বাংলাদেশের জন্য এই জয় কতটা বড় ছিল? সংবাদ সম্মেলনে কথা বলার আগেই সফরকারী অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত ও তার সতীর্থরা তাদের প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে একটি অভিনন্দন জানানো ভিডিও কল পেয়েছিলেন।
অস্ট্রেলিয়ার এই পারফরম্যান্স কতটা বাজে ছিল? দেশের প্রতিটি তরুণ ব্যাটারেরই উচিত তাদের নিজ নিজ ফোন সাথে রাখা, কারণ জাতীয় নির্বাচকদের কাছ থেকে আগামী মঙ্গলবার ম্যাকেই টেস্ট স্কোয়াডে যোগ দেওয়ার ফ্লাইটের জন্য একদম ভিন্ন ধরনের একটি ফোন কল আসলেও আসতে পারে। ম্যাট রেনশ, ক্যাম্পবেল কেল্লাওয়ে, স্যাম কনস্টাস, অলি পিকদের হয়তো সময় আসছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বেশি লাল বলের ক্রিকেট খেলা একটি দলের বিপক্ষে এটিকে কেবলই ‘প্রস্তুতির অভাব’ বা ‘মরিচা পড়া পারফরম্যান্স’ হিসেবে দেখার একটি প্রবৃত্তি অস্ট্রেলিয়ার থাকতে পারে, কিন্তু সেটি হবে একটি বিরাট ভুল। এর বদলে এটিকে মাররারা স্টেডিয়ামের ওপর দিয়ে মাঝে মাঝে উড়ে যাওয়া মিলিটারি জেটের বিকট শব্দের মতোই এক জোরালো ‘ওয়েক-আপ কল’ বা সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা উচিত।
বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ায় এসেছিল হারারেতে তাদের সাম্প্রতিকতম টেস্ট ম্যাচে জিম্বাবুয়ের কাছে বিধ্বস্ত হয়ে। সেই সফরে পাওয়া সাইড স্ট্রেইনের চোটের কারণে দলে ছিলেন না তাদের দ্রুততম ও সম্ভবত সেরা পেস বোলার নাহিদ রানা। গত সপ্তাহে একটি প্রস্তুতি ম্যাচে নির্ভুল তবে তেমন ভয়ংকর নয়, এমন সুইং বোলিং করা তরুণ বাঁহাতি বোলার ক্যাম্পবেল থম্পসনের বলে মাত্র ৫৪ রানে অলআউট হয়ে তারা ইন্টারনেটে ছোটখাটো এক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
‘টাইগার’ নামে পরিচিত এই টেস্ট দলটি সবদিক বিচারে ২০১৭, ২০১৯ বা ২০২০ সালের দলের চেয়ে ২০২৬ সালের রিচমন্ডের মতো করেই যেন খেলছিল। কিন্তু এই ম্যাচের প্রথম সকাল থেকেই ভাবনা এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দুই দলের মধ্যে বাংলাদেশই ছিল অনেক বেশি ধারালো।
অভিজ্ঞ ফিল সিমন্সের অধীনে তারা একটি নতুন পিচকে যেভাবে মূল্যায়ন করার দরকার ঠিক সেভাবেই দেখেছিল, প্রথমে ফিল্ডিং বেছে নেওয়ার একটি সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে। অস্ট্রেলিয়া যেমন ভেবেছিল পিচ সেটেল হওয়ার পর ব্যাট করা সহজ হবে, বিষয়টিকে জটিল করে দেখার সেই পথে বাংলাদেশ হাঁটেনি।
প্যাট কামিন্সের জন্য প্রথমে ব্যাটিং করার সিদ্ধান্তটি সঠিক হতে পারতো, যদি তার টপ অর্ডার ঐতিহ্যবাহী টেস্ট ম্যাচের মতো লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রাখত। কিন্তু সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স বিচারে তারা সেই লড়াইয়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ধারাবাহিকতাহীন। প্রথম দিনের কঠিন পরিস্থিতি কিংবা তার দুই একদিন পরের অনেক সহজ কন্ডিশনে খেলতে ব্যর্থ হওয়ার পর জেইক ওয়েদারল্ড ও মার্নাস লাবুশেনকে দলে রাখা নিয়ে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ট্র্যাভিস হেডের খেলার ধরণে সবসময়ই ঝুঁকি থাকবে। আর সেই কারণেই গত পাঁচ বছরে স্মরণীয় সব মুহূর্ত উপহার দেওয়া সত্ত্বেও টেস্টে তার গড় ৪০-এর সামান্য কিছু বেশি। গত দুই বছরে প্রায় কোনো ভুল না করা অ্যালেক্স ক্যারি ও বেউ ওয়েবস্টার উভয়েরই একটি ম্যাচ খারাপ যাওয়ার কথা ছিল। অন্যদিকে স্টিভ স্মিথ নিজের সেরা ছন্দে না দেখিয়েও লড়াই করে গেছেন।
এই সপ্তাহে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ের একমাত্র ইতিবাচক ব্যাপার হলো ক্যামেরন গ্রিনের ইনিংস। ৫ নম্বরে ব্যাট করার সুযোগ পেয়ে প্রথম ইনিংসে তিনি কিছুটা ভুল সিদ্ধান্ত নিলেও দ্বিতীয় ইনিংসে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী বেশ বিচক্ষণ ও শক্তিশালী ইনিংস উপহার দিয়েছেন। শেফিল্ড শিল্ডে আধিপত্য বিস্তারকারী খেলোয়াড়ের সেই পুরোনো কৌশলে ফিরে গেলেন। আর সেই আত্মসংকল্পের মধ্যেই তিনি হয়তো তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের আসল চাবিকাঠি খুঁজে পেয়েছেন।
২৭ বছর বয়সী গ্রিনের এই পারফরম্যান্স এটাও দেখিয়ে দিয়েছে যে তরুণদের মধ্যেই অস্ট্রেলিয়া দল তাদের ভালো করার বেশি সুযোগ বা সম্ভাবনা খুঁজে পেতে পারে। যেসব তরুণ খেলোয়াড় এখনও ব্যাগি গ্রিন ক্যাপ পরেননি অথবা খুব কম খেলার সুযোগ পেয়েছেন, তারাই জাতীয় দলকে চাঙ্গা রাখতে পারেন।
ব্যাটিং পারফরম্যান্স নিয়ে কামিন্স বলেন, ‘আমার মনে হয় এটি একটি মাত্র টেস্টের বিষয়, আবার একই সাথে কিছুটা প্রবণতাও। তাই এখন হস্তক্ষেপ করার প্রয়োজন আছে নাকি স্বাভাবিকভাবে চলতে দেওয়া উচিত, তা খুঁজে বের করা প্রয়োজন, আর এটিই সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ।’

তিনি আরও বলেন, ‘আগামী কয়েকদিনের মধ্যে এটাই আসল প্রশ্ন হতে যাচ্ছে। আমরা একসাথে বসব এবং ভাবব, নির্বাচকরাও ভাববেন—এমন কিছু কি রয়েছে যা আমাদের সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে, নাকি এটি একটি প্রবণতায় রূপ নিতে শুরু করেছে যা পরিবর্তন করা দরকার বলে আমরা মনে করি।’
এটাও মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, বাংলাদেশের অসাধারণ পারফরম্যান্স দুটি তরুণ প্রতিভার হাত ধরে এসেছে: ২৬ বছর বয়সী পেসার হাসান মাহমুদ এবং ২৫ বছর বয়সী ওপেনার তানজিদ হাসান। বল ও ব্যাট হাতে তারাই সুরটি বেঁধে দিয়েছিলেন। আর এরপর অপেক্ষাকৃত অভিজ্ঞ মেহেদী হাসান মিরাজ নিশ্চিত করেছিলেন যেন, তাদের সেই শুরুর সাফল্যগুলো বৃথা না যায়।
ডারউইনে বাংলাদেশ দলের মধ্যে তরুণ ও অভিজ্ঞদের এক চমৎকার মিশ্রণ ছিল। অস্ট্রেলিয়ারও এখন সেই ধরনের মিশ্রণ প্রয়োজন।
এফএইচএম
