বিজ্ঞাপন

পিসিবির ‘মাথা বিগড়ে দেওয়া’ সাক্ষাৎকারে যা বললেন ইমরান খানের ছেলেরা

পিসিবির ‘মাথা বিগড়ে দেওয়া’ সাক্ষাৎকারে যা বললেন ইমরান খানের ছেলেরা

লর্ডসে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে স্বাগতিক ইংল্যান্ডের বিপক্ষে লড়ছে পাকিস্তান। এরই মাঝে মধ্যাহ্নভোজের বিরতিতে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও কিংবদন্তি অধিনায়ক ইমরান খানের দুই ছেলের সাক্ষাৎকার সম্প্রচার করে ইংলিশ গণমাধ্যম স্কাই। যা দেখে বেশ ক্ষুব্ধ পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি পরিচালিত ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি)। সম্প্রচার বন্ধ না হলে বিরতির পর তারা আর মাঠে নামারও ঘোষণা দিয়েছিল। তবে সাক্ষাৎকার সম্প্রচার ও খেলা দুটোই হয়েছে!

ব্রিটিশ চিত্রনির্মাতা ও সাংবাদিক জেমাইমা গোল্ডস্মিথের সঙ্গে ইমরানের ৯ বছরের দাম্পত্য জীবনে রয়েছে দুই ছেলে কাসিম খান ও সুলাইমান খান। তাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমান ধারাভাষ্যকার মাইকেল আথারটন। লর্ডসের প্যাভিলিয়নে আগেই ধারণ করা সেই আলোচিত সাক্ষাৎকার স্কাই প্রচারে দেরি করলেও শেষ পর্যন্ত ১৮ মিনিটের ক্লিপ সম্প্রচার করে।

ইংলিশ গণমাধ্যমের মুখোমুখি হওয়া দুই ভাই কাসিম-সুলাইমান ২০২২ সালের নভেম্বরের পর থেকে আর বাবা ইমরানের সঙ্গে দেখা করেননি। সর্বশেষ গত মার্চে তার সঙ্গে কথা বলেছেন তারা। দুই সন্তানের দাবি, এক চোখে ইমরানের দৃষ্টিশক্তি ৮০ শতাংশ হারিয়েছে। তিনি প্রতিদিন ২৩ ঘণ্টা খুব ছোট একটি কক্ষে থাকেন, যেখানে নতুন কোনো বইও নেই। গ্রীষ্মকালে সেখানে ঠিকমতো শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও নেই। বিচ্ছিন্নতা ও একাকী বন্দিত্বের চাপের কারণে তার রক্তচাপও বাড়ছে বলে উল্লেখ করেছেন সুলাইমান।

ইমরান খানকে ক্রমান্বয়ে হত্যার চেষ্টা চলছে জানিয়ে কাসিম বলেন, ‘তারা (ইমরানের আটককারীরা) এখন আর কোনো কৌশল অনুসরণ করেও কাজ করছে না। তারা কী করছে, সেটাই খুব একটা পরিষ্কার নয়। সেখানে তাকে স্পষ্টতই হত্যা করার চেষ্টা করছে। যতটা সম্ভব তাকে আটকে রাখা এবং তার কণ্ঠ রুদ্ধ করে রাখাই যেন তাদের উদ্দেশ্য।’

‘শেষবার যখন সে আমাদের খালা ও অন্য কারও সঙ্গে কথা বলতে পেরেছিল, তখন সে বলেছিল, সম্প্রতি পরিস্থিতি মারাত্মকভাবে খারাপ হয়েছে। সে বিষয়টি অন্য রাজনৈতিক বন্দিদের সঙ্গে তুলনা করেছে, যারা কারাগারে নিহত হয়েছেন বা মারা গেছেন। এই মুহূর্তে পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে খারাপ। তাকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করে প্রতিদিন ২৩ ঘণ্টারও বেশি সময় একটি কক্ষে রাখা হচ্ছে।’

সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তেও শান্ত থাকা মানুষটির বর্তমান মানসিক অবস্থা শোচনীয় এবং সঠিক চিকিৎসা দরকার বলে মনে করেন ছোট ছেলে কাসিম,  ‘এই মুহূর্তে তার সঠিক চিকিৎসা পাওয়াটা আমাদের জন্য সত্যিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার চোখের সমস্যার কারণে চোখে প্যাচ লাগানো ছিল, তাকে দৃশ্যতই মানসিক চাপে মনে হচ্ছিল। বিষয়টি আমাদের জন্য মেনে নেওয়া খুব কঠিন, কারণ আমরা যতবারই তাকে দেখেছি, এমনকি বন্দুকের মুখোমুখি হওয়ার সময়ও, তিনি সবসময় খুব শান্ত ও আত্মবিশ্বাসী একজন মানুষ হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেছেন। একবার আমরা যে গাড়িতে ছিলাম, সেটি ছিনতাই হয়েছিল। তখনও গাড়ির ছিনতাইকারীদের মধ্যেও সবচেয়ে শান্ত মানুষটি ছিল সে।’

dhakapost

গত সপ্তাহে ইমরানকে ইসলামাবাদের শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তর করা এবং অন্তত ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেখানে রাখতে হবে বলে নির্দেশ দিয়েছিলেন পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট। প্রথমবার কারাবন্দি হওয়ার পর সেটিই হতো কারাগারের বাইরে তার সবচেয়ে দীর্ঘ সময়। তবে তাকে শিফা হাসপাতালে না নিয়ে রাষ্ট্রীয় পিআইএমএস হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে অল্প সময়ের মধ্যেই আবার কারাগারে ফেরত পাঠানো হয় ইমরানকে।

এ নিয়ে ক্ষোভ জানিয়েছে সুলাইমান বলেন, ‘আমরা সতর্ক ও আশাবাদী ছিলাম। কিন্তু আমাদের আশঙ্কাই সত্যি হলো। তাকে যে বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার কথা ছিল, সেখানে না নিয়ে কয়েক ঘণ্টার জন্য একটি সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয়। এরপর সরাসরি আবার কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।’

সেখানে কী হয়েছিল তা জানালেন কাসিম, ‘বাস্তবে সরকারি কর্মকর্তারা এক ঘণ্টার মতো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বলেছিলেন, “দারুণ, তিনি ঠিক আছেন।” এরপর তারা বলেছিল, এখন আমরা তাকে স্বাধীন হাসপাতাল শিফায় পাঠাব। কিন্তু তারা সেখানে অপেক্ষমাণ সব চিকিৎসককে, এমনকি আমাদের খালা– যিনি নিজেও একজন চিকিৎসক, তাকেও অপেক্ষায় রেখে সরাসরি বাবাকে কারাগারে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।’

dhakapost
সাবেক স্ত্রী জেমাইমা গোল্ডস্মিথের সঙ্গে ইমরান খান (মাঝে)

এর আগে একাধিকবার পাকিস্তানে গিয়ে ইমরান খানের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করলেও, কারিগরি কারণ দেখিয়ে ভিসা আটকে দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন দুই সন্তান সুলাইমান-কাসিম। একইসঙ্গে তারা সাবেক এই পাকিস্তান অধিনায়কের প্রতি সরকারের আচরণের বিপরীতে যুক্তরাজ্য সরকারের প্রতিক্রিয়াকেও ‘দুর্বল’ বলে বর্ণনা করেছেন।

সুলাইমান বলেন, ‘আমরা হতাশ হয়েছি। যখনই আমরা পররাষ্ট্র দপ্তর বা আগের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছি, তখনই তাদের প্রতিক্রিয়া ছিল এতটাই দুর্বল। তারা বলেছে, ‘এটা শুনে খুব খারাপ লাগছে, আমরা সহানুভূতিশীল।’ (গত সরকারের সময়) তেমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, বরং কোনো ধরনের সমর্থনই ছিল না। তারা সক্রিয়ভাবে বলেছিল, আমাদের পাকিস্তানে যাওয়া উচিত নয় এবং আমরা গেলে তারা আমাদের কোনো সহায়তা করতে পারবে না। আমরা আশা করছি, নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ডের সময়ে হয়তো আমরা সফল হব এবং বাবার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাব।’

প্রসঙ্গত, ৭৩ বছর বয়সী ইমরান ২০১৮ সালে তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী হন। এটি ছিল তার বর্ণাঢ্য ও ঘটনাবহুল জীবনের আরেকটি অধ্যায়, যার মধ্যে রয়েছে ৮৮টি টেস্ট ম্যাচ খেলা এবং ১৯৯২ সালে বিশ্বকাপ জয়। ২০২২ সালের আগস্টে প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ইমরান একের পর এক অভিযোগের জেরে গত তিন বছর ধরে পাকিস্তানে কারাগারে বন্দি আছেন।

এএইচএস