বিজ্ঞাপন

নাৎসিবাদ ও হিটলারের দম্ভ চূর্ণ করা অ্যাথলেট জেসি ওয়েনস

নাৎসিবাদ ও হিটলারের দম্ভ চূর্ণ করা অ্যাথলেট জেসি ওয়েনস

জেসি ওয়েনস ৯০ বছর আগে ১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিকে চারটি স্বর্ণপদক জিতেছিলেন। অ্যাডলফ হিটলারের যে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বের তত্ত্ব, সেটি চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছিল তার সেই চারটি স্বর্ণপদক। ১০০ মিটার, ২০০ মিটার, ৪*১০০ মিটার ও দীর্ঘলম্ফে সোনা জিতে সেই আসরটি একার করে নিয়েছিলেন ওয়েনস।

জেমস ক্লিভল্যান্ড ওয়েনস ১৯১৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর আলাবামায় জন্মগ্রহণ করেন। একজন আফ্রিকান আমেরিকান হিসেবে, তিনি নাৎসি শাসনের নজরদারির মধ্যে ১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিকে চারটি স্বর্ণপদক জিতে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন। পদক বিতরণীর মঞ্চে হিটলার তার সঙ্গে হাত পর্যন্ত মেলাননি। এর আগের বছর তিনি মাত্র ৪৫ মিনিটে চারটি বিশ্বরেকর্ড ভাঙেন বা ছোঁন। ক্রীড়া ইতিহাস এবং বিশেষ করে অ্যাথলেটিক্সের জন্য এগুলি সর্বকালের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য দুটি কীর্তি।

Biography of Jesse Owens: 4 Time Olympic Gold Medalist

বার্লিন থেকে ওয়েনসের সাথে জার্মান অ্যাথলেট কার্ল লুডভিগ ‘লুজ’ লং-এর একটি অসাধারণ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। লুজ লং দীর্ঘলম্ফের ফাইনালে রানার-আপ হয়েছিলেন এবং তিনি ওয়েনসকে ফাউল এড়াতে ফাইনালে একটু দূর থেকে লাফ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি শাসনের পক্ষে লড়তে গিয়ে লং মারা যান। এই যুদ্ধ ‘দ্য বুলেট’ খ্যাত ওয়েনসকে অলিম্পিক কিংবদন্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার এবং আরও পদক জয়ের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেছিল। তার চারটি অলিম্পিক স্বর্ণপদকের রেকর্ডটি (শেষটি ১৯৩৬ সালের ৯ আগস্ট অর্জিত) ১৯৮৪ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসে কার্ল লুইস ছোঁয়ার আগ পর্যন্ত কেউ ভাঙতে পারেনি।

ওয়েনসের প্রভাব অ্যাথলেটিক ট্র্যাকের অনেক বাইরে বিস্তৃত ছিল। তিনি ছিলেন সে সময়ের দ্রুততম মানব। তিনি হিটলারকে অপমান করতে এবং আর্য জাতির শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কিত তার আর্য-অধিপত্যবাদী তত্ত্বকে ভেস্তে দিতে পেরেছিলেন।

ওয়েনস আলাবামার ওকভিলে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন তার বাবা-মায়ের দশম সন্তান, সাত ভাই ও তিন বোনের একজন। নয় বছর বয়সে তার পরিবার দক্ষিণাঞ্চলের বর্ণবাদ থেকে বাঁচতে উত্তরে ওহাইওর ক্লিভল্যান্ডে চলে যায়।পরিবারকে সাহায্য করতে ওয়ে ডেলিভারি বয়, মালবাহী ট্রেনের স্টিভেডোর এবং জুতো মেরামতের দোকানে কাজ করেছেন। ১৯ বছর বয়সে তিনি মিনি রুথ সোলোমনকে বিয়ে করেন।

Jesse Owens and Luz Long, true sportsmen | Ruma Chakravarti

১৯৩৫ ছিল ‘দ্য বুলেট’-এর বছর। ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় তাকে ‘দ্য বুলেট’ ডাকনাম দেওয়া হয়। সেখানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিযোগিতায় আটটি শিরোপা জেনেন। ১৯৩৫ সালের মে মাসে তিনি মাত্র ৪৫ মিনিটে ৩টি বিশ্বরেকর্ড ভাঙেন এবং ১টির পাশে বসেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এত সফলতা সত্ত্বেও তাকে কখনো স্কলারশিপ দেওয়া হয়নি। তাকে ক্যাম্পাসের বাইরে কৃষ্ণাঙ্গদের থাকার জায়গায় থাকতে হতো। ভ্রমণের সময় রেস্তোরাঁর সার্ভিস এরিয়া থেকে খাবার অর্ডার করতে হতো এবং কেবল কৃষ্ণাঙ্গদের হোটেলে থাকতে হতো।

বার্লিন অলিম্পিক থেকে ফেরার পরও তার অবস্থার বিশেষ উন্নতি হয়নি। তাকে অভিনন্দন জানাতে প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট আমন্ত্রণ জানাননি। এমনকি ওয়াল্ডর্ফ অ্যাস্টোরিয়া হোটেলে তাকে মূল ফটক দিয়ে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। পেছনের মালবাহী লিফট দিয়ে অনুষ্ঠানে পৌঁছাতে হয়েছিল। বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে তিনি এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকে পরিণত হন, যা পরবর্তীতে ১৯৬৮ সালের মেক্সিকো অলিম্পিকে জন কার্লোস এবং টমি স্মিথের ব্ল্যাক পাওয়ার আন্দোলনের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে রূপ নেয়।

Did Hitler Snub Jesse Owens at the Berlin Olympics?

জীবিকার তাগিদে তিনি লন্ড্রি ম্যানেজার থেকে শুরু করে জ্যাজ ড্যান্সার, এমনকি ঘোড়া বা গাড়ির সাথে দৌড়ানোর মতো নিম্নমানের প্রদর্শনীতেও অংশ নিয়েছেন। পরবর্তীতে তিনি নিজস্ব পাবলিক রিলেশন ফার্ম প্রতিষ্ঠা করেন এবং দেশজুড়ে প্রেরণাদায়ী বক্তব্য দিতে শুরু করেন।

লুজ লং ছিলেন হিটলারের প্রিয় অ্যাথলেটদের একজন। অলিম্পিক প্রতিযোগিতার সময় লং ওয়েনসকে সতর্কতার সাথে লাফ দিতে পরামর্শ দেন যাতে ফাউল না হয়। ওয়েনস স্বর্ণ এবং লং রৌপ্য পদক জেনেন। যুদ্ধ শুরু হলে লংকে ফ্রন্টে পাঠানো হয় এবং ১৯৪৩ সালে সিচিলিতে তিনি মারা যান। মৃত্যুর আগে তিনি ওয়েনসকে চিঠি লিখে তার পরিবারের সাথে দেখা করতে বলেছিলেন। যুদ্ধের পর ওয়েনস জার্মানি গিয়ে তার পরিবারের সাথে দেখা করেন। পরবর্তীতে লংকে মরণোত্তর ‘পিয়েরে দ্য কুবার্তিন’ পদকে ভূষিত করা হয়।

লংয়ের সেই বন্ধুত্বকে অমরত্বই যেন দিতে চেয়েছিলেন ওয়েনস, ‘হিটলারের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমার বন্ধু হতে অনেক সাহসের প্রয়োজন ছিল। আমার সমস্ত সোনা-রুপোর পদক ও কাপ গলিয়ে ফেললেও লুজ লংয়ের বন্ধুত্বের সাথে তার কোনো তুলনা হবে না।’ এক জার্মান রাষ্ট্রনায়কের রোষানলে পড়লেও আরেক জার্মানের সঙ্গে ওয়েনসের বন্ধুত্ব নিশ্চিতভাবে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

এফএইচএম