বিজ্ঞাপন

কুনহা থেকে দিয়োমান্দে, যেভাবে কাড়ি কাড়ি টাকা ভাগিয়ে নিচ্ছে লাইপজিগ!

কুনহা থেকে দিয়োমান্দে, যেভাবে কাড়ি কাড়ি টাকা ভাগিয়ে নিচ্ছে লাইপজিগ!

সর্বশেষ ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপে ঝলক দেখিয়ে ইউরোপীয় বড় ক্লাবগুলোর নজর কেড়েছিলেন ইয়ান দিয়োমান্দে। যার ধারাবাহিকতায় তিনি রিয়াল মাদ্রিদকে নতুন ঠিকানা বানিয়েছেন। তবে আলোচনায় তার সাবেক ক্লাব আরবি লাইপজিগ। জার্মান এই ক্লাব যেন ইউরোপীয় ফুটবলের ‘ট্রান্সফার কারখানা’য় পরিণত হয়েছে। যারা বড় সব ক্লাবে ফুটবলার বিক্রি করে পকেট ভারী করছে! 

২০০৯ সালে দিয়োমান্দের যখন স্রেফ তিন বছর, ওই বছর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আরবি লাইপজিগ। তরুণ ফুটবলারদের খুঁজে বের করা, তাদের পরিণত করে তোলা এবং পরে ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর কাছে বিক্রি করা– এই মডেল যেন জার্মানির তরুণ এই ক্লাবটির অলিখিত নীতিতে পরিণত হয়েছে। আর তাতে লাইপজিগের ঘরে ঢুকছে একের পর এক কোটি কোটি ইউরো।

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আরবি লাইপজিগের সঙ্গে ‘ড্রিবলিং’-এর এক অদ্ভুত সম্পর্ক রয়েছে। আরবি মূলত বহুজাতিক এনার্জি ড্রিংক কোম্পানি রেড বুলের সংক্ষিপ্ত রূপ। তবে বুন্দেসলিগার নিয়মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি এড়াতে আনুষ্ঠানিকভাবে এর অর্থ করা হয় ‘RasenBallsport’, যার অর্থ ঘাসের মাঠে বলের খেলা। নামের এই ব্যাখ্যাটি অবশ্য বেশ কৃত্রিম। আরবি লাইপজিগের সঙ্গে রেড বুল সালজবুর্গেরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। যারা আর্লিং হালান্ডসহ বেশ কয়েকজন প্রতিভাবান ফুটবলারকে গড়ে তোলা ও পরবর্তী সময়ে বড় ক্লাবে পাঠানোর ক্ষেত্রে সালজবুর্গ এক ধরনের ‘ট্রান্সফার বেল্ট’ হিসেবে কাজ করেছে।

২০১৬-১৭ মৌসুমে আরবি লাইপজিগ তাদের প্রথম বড় লক্ষ্যে পৌঁছায়, জায়গা করে নেয় জার্মানির সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতা বুন্দেসলিগায়। বিশ্বকে নিজেদের ফুটবল ও বাণিজ্যিক মডেলের কার্যকারিতা দেখানোর জন্য সেটাই ছিল আদর্শ মঞ্চ। শুরুটা হয় নাবি কেইতাকে দিয়ে। ২০১৮-১৯ মৌসুমে আরবি লাইপজিগ গিনির এই মিডফিল্ডারকে লিভারপুলের কাছে ৬ কোটি ইউরোতে বিক্রি করে। তবে লিভারপুলে গিয়ে প্রত্যাশা অনুযায়ী নিজেকে মেলে ধরতে পারেননি কেইতা।

সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠে আসার পর ক্লাবটি অপেক্ষাকৃত অপরিচিত তরুণ প্রতিভাদের দলে ভেড়ানোর দিকে আরও জোর দেয়। উদ্দেশ্য ছিল তাদের বিকশিত করে ভবিষ্যতের তারকা বানানো এবং পরে বড় অঙ্কে বিক্রি করা। শিগগিরই বাজারে আসে প্রথম বড় সাফল্য। এক বছর পর স্প্যানিশ লিগের পরিচিত মুখ ম্যাথিউস কুনহাকে দলে নেয় লাইপজিগ। ২০ বছর বয়সী ব্রাজিলিয়ানকে ১ কোটি ৮০ লাখ ইউরোতে হার্থা বার্লিনের কাছে বিক্রি করা হয়েছিল। তবে আসল কোটি ইউরোর বন্যা তখনও বাকি।

২০২০-২১ মৌসুমে, করোনাভাইরাস মহামারির প্রভাবের মধ্যেই ক্লাবের বড় তারকা টিমো ভার্নারকে বিক্রি করে লাইপজিগ। চেলসি জার্মান ফরোয়ার্ডের জন্য দেয় ৫ কোটি ৩০ লাখ ইউরো। প্রথম মৌসুমেই চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতা চেলসিতে অবশ্য ভার্নার সেই অর্থের যথাযথ প্রতিদান দিতে পারেননি। লন্ডনের ক্লাবটিই হয়ে ওঠে তার ক্যারিয়ারের অবনতির সূচনাবিন্দু।

২০২১-২২ মৌসুমে বড় ক্লাবগুলোর নজরে আসে লাইপজিগের আরও দুই শক্তিশালী ডিফেন্ডার। বায়ার্ন মিউনিখ ৪ কোটি ২০ লাখ ইউরো দিয়ে দলে নেয় ফরাতি তারকা দায়োত উপামেকানোকে। একই সময়ে আরেক ডিফেন্ডার ইব্রাহিমা কোনাতেকেও লিভারপুলের কাছে ৪ কোটি ইউরোতে বিক্রি করে লাইপজিগ। পরবর্তীতে রিয়াল মাদ্রিদের নতুন সদস্য হওয়া কোনাতে তখনও মাত্র ২২ বছরের তরুণ।

পরের মৌসুমে আটালান্টার কাছে ১ কোটি ৬০ লাখ ইউরোতে আদেমোলা লুকম্যানকে বিক্রি করলেও সেটি আগের লেনদেনগুলোর মতো বড় আলোড়ন তুলতে পারেনি। বড় কোনো ‘ট্রান্সফার বিস্ফোরণ’-এর অপেক্ষায় ছিল সবাই। বড় বিস্ফোরণ ঘটে ২০২৩-২৪ মৌসুমে। ক্রোয়েশিয়ান ডিফেন্ডার ইয়োশকো গাভার্দিওলকে ম্যানচেস্টার সিটির কাছে ৯ কোটি ইউরোতে বিক্রি করে লাইপজিগ। তখন তার বয়স ছিল ২১ বছর। তখনই তাকে ভবিষ্যতের বড় ডিফেন্ডার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল।

একই সময়ে হাঙ্গেরিয়ান মিডফিল্ডার ডমিনিক সোবোজলাই লিভারপুলের নজরে পড়েন। ২২ বছর বয়সী এই শক্তিশালী, দক্ষ ও গতিশীল মিডফিল্ডারের জন্য ইংলিশ ক্লাবটি খরচ করে ৭ কোটি ইউরো। সাবেক এই লাইপজিগ ফুটবলার অ্যানফিল্ডে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এরপরও থামেনি লাইপজিগের ট্রান্সফার-ঝড়। বুন্দেসলিগার সেরা খেলোয়াড়দের একজন ক্রিস্টোফার এনকুনকুকে ৬ কোটি ইউরোতে চেলসির কাছে বিক্রি করে ক্লাবটি।

২০২৪-২৫ মৌসুমে লাইপজিগের সবচেয়ে বড় বিক্রি ছিল স্প্যানিশ তারকা দানি ওলমো। ক্লাবটিতে পাঁচটি সফল মৌসুম কাটানোর পর ওলমো যোগ দেন বার্সেলোনায়। কাতালান ক্লাবটি তার জন্য খরচ করে ৬ কোটি ১০ লাখ ইউরো। গত মৌসুমেও লাইপজিগের ট্রান্সফার ব্যবসা থেমে থাকেনি। স্লোভেনিয়ান ফরোয়ার্ড বেঞ্জামিন সেসকো দুর্দান্ত গতিতে এগোচ্ছিলেন। শেষ পর্যন্ত ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড তাকে দলে নিতে ৭ কোটি ৬০ লাখ ইউরো খরচ করে।

লাইপজিগে নজর কেড়েছিলেন বার্সেলোনার একাডেমির সাবেক খেলোয়াড় জাভি সিমন্সও। তার পারফরম্যান্সে মুগ্ধ হয়ে টটেনহ্যাম হটস্পার তাকে দলে নিতে ৬ কোটি ৫০ লাখ ইউরো খরচ করে। এবার দিয়োমান্দেকে দিয়ে নিজেদের আগের অনেক রেকর্ডই ছাড়িয়ে গেছে আরবি লাইপজিগ। রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেওয়া দিয়োমান্দের জন্য ১২ কোটি ৫০ লাখ ইউরো পেয়েছে জার্মান ক্লাবটি, যা লাইপজিগের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ট্রান্সফার। এ ছাড়া এত কম বয়সী (১৯) কোনো খেলোয়াড়কে এর আগে এত বেশি অর্থে বিক্রি করতে পারেনি ক্লাবটি।

এএইচএস