পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডির একটি কারাগারে দীর্ঘদিন ধরে বন্দি থাকা দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও কিংবদন্তি অধিনায়ক ইমরান খানকে নিয়ে উদ্বিগ্ন বিশ্ব ক্রিকেটাঙ্গন। পাকিস্তানের লিজেন্ডের সুচিকিৎসার দাবি জানিয়ে বেশ কয়েকবার চিঠি দিয়েছেন সাবেক আন্তর্জাতিক অধিনায়করা। এমনকী উদ্বেগ জানিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট অধিনায়ক প্যাট কামিন্সও।
এরই মধ্যে লর্ডসে পাকিস্তান ও স্বাগতিক ইংল্যান্ডের টেস্ট চলাকালে ইমরান খানের দুই ছেলের সাক্ষাৎকার সম্প্রচার করে হইচই ফেলে দিয়েছে ইংলিশ গণমাধ্যম স্কাই। যা দেখে বেশ ক্ষুব্ধ পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি পরিচালিত ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি)। সম্প্রচার বন্ধ না হলে বিরতির পর তারা আর মাঠে নামারও ঘোষণা দিয়েছিল। তবে সাক্ষাৎকার সম্প্রচার ও খেলা কোনোটাই বন্ধ থাকেনি যদিও।
পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ককে নিয়ে ভিনদেশি ক্রিকেটাররা সরব হলেও দেশটির ক্রিকেটাঙ্গন কার্যত ‘নীরব’ই আছে। এর পেছনে দেশটির সরকারের ‘রোষানলে’ পড়ার ভয় আছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে এরই মধ্যে পাকিস্তান সরকারের অস্বস্তি আরও বাড়িয়েছেন দেশটির সাবেক অধিনায়ক জাভেদ মিয়াঁদাদ। সম্প্রতি প্ল্যাটফর্ম ‘ন্যারেটিভস’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এক সময়ের সতীর্থ ইমরান খানের মুক্তির দাবি জানিয়েছেন তিনি। তাকে নিয়ে কথা বলার সময় কেঁদে ফেলেন জাভেদ মিয়াঁদাদ।

অবিলম্বে সতীর্থের জেলমুক্তির দাবি তুলেছেন মিয়াঁদাদ। তিনি বলেন, ‘আমাদের মধ্যে কখনো কোনো রকম শত্রুতা ছিল না। আমরা বছরের পর বছর একসঙ্গে কাউন্টি ক্রিকেট খেলেছি। বছরে ছ’মাসের বেশি একসঙ্গেই থাকতাম। বিভিন্ন জায়গায় একসঙ্গে গিয়েছি। পাকিস্তানের হয়ে একসঙ্গে খেলেছি। দু’জনেই দু’জনের নেতৃত্বে খেলেছি। আমাদের মধ্যে দারুণ সম্পর্ক ছিল। ক্রিকেটজীবনের অনেকটা পথ আমরা ভাগাভাগি করে নিয়েছি।’
কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন মিয়াঁদাদ। কাঁদতে কাঁদতেই বলেন, ‘আমরা খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলাম। এখন ইমরানের কথা ভাবলে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি। জানি না জেলের মধ্যে ও কী অবস্থায় রয়েছে। পাকিস্তানকে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল ইমরান। আমার মন বলছে, ওর সঙ্গে অন্যায় করা হচ্ছে। ওকে মুক্তি দিলে সমস্যা কী? আমাকে কেউ কি বুঝিয়ে বলবেন? ইমরানকে মুক্তি দিলে কি পাকিস্তান মুছে যাবে? সবার বোঝা উচিত, আমরা সবাই পাকিস্তানি। আমি ইমরানকে খুব ভালোভাবে চিনি। অত্যন্ত সৎ মানুষ। কোনো দুর্নীতি বা আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে কখনও জড়িত ছিল না। নাহলে আরও অনেক কিছু করতে পারত। ইমরান দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিল। ওর বিরুদ্ধে তো চুরি বা আর্থিক দুর্নীতির কোনো অভিযোগ নেই।’
সব পক্ষকে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের আবেদন জানিয়েছেন তিনি। মিয়াঁদাদ বলেছেন, ‘বিশ্বাস করি, আলোচনার মাধ্যমে সুন্দর সমাধান পাওয়া যেতে পারে। ইমরান অসম্ভব শ্রদ্ধার মানুষ। পাকিস্তানের জন্য নিজেকে উজাড় করে দিয়েছে। আমাদের বোধহয় একটু ভাবা দরকার। ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধার সঙ্গে জীবনযাপন করা ওর প্রাপ্য। ঈশ্বর না করুন, জেলের ভেতরে ওর কিছু হয়ে গেলে গোটা পাকিস্তান কাঁদবে। তখন মানুষই প্রশ্ন তুলবে, ইমরানের মতো একজন খেলোয়াড়ের সঙ্গে কেন এমন আচরণ করা হলো? আরে ইমরান তো চুরি করেনি। যা করেছে, পাকিস্তানের স্বার্থে করেছে। নিজের সব কিছু দেশের জন্য দিয়েছে। দেশের জাতীয় নায়কের সঙ্গে এমন আচরণ দুর্ভাগ্যজনক। অত্যন্ত দুঃখের। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করব, যাতে দ্রুত সমস্যার সমাধান হয়।’

ইমরানের পরিস্থিতি নিয়ে সুনীল গাভাস্কার, কপিল দেব, ক্লাইভ লয়েড, অ্যালান বর্ডারের মতো প্রাক্তন ক্রিকেটারাও উদ্বিগ্ন। পাকিস্তান সরকারকে ইমরানের জন্য যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে একাধিক বার অনুরোধ করেছেন তারা। ইমরানকে যথাযথ সম্মান দেওয়ার দাবি তুলেছেন প্যাট কামিন্সও। মিয়াঁদাদ সরাসরি ইমরানের প্রশংসা করে মুক্তি দেওয়ার দাবি তুললেন। পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের মধ্যে মিয়াঁদাদই প্রথম সাবেক অধিনায়ক এবং প্রধানমন্ত্রীর মুক্তির দাবি তুললেন। যা শাহবাজ, নাকভিদের অস্বস্তি আরও বাড়াতে পারে।
একাধিক অভিযোগে ২০২৩ সাল থেকে জেলবন্দি ইমরান। জেলে তার ওপর অত্যাচারের অভিযোগ উঠেছে বহুবার। সাবেক পাক প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যেরা নানা অভিযোগ করেছেন। অসুস্থ ইমরানের ঠিক মতো চিকিৎসা না করানো, দিনে ২৩ ঘণ্টার বেশি একটি ছোট্ট ঘরে আটকে রাখা, একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি প্রায় নষ্ট হয়ে যাওয়া, পরিবারের সদস্য এবং আইনজীবীদের ঠিকমতো দেখা করতে না দেওয়ার মতো নানা অভিযোগ রয়েছে। তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফকে নির্বাচনে লড়াই করতে দেয়নি বর্তমান সরকার। পাকিস্তানের নাগরিকদের একাংশও ইমরানকে জেলবন্দি করে রাখায় ক্ষুব্ধ।
এফআই
