মার্চ-এপ্রিলে অনুষ্ঠিত সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপ চলাকালে তুমুল আলোচনায় ছিলেন দুই যমজ ভাই রোনান সুলিভান ও ডেকলান সুলিভান। অবশ্য আগেই তারা বাংলাদেশে পা রেখেছিলেন। এরপর মানুষের মন জয় করতেও সময় লাগেনি। বিশেষ করে রোনানের অসাধারণ পারফরম্যান্সে ভর করেই বাংলাদেশ জিতেছিল বয়সভিত্তিক এই সাফ। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রিয়-অপ্রিয় নানা বিষয়ে কথা বলেছেন দুই সুলিভান ভাই।
সাফ অ-২০ এর ফাইনালে টাইব্রেকারে ভারতকে ৪-৩ ব্যবধানে হারানোর পথে পানেনকা পেনাল্টিতে গোল করেছিলেন রোনান। সেই প্রসঙ্গ এবং স্থানীয় ফুটবলারদের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার মতো বিষয়গুলো নিয়ে তাদের কথায় উঠে এসেছে। বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত ফিলাডেলফিয়ার দুই তরুণ অনূর্ধ্ব-২০ দলে ট্রায়াল দেওয়ার আগে কখনও এ দেশে আসেননি। এরপর সেই দলের হয়ে শিরোপা জিতে তারা জনবহুল রাজধানী ঢাকায় ফিরে কয়েকদিন সামলেছেন মিডিয়ার ব্যস্ততা।
পরে নিজেদের জন্য সময় বের করে ঘুরেছেন, বাংলাদেশের খাবার উপভোগ করেছেন এবং নানিকে সময় দিয়েছেন– যাকে এর আগে যুক্তরাষ্ট্রেই দেখেছিলেন তারা। বাংলাদেশে থাকাকালীন অভিজ্ঞতা নিয়ে ডেকলান বলেন, ‘আমরা সেখানে যা করেছি মানুষ দেখেছে এবং অভিজ্ঞতাটা কতটা ভালো ছিল সেটাও জানে। এখন হঠাৎ করে অনেক বিদেশি খেলোয়াড়কে বাংলাদেশের হয়ে খেলার ব্যাপারে আগ্রহী হতে দেখছি। ইংল্যান্ডের কয়েকজন ছেলে আছে, যারা সেখানকার ভালো একাডেমিতে খেলছে। সারা বিশ্বেই আমাদের প্রতিভা ছড়িয়ে আছে। এখন শুধু সেগুলোকে কাজে লাগাতে হবে।’
কীভাবে বাংলাদেশের হলেন যমজ দুই ভাই– সেটাও জানালেন ডেকলান, ‘সবকিছু শুরু হয়েছিল একটি ইনস্টাগ্রাম ডিএম (মেসেজ) থেকে। ব্যাপারটা সত্যিই অবিশ্বাস্য।’ ‘সেভ বাংলাদেশ ফুটবল’ নামের ওই অ্যাকাউন্ট থেকেই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। শুরুতে তারা কিছুটা বিভ্রান্ত হয়েছিলেন, একটি ফ্যান পেজ কেন তাদের পাসপোর্টও না থাকা অবস্থায় বাংলাদেশে এসে ক্যাম্পে যোগ দিতে বলছে? পরে বুঝতে পারেন, অ্যাকাউন্টটি আসলে ফেডারেশনের সঙ্গে কাজ করা একটি বৈধ প্ল্যাটফর্ম।

পরবর্তীতে সাফ অনূর্ধ্ব-২০ টুর্নামেন্টে খেলার আগ্রহ প্রকাশ করলে ওই অ্যাকাউন্ট তাদের বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সহ-সভাপতি ফাহাদ করিমের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেয়। নিজেদের ফাঁকা সময়টাও কাজে লাগাতে চাওয়ার কথা জানান রোনান, ‘কলেজে যাওয়ার আগে আমাদের হাতে কিছুটা সময় ছিল। ভেবেছিলাম বাংলাদেশে গিয়ে খেললে, দেশের প্রতিনিধিত্ব করলে এবং সংস্কৃতির আরও কাছাকাছি যেতে পারলে দারুণ হবে।’
এরপরের তিন মাস ছিল ‘একটু পাগলাটে প্রক্রিয়া’। সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল বাংলাদেশি পাসপোর্ট পাওয়া, কারণ তাদের মায়ের নিজের বাংলাদেশি পাসপোর্ট ছিল না। শেষ পর্যন্ত মার্চে নিউইয়র্ক থেকে দিল্লি, এরপর দিল্লি থেকে ঢাকায় উড়াল দেন দুই ভাই, জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ যাত্রা ছিল সেটাই। সাফ জয়ের পরের অভিজ্ঞতা যেমন হলো ডেকলানদের, ‘অনেক ফুল পেয়েছি, অনেক মানুষের সঙ্গে দেখা হয়েছে। মনে হচ্ছিল, বাংলাদেশে আমাদের দলটাই সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। সবাই এত খুশি, এত কৃতজ্ঞ ছিল যে আমরা দেশের জন্য ট্রফিটা এনে দিয়েছি। সবাই সত্যিই অনেক উচ্ছ্বসিত ছিল। আমেরিকার যুব ফুটবলে এমন কিছু আপনি দেখবেন না।’

রোনান সুলিভান জীবনে এর আগে মাত্র দুবার ‘পানেনকা’ পেনাল্টি নিয়েছিলেন। দুটিই ছিল পৃথিবীর অন্য প্রান্তে অনুশীলনের সময়, যার একটিতে বল লেগেছিল ক্রসবারে। অনূর্ধ্ব-২০ সাফের ফাইনালেও একই কাণ্ড ঘটানো নিয়ে ভাই ডেকলান বললেন, ‘ওকে বলতেই হয়নি। আমি পুরো সময়ই জানতাম, সে এটা করবে। আমি জানতাম, জেতার জন্য শেষ পেনাল্টিটা যদি ও নেয়, তাহলে এটাই করবে। এটাই তো ওর স্বভাব।’
একটি তিক্ত অভিজ্ঞতার কথাও জানালেন রোনান। বিদেশি ফুটবলার হওয়ায় শুরুতে তারা স্থানীয় ফুটবলারদের কাছ থেকে অসহযোগিতা পাওয়ার কথা আগে থেকেই প্রচলিত ছিল। সেই প্রসঙ্গে রোনান বলেন, ‘বিদেশি হওয়ায় শুরুতে বল পাওয়া কঠিন। কারণ আপনি ভাষা জানেন না, আবার দলের ছেলেরা হয়তো শুরুতে খুব খুশি ছিল না যে আমরা সেখানে এসেছি। কিন্তু কয়েকবার বল পাওয়ার পর আপনি কী করতে পারেন সেটা দেখাতে পারলে পরিস্থিতি সহজ হয়ে যায়।’
এএইচএস
