বিজ্ঞাপন

ভোরে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট

হুকসের কটূক্তি, ওয়াহর প্রেরণা—এবার মাথা উঁচু রাখতে পারবে বাংলাদেশ?

হুকসের কটূক্তি, ওয়াহর প্রেরণা—এবার মাথা উঁচু রাখতে পারবে বাংলাদেশ?

২৩ বছর পর আবারও অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে নামছে বাংলাদেশ। ২০০৩ সালের সেই দলের কেউ নেই বর্তমান স্কোয়াডে। সময় বদলেছে। বদলে গেছে ক্রিকেট দুনিয়াও। টেস্ট ক্রিকেটেও এসেছে অনেক পরিবর্তন। সে সময়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের নবীন বাংলাদেশ এত বছর পর কতটা বদলেছে এটা এখনও বড় প্রশ্নই। 

তবে আশার কথা হচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে লাল বলের ক্রিকেটে ছন্দে আছে বাংলাদেশ। আইসিসি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ২০২৫–২০২৭ চক্রে বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত খেলেছে ৪টি টেস্ট। শান্ত-তাসকিনরা চলমান টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে ৪ ম্যাচ খেলে ২ জয় এবং ১টি করে ড্র ও হার দেখেছে। ৫৮.৩৩ শতাংশ পয়েন্ট নিয়ে এই মুহূর্তে টেবিলে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। 

নতুন প্রজন্মের হাত ধরে ইতিবাচক মনোভাব নিয়েই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে লড়তে চায় বলে জানিয়েছেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। ২০০৩ সালের সেই দল আর নেই বলে জানালেন, ‘আমি নির্বাচকের সঙ্গে কথা বলছিলাম। তিনি বলছিলেন, ২৩ বছর আগের সেই দলের সঙ্গে এই দল আর এক নয়। এই দলের ওপর তার বিশ্বাস আছে।’

ডারউইনে আগামীকাল নাজমুল হোসেন শান্ত যখন প্যাট কামিন্সের সঙ্গে টসে নামবেন, আলোচনা তখন মাঠের ক্রিকেট ঘিরেই থাকবে। তবে ২৩ বছর আগে ২০০৩ সালে যখন বাংলাদেশ দল প্রথমবার টেস্ট সিরিজ খেলতে অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়েছিল, তখন পরিস্থিতি ছিল একেবারেই আলাদা। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নতুন পদার্পণ করা বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সামনে তখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বিশ্ব ক্রিকেটের পরাশক্তি অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাদেরই মুখোমুখি হওয়া। 

তৎকালীন স্টিভ ওয়াহর নেতৃত্বাধীন অজি দলটি তখন বলা চলে বিশ্ব ক্রিকেটের অজেয় শক্তি। অন্যদিকে, মাত্র কয়েক বছর আগে টেস্ট মর্যাদা পাওয়া বাংলাদেশ দল তখনও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের কন্ডিশন ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার লড়াইয়ে।

নবীন বাংলাদেশকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিলেন স্টিভ ওয়াহ। গেটি ইমেজ সংগৃহীত

সেবারের সিরিজের আগে অস্ট্রেলিয়ান সাবেক ব্যাটার ডেভিড হুকসের বাংলাদেশকে নিয়ে ‘অপমানজনক’ একটি কলাম ব্যাপক শোরগোল ফেলে দিয়েছিল। সিডনি মর্নিং হেরাল্ডে লেখা এক কলামে তিনি লিখেছিলেন, স্টিভ ওয়াহর দলের উচিত দুটি টেস্টই একদিনের মধ্যে শেষ করে বাংলাদেশকে চূড়ান্ত অপদস্থ করা। আরও বলেছিলেন, টেস্ট ক্রিকেট খেলার কোনো যোগ্যতা বাংলাদেশের নেই এবং মাঠের লড়াইয়ে তাদের কোনো রকম সহানুভূতি দেখানো উচিত নয়। অস্ট্রেলিয়া দল যদি টেস্ট ক্যাপের প্রতি সৎ থাকতে চায়, তবে তাদের লক্ষ্য হবে মাঠে নেমে বাংলাদেশকে একবারে গুঁড়িয়ে দেওয়া।

হুকসের এমন আক্রমণ নজর এড়ায়নি বাংলাদেশের ক্রিকেটারদেরও। এ সময় টাইগার ক্রিকেটারদের পাশে দাঁড়িয়ে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন খোদ অজি অধিনায়ক স্টিভ ওয়াহ। সম্প্রতি সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে ক্রিকবাজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সুজন বলছিলেন, স্টিভ ওয়াহ হঠাৎ এসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা কি খবরের কাগজ পড়ো? ডেভিড হুকসের মন্তব্য দেখেছ?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ দেখেছি।’ তিনি তখন আমাকে বললেন, ‘ওসব নিয়ে একদম ভাববে না। ওটা একটা পাগলের কথা! আমি বিশ্বাস করি তোমরা এর চেয়ে অনেক ভালো দল এবং আমাদের বিরুদ্ধে ভালো খেলবে। অল দ্য বেস্ট।’"

প্রতিপক্ষ অধিনায়কের এই সহানুভূতি ও সম্মান পুরো বাংলাদেশ দলের আত্মবিশ্বাস এক লহমায় বাড়িয়ে দিয়েছিল। যদিও ম্যাচের ফলাফলটা প্রত্যাশিতই ছিল। সিরিজের দুটি টেস্টেই ইনিংস ব্যবধানে হেরে যায় বাংলাদেশ। ১ম টেস্ট ৩ দিনে, ২য় টেস্ট ৪ দিনে শেষ হয়।

এবারের সিরিজের আগেও ঘুরেফিরে এসেছে টেস্টের দৈর্ঘ্য প্রসঙ্গ। স্টিভ ওয়াহ থেকে এতদিনে অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়কত্বের আর্মব্যান্ড উঠেছে প্যাট কামিন্সের কাঁধে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের নেতৃত্বে নাজমুল হোসেন শান্ত। সফরকারীদের বিপক্ষে টেস্ট তিন দিনে শেষ হতে পারে নাকি পুরো পাঁচ দিন হবে—এমন প্রশ্ন ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছিল প্যাট কামিন্সকেও।

কামিন্সের কাছে টেস্টের ফলাফল বা স্থায়িত্ব আগেভাগে অনুমান করা কঠিন। অধিনায়কের উত্তর, ‘কে জানে?’ তবে বাংলাদেশকে সহজ প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখছেন না কামিন্স। বরং অজানা চ্যালেঞ্জও দেখছেন তিনি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের বড় কিছু জয়ও তার নজরে রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক বলেন, ‘আমি মনে করি না, আমি কখনো সহজ কোনো টেস্ট ম্যাচ খেলেছি। তাই নিশ্চিতভাবেই তারা শক্তিশালী হবে। তাদের কয়েকজন খেলোয়াড়কে আমরা আগে খুব বেশি দেখিনি, ফলে টেস্ট ম্যাচে নামার আগে কিছুটা অজানা ব্যাপার থাকবেই। তবে গত কয়েক বছরে তারা বড় কিছু জয় পেয়েছে এবং দলে বেশ কিছু শক্তিশালী প্রতিভা আছে। তাই আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।’

অন্যদিকে, টেস্ট ম্যাচ কতদিন চলবে, সেটি নিয়ে আগেভাগে চিন্তা না করে পুরো পাঁচ দিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার দিকেই বাংলাদেশের মনোযোগ। শান্ত বলেছেন, ‘খেলোয়াড় হিসেবে আমরা সবসময় পাঁচ দিন ক্রিকেট খেলতে চাই। পাঁচ দিন ভালো ক্রিকেট খেলতে চাই এবং সেশন ধরে ধরে এগোতে চাই। ম্যাচ চার দিন, পাঁচ দিন কিংবা তিন দিনেই শেষ হোক। এসব আলোচনা সবসময়ই থাকবে। কিন্তু খেলোয়াড় হিসেবে আমাদের লক্ষ্য একটাই, আমরা যতটা ভালোভাবে সম্ভব খেলতে চাই।’

২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ায় ফেরাকে শান্ত দেখছেন খুব ভালো একটি সুযোগ হিসেবে। অপরিচিত কন্ডিশন এবং অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বমানের বোলিং আক্রমণের চ্যালেঞ্জ থাকলেও তিনি ইতিবাচক, ‘২৩ বছর পর আবার এখানে আসতে পারাটা আমাদের জন্য সৌভাগ্যের। আশা করি আমরা ভালো ক্রিকেট খেলবো। আমরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাই।’ প্রসঙ্গত, দুই দলের টেস্ট সিরিজে এটি হবে মাত্র চতুর্থ সাক্ষাৎ। ২০১৭ সালে মিরপুরে অস্ট্রেলিয়াকে ২০ রানে হারানোই এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের একমাত্র টেস্ট জয়ের সাফল্য।

এফআই