ক্রিকেট পরাশক্তি অজিদের বুক বিদীর্ণ করে দেওয়া পেস আর বাউন্সের গর্জনে ২৩ বছর পর তাদের ডেরায় গিয়ে টেস্ট জয়ের এক অবিস্মরণীয় মহাকাব্য লিখে ফেলল বাংলাদেশ। আপাতদৃষ্টিতে ক্রিকেট বিশ্বের অনেকের কাছে এটি হয়তো বড় এক অলৌকিক ঘটনা বা অঘটন বা রূপকথার গল্প। কিন্তু স্কোরকার্ডের আড়ালে লুকিয়ে থাকা রক্তঘামের লড়াই আর চার দিনের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করলে সত্যটা পরিষ্কার হয়ে যায়- এই জয় ভাগ্যের দান নয়, কোনো অঘটনও নয় এটি, বরং অজিদের দম্ভ চূর্ণ করে অদম্য বাংলাদেশের নিজেদের অধিকার বুঝে নেওয়ার এক অসাধারণ গল্প এটি।
ইতিহাস তৈরির এই প্রেক্ষাপট রচনা শুরু হয়েছিল ম্যাচের প্রথম দিনেই, যখন কন্ডিশনের হুমকিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ডারউইনের বাইশ গজে আগুন ঝরান বাংলাদেশের পেসাররা। হাসান মাহমুদের নিখুঁত আউটসুইঙ্গার আর তাসকিন-এবাদত জুটির পেস তাণ্ডবে ডারউইনের কন্ডিশন স্বাগতিকদের জন্যই হয়ে ওঠে বিষাদময়।
হাসানের বোলিং আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় স্বাগতিকদের প্রথম ইনিংস। একাই ৬ উইকেট তুলে নিয়ে হাসান যখন অজিদের টপ-অর্ডার ধসিয়ে দিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই বিশ্ব ক্রিকেটের মানচিত্রে নতুন এক বাংলাদেশের উত্থানের বার্তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ওইদিন দিনের শেষে কোনো ক্ষতি ছাড়াই ৪৫ রান তুলে যেন অজিদের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেয় টাইগাররা।

প্রথম দিনের সেই আত্মবিশ্বাসের আগুনে ডানা মেলে বাংলাদেশি ব্যাটারদের রুদ্ররূপ, ম্যাচের দ্বিতীয় দিন তারা অজিদের ঠেলে দেয় ব্যাকফুটে। ডারউইনের পেস সহায়ক উইকেটে অজি বোলারদের শাসন করে তানজিদ হাসান তামিম খেলেন দৃষ্টিনন্দন ১০১ রানের এক মহাকাব্যিক ইনিংস। তার প্রথম সেঞ্চুরির পাশাপাশি অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর দৃঢ়তাপূর্ণ ৮৪ এবং অলরাউন্ডার মেহেদী হাসান মিরাজের ৬৫ রানে ভর করে বাংলাদেশ শুধু অজিদের সংগ্রহকেই পার করেনি, নিজেদের নিয়ে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।
তবে ম্যাচের গল্পে সবচেয়ে বড় মোড় আসে তৃতীয় দিনে, যখন ১ম ইনিংসে ৪২৬ রানের বিশাল পাহাড়ে চড়ে ২২৮ রানের বড় লিড নেয় বাংলাদেশ। ব্যাকফুটে থাকা অজিরা ক্যামরুন গ্রিনের ধৈর্যশীল ১০৪ রানে ভর করে ঘুরে দাঁড়ানোর শেষ চেষ্টা চালিয়েছিল। কিন্তু পেসারদের তৈরি করে দেওয়া ভিতে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন স্পিন জাদুকর মেহেদী হাসান মিরাজ। গ্রিনের প্রতিরোধ ভেঙে মিরাজের ঘূর্ণি বিষে (৬৬ রানে ৫ উইকেট) তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংস। বাংলাদেশ পায় জয়ের জন্য মাত্র ৫৭ রানের মামুলি এক লক্ষ্য।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ৫৭ রানের লক্ষ্য সহজ মনে হলেও ইতিহাস বলে, এই কন্ডিশনে যেকোনো ছোট লক্ষ্যও স্নায়ুচাপের পাহাড় হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে ইতিহাস বদলাতে যাওয়া বাংলাদেশ সেই ফাঁদে পড়েনি। কোনো রকম তাড়াহুড়ো না করে, বুক চিতিয়ে ১ উইকেট হারিয়েই জয়ের বন্দরে পৌঁছে যায় সফরকারীরা। দুই ইনিংস মিলিয়ে ৯ উইকেট তুলে নিয়ে ম্যাচের নায়ক বনে যান হাসান মাহমুদ। তবে জয়টি হয়ে থাকে পুরো দলের সম্মিলিত আত্মবিশ্বাসের।

বাংলাদেশের ঐতিহাসিক এই জয়ে দারুণ উচ্ছ্বসিত ধারাভষ্যকার ইয়ান বিশপ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাবেক এই নিজের এক্স অ্যাকাউন্টে লিখেছেন, ‘বাংলাদেশ ক্রিকেট এবং বাংলাদেশের জনগণের জন্য এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অর্জন। যারা আগে তাদের প্রাপ্য প্রশংসা বা স্বীকৃতি দিতে কার্পণ্য করেছে, তাদের কাছ থেকে এখন যথাযথ সম্মান ও স্বীকৃতি পাওয়ার পূর্ণ অধিকার তাদের রয়েছে।’
এরপরও প্রশ্ন উঠতেই পারে, বিশ্বের অন্যতম সেরা দলকে তাদেরই মাটিতে এভাবে ধসিয়ে দেওয়া কি আসলেই হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা? এর উত্তর লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের টেস্ট মানসিকতার সাম্প্রতিক বিবর্তনে। রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তানকে তাদেরই ঘরের মাঠে ২-০ ব্যবধানে হোয়াইট ওয়াশ করা মোটেও কোনো কাকতালীয় ঘটনা ছিল না। সেই সিরিজ যেমন প্রমাণ করেছিল টাইগাররা এখন শুধু মিরপুরের ধীরগতির উইকেটের ওপর নির্ভরশীল নয়, তেমনি চলতি বছরে ঘরের মাঠে পাকিস্তানকে ফের হোয়াইটওয়াশ করে বাংলাদেশ বুঝিয়ে দিয়েছিল লাল বলের ক্রিকেটে তারা এখন যেকোনো পরাশক্তিকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার সামর্থ্য রাখে।

একসময় যেসব উইকেটে বাংলাদেশি পেসারদের দেখা যেত কেবল ওভার পার করার ভূমিকায়, এখন সেই কন্ডিশনেই প্রতিপক্ষের ১৪ উইকেট শিকার করছেন হাসান-তাসকিনরা। শুধু লাল বলেই নয়, ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়াকে ওয়ানডেতে ধসিয়ে দেওয়ায় যে আত্মবিশ্বাস মনে গেঁথে গিয়েছিল, ডারউইনের বাইশ গজে প্রথম ওভার থেকেই তার প্রতিচ্ছবি দেখা গেছে। অজিরা যে অপরাজেয় নয়—এই বিশ্বাসই টাইগারদের ভেতরে তৈরি করেছিল জয়ের ক্ষুধা।
ডারউইনের এই ঐতিহাসিক জয় আকাশ থেকে পড়া কোনো সাফল্য নয়। পাকিস্তানের মাটিতে টেস্ট সিরিজ জয় থেকে শুরু করে রঙিন পোশাকে অজিদের চূর্ণ করার যে ধারাবাহিকতা, এটিই এখন বাংলাদেশ। ডারউইন কেবল নতুন এই বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরল দাপুটে রূপে।
এমএমএম/
