জাতীয় দলের হয়ে গেল বছর তিনেক সাদা বলের ক্রিকেটে নিয়মিত তানজিদ হাসান তামিম। তবে এই সময়ে লাল বলের ক্রিকেটে খেলার সুযোগ পেয়েছেন কেবল একটি ম্যাচ। সেটিও ঘরের মাঠে পাকিস্তানের বিপক্ষে। চলমান অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজের দলে সুযোগ পেয়ে যান তানজিদ, তবে একাদশে থাকবেন কি না সেই বিষয়ে ছিল অনিশ্চয়তা।
সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ডারউইন টেস্টে খেলছেন তামিম। প্রথমবার অজিদের মাটিতে টেস্ট খেলতে নেমেই নিজেকে চেনালেন ভিন্ন রূপে। গতকাল শুরু থেকেই দেখেশুনে খেলে অবশেষে আজ দ্বিতীয় দিনের দ্বিতীয় সেশনে সেঞ্চুরি তুলে নিয়েছেন তানজিদ তামিম। অজি বোলারদের ওপর পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন টাইগার এই ওপেনার।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে কোনো বাংলাদেশি ব্যাটারের এটাই প্রথম সেঞ্চুরি। অবশ্য সেঞ্চুরির পর বেশিক্ষণ টিককে পারেননি। নাথান লায়নের টসড আপ ডেলিভারিটি সামনে এগিয়ে এসে উড়িয়ে মারতে গিয়ে বল বেশ উঁচুতে তুলে দেন তামিম। পরে লং অফ থেকে বামে সরে এসে দারুণ একটি ক্যাচ লুফে নেন মিচেল স্টার্ক। ১৯৭ বলে ১০১ রান করে বিদায় নিতে হয় তামিমকে। তার ইনিংসটি সাজানো ছিল আটটি চার ও একটি ছক্কা দিয়ে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এমন ইনিংসে বিশ্বব্যাপী প্রশংসায় ভাসছেন টাইগার এই ওপেনার।
অস্ট্রেলিয়ার সাবেক কিংবদন্তিদেরও চোখে পড়েছে তামিমের ব্যাটিং। এমনকী বাংলাদেশের সাবেক প্রধান কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহও খেলা দেখে মুগ্ধতার কথা জানালেন। তার সময়েই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয় তানজিদ তামিমের। যে কারণে বেশ কাছ থেকেই তাকে চেনেন এই কোচ। হাথুরু বর্তমানে বসবাস করছেন অস্ট্রেলিয়াতে। তানজিদের ব্যাটিং দেখতে তিনিও ভুল করেননি।
ঢাকা পোস্টের সঙ্গে আলাপকালে এই কোচ জানান টাইগার ওপেনারের দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ের কথা। হাথুরুসিংহে বলছিলেন, 'আমি খেলা দেখেছি, সবার দিকেই তীক্ষ্ণ নজর রেখেছিলাম। কেবল ব্যাটারদের দেখেছি এমন না বোলারদেরও দেখেছি। তানজিদ দারুণ ব্যাটিং করেছে, প্রশংসা পাওয়ার মতোই।'
টাইগার পেসার হাসান মাহমুদের ৬ উইকেটের কীর্তি, তাসকিন-এবাদতদের দারুণ বোলিং নিয়েও কথা বলেছেন টাইগারদের সাবেক এই প্রধান কোচ, 'হাসানসহ বাকি দুই পেসার অসাধারণ বল করেছে, দেখার মতো। তাদের লাইন এবং লেন্থ দেখলেই বুঝবেন কতটা দুর্দান্ত ছিল তারা।'

এদিকে বাংলাদেশ দলের সাবেক নির্বাচক এবং বিসিবির বর্তমান অনূর্ধ্ব-১৯ দলের প্রধান কোচ হান্নান সরকারও খুশি তানজিদ তামিমের এমন ব্যাটিংয়ে। তার খু্শির আরও একটা বড় কারণ, সেই উঠতি বয়স থেকেই তামিমকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে হান্নানের। বয়সভিত্তিক দলের নির্বাচকের পদে কাজ করার সুবাদে ছোট থেকেই তামিমকে কাছ থেকে পরখ করা হান্নানের।
তানজিদের এমন ইনিংস নিয়ে ঢাকা পোস্টকে হান্নান বললেন, 'তানজিদ সাদা বলের নিয়মিত পারফর্মার। অনেক বছর ধরে খেলে যাচ্ছে সে। তবে লাল বলের ক্রিকেটে তার সময়ের ব্যাপার ছিল, এত তাড়াতাড়ি সবকিছু সে গ্রহণ করতে পারবে এটা চিন্তা করিনি।'
'ঘরোয়া ক্রিকেটে তার লম্বা সময় ধরে লাল বলের ক্রিকেটে রান করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। জাতীয় দলের আসার আগে ঢাকা লিগে ব্রাদার্স ইউনিয়নের হয়ে কাজ করেছিলাম তার সঙ্গে। বগুড়াতে তখন আলাপ হয়েছিল লাল বলে রান পাচ্ছিল তবে সাদা বলে কঠিন সময় পার করছিল। লঙ্কার ভার্সনে সে ঘরোয়াতে নিয়মিত রান করেছে।'
টেস্ট ক্যারিয়ারে নিজের দ্বিতীয় ম্যাচেই তানজিদ সেঞ্চুরির দেখা পেয়ে যাবেন এমনটা ভাবা হয়তো খুব তাড়াহুড়ো বলা যায়। যদিও বিষয়টা অন্যভাবে ভাবছেন হান্নান, 'তামিম অনেক বছর ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলছে। সেই দিক থেকে তার অভিজ্ঞতা রয়েছে যদিও অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সেঞ্চুরি অনেক বড় কিছু। এ ছাড়া ঘরোয়াতে কিন্তু সে চারদিনের ম্যাচে অনেক রান করেছে, সেই অভিজ্ঞতা তো তার ছিলই। সেই জায়গা থেকে এমন ইনিংস খেলা দারুণ ব্যাপার।'
এমন ইনিংস নিশ্চিতভাবে এখন পর্যন্ত তার ক্যারিয়ার সেরা। এ নিয়ে হান্নান বলেন, 'তার ক্যারিয়ারের এটা সেরা ইনিংস কি না এটা সে-ই (তানজিদ) বলতে পারবে। তবে আমার দেখা টপ ক্লাস ইনিংসের একটা হয়ে থাকবে। তামিমের সঙ্গে অনেক কোচই কাজ করেছে, আমিও করেছি। যখন সেই খেলোয়াড় ভালো করে তখন কোচের আনন্দ থাকবে ভালো লাগা থাকবে এটা স্বাভাবিক। আমারও ভালো লাগছে।'
তানজিদ তামিম ২০২০ যুব বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য ছিলেন। সেই দলের প্রধান কোচ ছিলেন নাভিদ নেওয়াজ। সাবেক শিষ্যের এমন ব্যাটিংয়ে উচ্ছ্বসিত এই কোচও। ঢাকা পোস্টকে নাভিদ বলছিলেন, ' প্রথমত আমি বেশি খুশি সাদা বল থেকে লাল বলে সুযোগ পেয়ে দ্রুত মানিয়ে নেওয়াটা। বড় বিষয় অস্ট্রেলিয়ার মতো বিশ্বের বড় একটি দলের বিপক্ষে সে যেভাবে ব্যাট করেছে মনেই হয়নি যে এটি তার দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক টেস্ট ম্যাচ।'
এসএইচ/এফআই
