বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) পরবর্তী আসর আয়োজনে সময় নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। অর্থাৎ যে সময়ে সাধারণত আসর বসার কথা তখন আয়োজন করবে না তামিম ইকবাল নেতৃত্বাধীন বোর্ড। এমন সিদ্ধান্তে স্বভাবতই আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়বেন দেশের ক্রিকেটাররা। যারা নিয়মিত ঘরোয়া ক্রিকেটের ওপর নির্ভরশীল তাদের জন্য বিষয়টি বেশি কঠিনই বটে!
বিসিবির সভাপতি তামিম গত ২০ আগস্ট ঘোষণা দেন, এ বছর বিপিএল হচ্ছে না। পুরো টুর্নামেন্ট গুছিয়ে নতুন করে শুরু করতে চান। জাতীয় দলের ২০-২৫ জন ক্রিকেটারের বাইরে সব ক্রিকেটারকেই বিপিএল ও ডিপিএলের ওপর ভর করতে হয়। এদিকে চলতি বছরের ডিপিএলেও পারিশ্রমিক কমে গেছে!
এমন অবস্থায় ক্রিকেটাররা কী ভাবছেন? ঘরোয়া ক্রিকেটের কয়েকজন ক্রিকেটারের সঙ্গে আলাপে উঠে এসেছে বিপিএলের বিগত আসরে স্পষ্ট হয়ে ওঠা সীমাবদ্ধতা, ক্রিকেটারদের বেতন এবং টুর্নামেন্ট না হলে তাদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থার মতো বিষয়গুলো। ক্রিকেটাররা আর্থিক ক্ষতিটা নিয়েই বেশি চিন্তিত।
ঘরোয়া ক্রিকেটের এক বাঁ-হাতি পেসার বলছিলেন, ‘ওটার (বিপিএল না হওয়া) পরিপ্রেক্ষিতে যদি কোনো টুর্নামেন্ট করে তাহলে যেন প্লেয়ারদের দিকটাও দেখা হয়, এটা আমার চাওয়া।’ এ ছাড়া ঘরোয়া ক্রিকেটে পারিশ্রমিক নিয়ে জটিলতা কাটানোর কথাও বললেন তিনি, ‘ডিপিএলের গত তিন-চার বছরে সবাই কিন্ত পূর্ণ পারিশ্রমিক পাচ্ছে না। আমরা আসলে যে খেলাই খেলি না কেন, আমাদের পেমেন্ট স্ট্রাকচারটা ঠিক করা উচিত।’
চুক্তির অর্থ পুরোপুরি পাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে ওই ক্রিকেটার আরও বলেন, ‘যদি কমও পায় একটা প্লেয়ার, যে অঙ্কের চুক্তি হয় ওই পুরো টাকাটাই যেন সে পায়।’
চুক্তি অনুযায়ী পারিশ্রমিক পরিশোধের বিষয়টি নিশ্চিত করার আহবান ডিপিএল-বিপিএলে নিয়মিত খেলা আরেক ক্রিকেটার, ‘এমনিতেই ঘরোয়া টুর্নামেন্টগুলোতে পারিশ্রমিক কমে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। এরপর যে টাকাই চুক্তি হয় সেটাও ঠিকঠাক পাই না। আগে এটা নিশ্চিত করতে হবে যেন পারিশ্রমিকটা ঠিকঠাক পাই।’
গত দুই বিপিএলে ফিক্সিং, ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক ইস্যু নিয়ে একের পর এক বিতর্কের মুখে পড়েছিল বিসিবি। বিদেশি ক্রিকেটাররাও ঠিকঠাক পারিশ্রমিক পাননি। ২০২৪ বিপিএলে তো দুর্বার রাজশাহীর বিদেশি খেলোয়াড়রা পারিশ্রমিক ইস্যুতে এক ম্যাচ বয়কটও করেন। এ নিয়ে দেশি ক্রিকেটারদেরও পড়তে হয় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে।
বিপিএলে নিয়মিত খেলা এক অলরাউন্ডার সেই প্রসঙ্গ টেনে তামিমের সিদ্ধান্তকে পরোক্ষভাবে সমর্থন জানালেন, ‘বিপিএলে এমন সব ঘটনা ঘটে, বিদেশি ক্রিকেটারদের সামনে তো লজ্জায় পড়তে হয়। সেদিক থেকে সব গুছিয়ে করা ভালো।’
আবার, নিজেদের আর্থিক ক্ষতির কথাও মাথায় রেখেছেন তিনি, ‘হ্যাঁ, আমরা যারা বিপিএল-ডিপিএলের ওপর নির্ভর করি, তাদের জন্য তো এটা বড় ধাক্কা। কিন্তু যদি এর জায়গায় বিকল্প টুর্নামেন্ট আয়োজন করে বিসিবি ক্ষতিটা পুষিয়ে দেয়, তাহলে ভালো হয়। আবার বিসিবি একবারে ভালোভাবে পরেরবার আয়োজন করতে পারে, ক্রিকেটারদেরও ক্ষতি হবে না। তবে ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক নিয়ে একটা সিস্টেম দাঁড় করানো দরকার। তাহলেই বোধহয় ঝামেলা কমবে।’
এদিকে, বিপিএল না হলেও ক্রিকেটারদের জন্য বিকল্প কোনো টুর্নামেন্ট আয়োজন করে ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (কোয়াব) সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুন। তার মতে, ‘বিপিএল না হয়েও যদি অন্য কিছু একটা করে কিছু করা যায়, হয়তোবা শতভাগ বিপিএলের মতো হবে না। আমরা খেলতে চাই। খেলার মাধ্যমেই আমরা আমাদের প্রাপ্য স্যালারি চাই। খুবই ক্রিটিক্যাল একটা বিষয় এটা।’
তবে বিপিএল প্রতি বছর আয়োজন করলেই হবে না, টুর্নামেন্টটি সঠিক কাঠামোয় করার পক্ষপাতী কোয়াব সভাপতি। একইসঙ্গে ক্রিকেটারদের আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখার আহ্বান তার, ‘আমরা নিশ্চিতভাবে একটা উইন-উইন সিচুয়েশনে যেতে চাই। বিপিএল যেভাবে হচ্ছে সেভাবে হওয়া ঠিক না, কারণ সঠিকভাবে একটা বিপিএল আয়োজন করা খুবই জরুরি। এভাবে ভঙ্গুর ও প্রতিবছর বিতর্ক নিয়ে টুর্নামেন্ট করা হোক এটাও আমরা চাই না। আর্থিক নিরাপত্তাটা গুরুত্বপূর্ণ।’

বিপিএল না হলে ক্রিকেটারদের আর্থিক ক্ষতি হতে পারে সেটিও স্বীকার করলেন মিঠুন, ‘বিপিএল যদি না হয় তাহলে ডেফিনেটলি প্লেয়াররা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এই জিনিসটা নিয়েই আমাদের আলোচনার বিষয় যে কীভাবে এবং কতটুকু পুষিয়ে দেওয়া যায়।’
ভবিষ্যতে আরও মানসম্মত বিপিএল পেতে এক বছর বিরতি প্রয়োজন হলে ক্রিকেটাররাও তাতে ছাড় দিতে প্রস্তুত বলে মনে করেন এই উইকেটরক্ষক ব্যাটার, ‘ভালো কিছুর জন্য যদি দুই পক্ষকে কিছুটা স্যাক্রিফাইস করতে হয় তাহলে করতে হবে। সবাই চায় একটা সুন্দর-গোছানো বিপিএল হোক। আমরাও প্লেয়ার হিসেবে একই জিনিস চাই। এজন্য যদি একটা বছর অফ রেখে আমরা আইপিএল, পিএসএল বা বিগ ব্যাশের মতো সুন্দর একটা গোছানো টুর্নামেন্ট পাই; যা লং টাইমের জন্য বাংলাদেশ ক্রিকেট বা প্লেয়াররা লং টাইমের জন্য বেনিফিটেড হবে, আমরা ডেফিনেটলি সেটার জন্য এতটুকু স্যাক্রিফাইস করতে রাজি আছি।’
একইসঙ্গে ক্রিকেটারদের আয়ের বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই বলেও মনে করিয়ে দিলেন কোয়াব সভাপতি, ‘আবার দেখতে হবে যে এটা যেহেতু আমাদের রুজি-রুটি, আমাদের প্রিমিয়ার লিগটাও ঠিকঠাক মতো হচ্ছে না লাস্ট ২ বছর। প্রিমিয়ার লিগ যেভাবে চলছিল বা প্লেয়াররা যেভাবে আর্থিকভাবে বেনিফিটেড হতো সেটাও এখন লাস্ট ২ বছর ধরে হচ্ছে না। প্লেয়ারদের কথা অবশ্যই ক্রিকেট বোর্ডের চিন্তা করতে হবে।’
এসএইচ/এএইচএস
