশে। তবে বাংলাদেশের জার্সিতে নয়, মালয়েশিয়ার।
বাংলাদেশ ইমার্জিং দলের বিপক্ষে সিরিজ খেলতে এসে ঢাকা পোস্টের সঙ্গে আলাপকালে নিজের দীর্ঘ সেই গল্প জানালেন সাকিব। নিজ জন্মভূমির বিপক্ষে খেলা কঠিন হলেও পেশাদারের ছাপ রাখতে চান তিনি।
সাকিব বলেন, ‘দেশের বিপক্ষে খেলা সবসময় একটা চ্যালেঞ্জিং। কারণ দেশের মাটির প্রতি সবার একটা মায়া থাকে। তবে আমি মালয়েশিয়া জাতীয় দলের হয়ে খেলছি, আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। আমি মালয়েশিয়ার হয়ে প্রতিনিধিত্ব করছি এবং আমার সেরাটা দিয়ে খেলার চেষ্টা করব।’
তিনি বলে গেলেন, ‘আমি বাংলাদেশে বয়সভিত্তিক খেলেছি। ২০১৪ সালে অনূর্ধ্ব-১৪ খেলেছি, অনূর্ধ্ব-১৬ খেলেছি। ডিভিশন টিমের ক্যাপ্টেনও ছিলাম এবং খুলনা ডিস্ট্রিক্ট অনূর্ধ্ব-১৬ টিমের ক্যাপ্টেন ছিলাম, ডিভিশনও খেলেছি।’
বাবার মৃত্যু বদলে দেয় জীবন। সাকিব বললেন, ‘এরপর আব্বু মারা যাওয়ার কারণে পরিবারের দায়িত্ব নিতে ক্রিকেট ক্যারিয়ারটা শেষ করে মালয়েশিয়া যাওয়া লাগে। আমার দুইটা বোন আছে, আম্মু আছে। আর আমি একা, আমার কোনো ভাই নেই। এ কারণেই পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য আমি মালয়েশিয়ায় যাই কাজের উদ্দেশ্যে।’

বিদেশে গিয়েও খুঁজে নিয়েছেন ক্রিকেট আনন্দ, ‘ওখানে কাজের পাশাপাশি যখনই ছুটি থাকতো আমি খেলাধুলাটা চালিয়ে যেতাম। তিন বছর আমি ওখানে টানা টেপ টেনিস বলে খেলতাম। একদিন টেপ টেনিস বল খেলতে গিয়ে একজনের সাথে পরিচয় হয়। তাদের ক্লাব আছে, ওই ক্লাবে যাওয়ার পর থেকে ওখানে আমি প্র্যাকটিস ছাড়া মালয়েশিয়াতে প্রথম ম্যাচেই ৫০ বলে ১০০ রান করেছিলাম।’
ক্রিকেটে থিতু হলেন আবার, সাকিব বললেন সেই কথা, ‘তারপরে মালয়েশিয়ায় ইন্টার-স্টেট নামে একটা টুর্নামেন্ট হয়, ওখানে আমার সুযোগ আসে। ওখানে আমি ভালো পারফর্ম করি। ওখানে প্রথম বছরে আমি তৃতীয় সর্বোচ্চ স্কোরার ছিলাম। এরপর পরের বছর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্কোরার ছিলাম। তো তারপরে মালয়েশিয়া ‘এ’ দলে আমার সুযোগ আসে ইতালির বিপক্ষে।’
সুযোগটাও লুফে নেন সাকিব, ‘ওখানে একটু ভালো করি। তারপরে সিঙ্গাপুরের সাথে একটা ম্যাচ হয়, সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল টিমের সাথে এবং মালয়েশিয়া ‘এ’ দলের সাথে। ওই ম্যাচে আমি ৫০ বলে ১২২ রান করি। তারপরে আমার জাতীয় দলে ডাক আসে। তারপরে মালয়েশিয়ার হয়ে খেলছি। এভাবেই আমার শুরুটা হয় মালয়েশিয়ায়।’
সেই কাহিনী শুনালেন সাকিব, ‘ক্রিকেট বোর্ডের অফারটা যখন আসে, তখন আমি আমার বড় ভাই আজিজকে ফোন দিই। ভাইয়ার সাথে পরামর্শ করলে তিনি আমাকে বললেন যে এভাবে প্রসেসিং করো আস্তে আস্তে খেলতে। কিছু সময় কোম্পানি থেকে ছুটি নিয়ে খেলতে গেছি। এভাবে শুরুতেই আস্তে আস্তে আমি এখানে। ভাইয়া যদি ওই সময় আমাকে মানসিকভাবে সাপোর্ট না করতো, তাহলে আমি হয়তোবা নিজেকে মেলে ধরতে পারতাম না।’
২০১৮ সালের ১৪ নভেম্বর ওয়ার্কিং ভিসায় মালয়েশিয়া যান সাকিব। সারাদিন পরিশ্রম করে রাতে বাসায় ফিরেও অনুশীলন চালিয়ে গেছেন। তিনি বললেন, ‘আমি ওই দেশে কাজ করতাম একটা বেডশিট ফ্যাক্টরিতে। ওদের ওয়ার্কিং ভিসাতে আমি যাই ২০১৮ সালের ১৪ নভেম্বর। ওখানে কন্টেইনার নামাতাম দিনে চারটা। এক একটা ওজনদার বক্সে প্রায় ৪০ কেজি ৫০ কেজি।’
সেই সংগ্রামের গল্প আরও বললেন সাকিব, ‘ওইটা নামানোর পরে ধরেন রাতে ক্লান্ত হয়ে যেতাম। তবে একজন ক্রিকেটারের সর্বপ্রথম প্রয়োজন হচ্ছে প্রচুর পরিমাণে প্র্যাকটিস। আপনি যত প্র্যাকটিস করবেন ততই আপনি ভালো উন্নতি করতে পারবেন। আমি যখন কাজ করতাম আমি অনেক ক্লান্ত থাকতাম। তবে ক্লান্তির পাশাপাশি আমার মনের জেদটা ছিল। রাতে রুমে গিয়ে মোজার ভিতরে বল দিয়ে ওইটা দিয়ে আমি নিজে নকিং করতাম, যাতে অন্তত আই কন্টাক্টটা ঠিক থাকে।’
আরেকজন মানুষের স্বপ্নও ছিল সাকিবের মধ্যে, ‘আমার বড় ভাই আছে। আজিজ শেখ, আমার চাচাতো ভাই। তার স্বপ্ন ছিল জাতীয় দলের ক্রিকেটার হওয়া। ফ্যামিলি ইস্যুর কারণে সে হতে পারেনি। আমি তার স্বপ্নটা পূরণ করার জন্য নিজের জেদ হিসেবে নিয়েছি যে আমার ভাই পারেনি আমি এটা পারব।’
সাকিবের ক্রিকেট ক্যারিয়ারের প্রয়োজনীয় প্রায় সবকিছুই জোগাড় করে দিয়েছেন খুলনার কোচ জুয়েল, ‘আমি আমার লাইফের যত ইনস্ট্রুমেন্ট কিনছি, সবই তার দেওয়া। উনিই আমাকে কিনে দিয়েছেন। আমার যখনই যেটা লাগতো, জুয়েল স্যারের কাছে চাইতাম। স্যার বলতো ঠিক আছে এই টুর্নামেন্ট সামনে আসছে, এখানে তুমি একটা ফিফটি মেরে দেখাও বা একটা হান্ড্রেড মেরে দেখাও। আমি সবসময় ওইটা পূরণ করতাম আর উনি আমাকে ওইভাবে সবকিছু দিত।’
ক্রিকেটের পথে পথ চলা শুরুর পথের সতীর্থদেরও ভোলেননি সাকিব, ‘মেহরাব, মেহেদী সবাই আমাকে পরামর্শ দিতো। মেহেদী ভাইয়ের ব্যাট দিয়েও খেলেছি আমি। পরে আম্মু কানের দুল বিক্রি করে ব্যাট কিনে দিয়েছিলেন।’
মালয়েশিয়ার ক্রিকেট নিয়েও আশাবাদী সাকিব। তার বিশ্বাস, দেশটি দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, ‘আমরা এখন টি-টোয়েন্টি র্যাংকিংয়ে ২৫ এ আছি। ২০২৪ এ মালয়েশিয়া ক্রিকেট বোর্ড খেলোয়াড়দের যাবতীয় ফ্যাসিলিটি দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। ওরা খেলোয়াড়দের খুব ভালোভাবে নজরে রাখে। আমরা হচ্ছি তাদের ছেলেমেয়ে আর তারা হচ্ছে আমাদের বাবা-মা। আমরা কখন কী করছি না করছি, আমাদের ফ্যামিলি প্রবলেমসও তারা দেখার চেষ্টা করছে।’
শেষে এসে বললেন, ‘মালয়েশিয়া সবকিছু আরও ভালোভাবে করার চেষ্টা করছে। মালয়েশিয়ান ক্রিকেট বোর্ড থেকে আমাদের যে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা দিয়েছে, আপাতত আমরা এখন বিশ্বের ২৫ নাম্বার র্যাংকিংয়ে আছি। আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হচ্ছে, বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করব এবং বিশ্ব র্যাংকিংয়ে ২০ এর মধ্যে আসব। দেশবাসীর কাছে দোয়া চাই, যাতে যতদিন ক্রিকেট খেলছি আমি আমার সেরাটা দিয়ে তাদের এই আশাটা পূরণ করার চেষ্টা করতে পারি।’
এসএইচ/এফএইচএম
