বিয়ে না করেই প্রায় ১০ বছর একসঙ্গে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও জর্জিনা রদ্রিগেজ। দীর্ঘসময় এক ছাদের নিচে কাটিয়েছেন। পর্তুগিজ তারকা যখন যেখানে গেছেন, সার্বক্ষণিক সঙ্গে ছিলেন জর্জিনা। কিন্তু কখনো তাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে, এমন খবর শোনা যায়নি। একেবারে নিখাঁদ ভালোবাসা এবার পূর্ণতা পেল, এখন তারা স্বামী-স্ত্রী।
মঙ্গলবার অনেকটা আড়ালে থেকেই পাঁচ সন্তানের নিয়ে এক অনাড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে নিজেদের পরিচয় বদলে ফেললেন রোনালদো ও জর্জিনা। অথচ ১০ বছর আগেও কি এমন দিনের কথা ভেবেছিলেন তারা! এই দিনটির কথা তারা ভেবেছিলেন ঠিক এক বছর আগে। গত বছরের ১১ আগস্ট বাগদান সেরে শিরোনামে আসেন দুজনে। আংটি দেওয়া-নেওয়ার বর্ষপূর্তিতে বিয়ের পিঁড়িতে বসলেন তারা।
একেবারে সাধারণ পরিবারের মেয়ে জর্জিনা। স্প্যানিশ বাবা ও আর্জেন্টাইন মায়ের সন্তান। স্পেনের জাকায় বড় হওয়া জর্জিনা ১৮ বছর বয়সে মাদ্রিদে পা রাখেন, বদলে যায় ভাগ্যের চাকা। এখন তিনি গ্লোবাল আইকন। মূলত উচ্চাকাঙ্ক্ষাই তাকে এই পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। রোনালদোর প্রেমিকার বাইরেও আছে তার প্রভাবশালী পরিচয়। ২০২২ সালে এল পাইস-কে তিনি বলেছিলেন, ‘পেশাদারভাবে আমি নিজেকে একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী মানুষ ভাবি। কারণ শেষ পর্যন্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষাই আপনাকে সবকিছু নিখুঁতভাবে করতে উদ্বুদ্ধ করবে এবং সবকিছু সঠিক পথে নেবে।’

উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে জর্জিনার শুরুটা হয়েছিল ছোটখাটোভাবে। প্রথমে একটি বিখ্যাত স্প্যানিশ প্রিমিয়াম পোশাক ও ফ্যাশন ব্র্যান্ড মাসিমো দুত্তির সঙ্গে কাজ শুরু করেন। তারপর ইতালিয়ান ফ্যাশন স্টোর গুচিতে, সেখানেই তৎকালীন রিয়াল মাদ্রিদ তারকা রোনালদোর সঙ্গে দেখা। ২০১৬ সালের জুলাইয়ে বিশ্বের অন্যতম সেরা তারকার সঙ্গে দেখা। তাকে দেখে গুচির এই শপ অ্যাসিস্ট্যান্টের মনে এক অন্যরকম অনুভূতি জন্মেছিল, যেটাকে তিনি বলেছিলেন, ‘লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট’। প্রথম দেখাতেই রোনালদোর প্রেমে পড়েন যান জর্জিনা। তার মনে হয়েছিল, তারা জন্মেছেন একে অপরের জন্য।
ওই দিন তাদের মধ্যে সেভাবে আলাপও হয়নি। কিন্তু মনের ভেতরে একটা টান নিয়েই তারা নিজ নিজ কাজে ফিরে যান। কাজের বাইরে তাদের দেখা হতে সময় লাগেনি। অপেক্ষা ফুরায় আরেকটি ব্র্যান্ডের ইভেন্টে। ব্যস, একে অপরকে যতটুকু চেনা যায়, সেই সুযোগে চিনে নিয়েছিলেন তারা।

তখনও দুজনের সম্পর্ক প্রকাশ্যে আসেনি। কিন্তু দ্রুত কিছু ছবিতে তাদের একসঙ্গে খুঁজে পান ভক্ত-সমর্থকরা। ২০১৬ সালের শেষ দিকে প্যারিসের ডিজনিল্যান্ডে ডেট করেন তারা। ওইসময় নিজেকে আড়াল করতে পরচুলা ও সানগ্লাস ব্যবহার করেছিলেন রোনালদো। কিন্তু ব্যর্থ হন। লাল গালিচায় দুজনকে সর্বপ্রথম দেখা যায় ২০১৭ সালের শুরুতে দ্য বেস্ট ফিফা ফুটবল অ্যাওয়ার্ডসে। একই বছরের শেষ দিকে তাদের ঘরে আসে প্রথম সন্তান, অ্যালানা মার্তিনা। এছাড়া রোনালদো সারোগেশনের মাধ্যমে নেওয়া দুই যমজ সন্তান ইভা ও মাতেও-র মা হিসেবেও পরিচিত হন জর্জিনা।
২০১৮ সালে রোনালদো যখন রিয়াল মাদ্রিদ থেকে জুভেন্টাসে যান, তখন তুরিনেও এই দম্পতি একসঙ্গে বাস করতেন। এমনকি সিআরসেভেনের ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে প্রত্যাবর্তনেও সঙ্গী ছিলেন জর্জিনা। আল নাসরের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হলে রোনালদোর সঙ্গে সৌদি আরবেও যান তিনি।
তাদের পরিবারে সব মিলিয়ে পাঁচ সন্তান। রোনালদোর বড় ছেলে ক্রিশ্চিয়ানো জুনিয়র, যদিও তার জৈবিক মায়ের পরিচয় কখনও জানাননি পর্তুগিজ তারকা। রোনালদোর সঙ্গে সম্পর্কের পর জর্জিনার গর্ভের সন্তান দুজন- অ্যালানার পর বেল্লা এসমারালদা। সম্পর্কে কোনো ধরনের ঝামেলা না থাকলেও ২০২২ সালের এপ্রিলে এক বিয়োগান্তক ঘটনার মুখোমুখি হন রোনালদো ও জর্জিনা। বেল্লার সঙ্গেই জন্মেছিল আরেক সন্তান অ্যাঞ্জেল। কিন্তু জন্মের সময় মারা যায় নবজাতক ছেলে।
সেই ঝড়ও সামলে নিতে একে অপরের পাশে দাঁড়ান রোনালদো ও জর্জিনা। পিয়ার্স মরগানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেই শোকের কথা জানান ৪১ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড, ‘সম্ভবত সেই সময়ে আমাদের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়েছিল। সময়টা খুব কঠিন ছিল, কিন্তু আমি অনেক কিছু শিখেছি। আমি জীবনের অন্য একটি দিক দেখতে পেয়েছি। আমার মেয়ে... সে পরিবারের রানী এবং ঘরটাকে আনন্দে ভরিয়ে রাখে।’

একে অপরের প্রতি দৃঢ় ভালোবাসা এবং সন্তানদের নিষ্পাপ মুখ ওই কষ্টের সাগর পাড়ি দিতে সাহায্য করেছিল রোনালদো-জর্জিনাকে। রোনালদোর তারকাখ্যাতির সঙ্গে জর্জিনাও নিজের চেষ্টা আর পরিশ্রমে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। ফ্যাশন ও ব্যবসার দুনিয়ায় একজন খ্যাতনামা নারী তিনি। ভোগ, হার্পার্স বাজার, এল্লে, গেস, গুচি, প্রাদা ও চ্যানেলের মতো ব্র্যান্ডের সঙ্গে সম্পর্ক তার। এত ব্যস্ততার মাঝেও সাত জনের সংসার দারুণভাবে সামলে রেখেছেন জর্জিনা।
বিয়ের আইনি প্রক্রিয়ায় না গেলেও মাঝেমধ্যে জর্জিনাকে স্ত্রী হিসেবে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন রোনালদো। আর তার সাংসারিক দক্ষতায় মুগ্ধ তিনি। মরগানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি প্রশংসায় ভাসিয়েছিলেন জর্জিনাকে, ‘জো অনন্য। সে আমার, পরিবার ও ঘরের যত্ন নেয়। অনেক কাজ করে সে। জর্জিনা এমন একজন, যে আমাকে বোঝে, যত্ন নেয় এবং আমি জীবনে এটাই চাই। সবকিছুর পেছনে কারণ থাকে। আমরা একটি আশীর্বাদপুষ্ট পরিবার। আমি এটা নিয়ে গর্বিত।’

মাঠের বাইরেও রোনালদোও একজন অসাধারণ প্রেমিক। এই যেমন বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন নাটকীয়ভাবে। বাসায় এক পারিবারিক নৈশভোজের পর ছোট দুই মেয়ে ইভা ও অ্যালানা ঘুম থেকে উঠে একটি আংটির বক্স দেখতে পান। তাদের হাতের সেই বক্স খুলে হীরার আংটি দেখে বুঝতে পারেন রোনালদোর বিয়ের ইচ্ছার কথা। ৬০ লাখ ইউরোর সেই আংটি পেয়ে জর্জিনাও এক পায়ে রাজি হয়ে যান, ‘হ্যাঁ, আমি রাজি। এই জীবনে এবং আমার অন্য সব জনমেও।’
অবশেষে সেই ক্ষণ এসে গেল। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী অ্যাথলেট রোনালদো ইচ্ছা করলেই কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিয়ে সেরে ফেলতে পারতেন, যেটা হতে পারত সেঞ্চুরির অন্যতম সেরা বিয়ে। উচ্চাকাঙ্ক্ষী জর্জিনাও জাকজমকপূর্ণ আর হইচই ফেলে দিয়ে বিয়েটা করতে পারতেন। কিন্তু ওসব লোক দেখানো আয়োজনে তারা যাননি, নিখাঁদ ভালোবাসাকে পবিত্র বন্ধনে বেঁধে ফেলেছেন পরিবারের সন্তানদের নিয়েই।
এফএইচএম
