চট্টগ্রামের মফস্বল এলাকা থেকে উঠে এসেছেন মোহাম্মদ রুবেল। ক্রিকেট ক্যারিয়ার এক যুগের হলেও আগে সেভাবে লাইমলাইট পাননি। গত এক বছর ধরে দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে আলো ছড়িয়ে নিজের নামটা প্রতিষ্ঠা করার কাজটা নীরবেই করছিলেন এই রহস্য স্পিনার। সেই আলোটা পুরোপুরি চোখে লেগেছে অস্ট্রেলিয়ায় টপ এন্ড টি-টোয়েন্টিতে জাদুকরী স্পিন ভেলকি দেখিয়ে।
৭ ম্যাচে ২৩ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশ হাই-পারফরম্যান্স (এইচপি) দলের হয়ে খেলা রুবেল এখনও সবার শীর্ষে। যদিও বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা সেমিফাইনালে হেরে বিদায় নিয়েছে। ব্যাটিং বিপর্যয়ে ম্যাচ হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বাদ পড়ার পর নিজের বোলিং, ভিন্ন কন্ডিশনে সাফল্য, জাতীয় দলে খেলাসহ আরও বিভিন্ন বিষয়ে ডারউইন থেকে ঢাকা পোস্টের ক্রীড়া প্রতিবেদক সাকিব শাওনের সঙ্গে কথা বলেছেন রুবেল।
শিরোপার খুব কাছে গিয়েও সেমিফাইনাল থেকে বাদ পড়লেন…
রুবেল : হ্যাঁ, আমরা ১০১ রান করেও ফাইট করেছি। জিততে পারলে অবশ্যই ভালো লাগতো, তবে শেষ বল পর্যন্ত আমরা লড়ে গেছি।
টুর্নামেন্টে ২৩ উইকেট পেলেন, অস্ট্রেলিয়ান কন্ডিশনে এমন পারফরম্যান্স কি স্বপ্নের মতো মনে হয়?
রুবেল : ভালো বোলিংয়ের স্বপ্ন তো সবারই থাকে। আমিও চেষ্টা করেছি ভালো করার। যেখানেই বল করি না কেন, ভালো করার চেষ্টা থাকে। ভালো করায় আলহামদুলিল্লাহ ভালো লাগতেছে। জাতীয় দলের একটা রাডার এইচপি, সেখানে পারফর্ম করার অনুভূতিটাও ভালো। দলের জন্য কিছু করতে পেরেছি।
টুর্নামেন্ট শুরুর আগে এমন সাফল্যের ভাবনা ছিল?
রুবেল : এটা নিয়ে আসলে ভাবিনি, তবে আমি টার্গেট করেছিলাম যেখানেই খেলি সবার থেকে ভালো করার চেষ্টা করব। যদি সুযোগ পাই সেটা কাজে লাগাতে হবে। সেই টার্গেট নিয়ে এসেছিলাম, এখন আলহামদুলিল্লাহ ভালো হয়েছে।
ধারাবাহিকভাবে উইকেট নেওয়া ঠিক কতটা কঠিন?
রুবেল : আমার চিন্তা থাকে যেখানেই হোক ধারাবাহিকতা রাখার চেষ্টা করা। আমার প্রসেস অনুযায়ী বোলিং করার চেষ্টা করি। কঠিন নাকি সহজ এটা ভাবি না কখনও। নিজের বোলিং ভালো করতে পারলেই হলো, উইকেট পাওয়া বা না পাওয়াটা আসলে আমার হাতে না। এখন আল্লাহ সহায় আছে, আলহামদুলিল্লাহ উইকেট পেয়েছি।

প্রথমবার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে খেলেছেন, কিন্তু দেখে বেশ অভিজ্ঞ মনে হয়েছে…
রুবেল : অভিজ্ঞ বলতে আসলে অনেক বছর ধরে খেলতেছি। বিদেশে খেলা হয়নি কখনও এর আগে, এটাই প্রথম। কিন্তু ঘরোয়া লিগে অনেক বছর ধরে খেলতেছি, ২০১২ সাল থেকে। আমার যেটা মনে হয়েছে যে, এত বছর আমি আসলে ঢাকা লিগ, প্রথম বিভাগ, দ্বিতীয় বিভাগ খেলেছি; সেখানে খেলার কারণে আমার অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন হয়েছে। সেটাই এখানে কাজে লাগিয়েছি।
অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার আগে পাসপোর্টটাও ছিল না, সেই অবস্থান থেকে এখন আপনি টুর্নামেন্টের সেরা বোলার…
রুবেল : ঢাকা লিগ চলাকালে (পাসপোর্ট) করেছিলাম। এর আগে চাইলে করতে পারতাম, কিন্তু করিনি, আগ্রহও ছিল না। এবার যখন ঢাকা লিগে ভালো করছিলাম, তখন আইডিয়া পাই, আমারও মনে হচ্ছিল যে পাসপোর্টটা করা দরকার। পরে চট্টগ্রাম গিয়ে দুই দিনেই পাসপোর্ট করেছি।
আর অবশ্যই ভালো লাগার বিষয় যে, সেরা উইকেট শিকারি হয়েছি। যেখানেই খেলি, সেরা হতে চাই আমি। শেষ কয়েক বছর আমি ভালো করছিলাম, আমি আসলে সেরা হওয়ার জন্যই খেলি সব সময়।
আপনি কি অস্ট্রেলিয়ার বিগ ব্যাশ খেলার প্রস্তাব পেয়েছেন, কেউ কিছু বলেছে?
রুবেল : না, আমাকে কেউ কিছু বলে নাই। এটা নিয়ে কোনো কথা হয়নি, যেখানে খেলতেছি সেটা নিয়ে ভাবতেছি আপাতত। যদি সুযোগ আসে সেটা পরের বিষয়। কিন্তু আপাতত এটা নিয়ে চিন্তা করছি না। তবে বিদেশি অনেকের সঙ্গে কথা হয়েছে, তারা বোলিংয়ের প্রশংসা করেছে। আমি কীভাবে বল করি সেটা অনেকেই দেখতে চায়, শিখতে চায়– এতটুকুই!
এক বছর আগেও সেভাবে পরিচিত ছিলেন না, আজ সবার মুখে মুখে। কেমন লাগে বিষয়টা?
রুবেল : হ্যাঁ, অবশ্যই ভালো লাগছে। এনসিএল টি-টোয়েন্টি আমার ক্যারিয়ারের অনেক বড় টার্নিং পয়েন্ট ছিল। এর আগে প্রথম বিভাগে সেরা উইকেটশিকারি ছিলাম, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। তবে এনসিএল টি-টোয়েন্টি আমার ক্যারিয়ার ঘুরিয়ে দিয়েছে। ওখানে ভালো করার পরে আমি সবার চোখে পড়ি। তারা সাহায্য করেছে, সবাই আমাকে চিনেছে, জেনেছে।
অফস্পিনার থেকে মিস্ট্রি স্পিনার, দু’দিকেই বল ঘোরাতে পারেন। এটা কীভাবে আয়ত্ত করলেন?
রুবেল : আমি টানা ৭ বছর ঢাকা সেকেন্ড ডিভিশনে খেলেছি। মিডল অর্ডারে ব্যাট করেছি, তখন অফস্পিন করতাম। তবে সেরা উইকেটশিকারি হতে পারিনি কখনও। যে কারণে চিন্তা করতাম ভিন্ন কিছু করার। মুজিব (উর রহমান) বা (অজন্তা) মেন্ডিসদের দেখেছি, চিন্তা করলাম আমিও ভিন্ন কিছুর চেষ্টা করি।
২০২৩-২৪ মৌসুমে সেকেন্ড ডিভিশন শুরুর আড়াই মাস আগে থেকে আমি এটা চেষ্টা করি। তখন থেকে চেষ্টা করতে করতে হয়েছে আরকি।
কতদিন লেগেছিল আয়ত্ত করতে বা কারও পরামর্শ নিয়েছিলেন কি না
রুবেল : তিন মাসের মতো লেগেছিল আয়ত্ত করতে। তখন আমি নিজে থেকে সবকিছু পরিবর্তন করেছি আর ইরফান ভাই, রাব্বি ভাই সাহায্য করেছে সবসময়। যেহেতু তাদের সঙ্গে প্র্যাকটিস করতাম। আমি বাংলাদেশ টিমের নেট বোলিং করতাম সবসময়। একদিন মাহমুদউল্লাহ ভাই আর তানভীরের সঙ্গে বোলিং করছিলাম, তখন মাহমুদউল্লাহ ভাই ডাক দিয়ে একটু পরামর্শ দিলেন। ফল অব থ্রু নিয়ে একটু কথা বললেন। যা করলে ক্যারম বলটা ভালো হয়! এরপর আমার ক্যারম বলটা অনেক উন্নত হয়েছে।
‘বিদেশি অনেকের সঙ্গে কথা হয়েছে, তারা বোলিংয়ের প্রশংসা করেছে। আমি কীভাবে বল করি সেটা অনেকেই দেখতে চায়, শিখতে চায়।’
মাঝে আপনার অ্যাকশন নিয়ে কথা উঠেছিল, সেটা নিয়ে কী ভাবনা নাকি শুধরে নিয়েছেন?
রুবেল : বোলিং অ্যাকশন নিয়ে কেউ কখনও (সরাসরি) কিছু বলেনি। দুয়েকবার শুনেছি যে, এটা সমস্যা হতে পারে। কিন্তু কখনও (সমস্যা) হয়নি আলহামদুলিল্লাহ। এনসিএল লাল বলের টুর্নামেন্ট চলাকালে গত বছর নাঈম হাসানের সঙ্গে কথা বললাম, সে আমাকে একটু টিপস দিল। এ ছাড়া যখন ব্রেক থাকতো লাল বলে আমি জ্যাকি স্যারের সঙ্গে কথা বলতাম এটা নিয়ে। আমার মনে হয় না কোনো সমস্যা আছে বোলিংয়ে। আমি বোলিংয়ের ভিডিও করে দেখি ঠিক আছে কি না।
আপনার জীবনে বেশ উত্থান-পতন ছিল, কখনও কি ক্রিকেট ছেড়ে দেওয়ার চিন্তা এসেছিল?
রুবেল : না, আমার কখনও মনে হয়নি যে ক্রিকেটটা আর খেলব না। জীবনে অনেক কিছু থাকবে, আমি সবসময় যেখানে খেলছি সেখানেই খেলার মতো খেলতাম। তবে খুব ভালো খেলতাম এমন না, আবার খুব খারাপও খেলতাম না। দলে থাকার মত যেমন দরকার তেমনই খেলতাম। আর আমার তো আরেকটা কাজ ছিল– কাজি (বিয়ে পড়ানো), সেটা তো জানেন।

আপনি কাজির পেশায়ও আছেন, দুটো একসঙ্গে চালিয়ে যাওয়া চ্যালেঞ্জিং কি না?
রুবেল : না, কোনো সমস্যা হয়নি কখনও। আমার কোনো প্রেশার পড়ত না। ওটা তো আমার পার্মানেন্ট আছে, এটা (খেলা) না করলেও ওটা থাকবে সবসময়। আর আমি যখন ফ্রি থাকব তখনই করব। এখন ছোট ভাই দেখে সবকিছু।
অস্ট্রেলিয়ার পারফরম্যান্স জাতীয় দলে দরজা কতটা দরজা খুলতে পারলেন…
রুবেল : আমি অত কিছু নিয়ে চিন্তা করতেছি না। তবে আমার অবশ্যই জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন আছে। যদিও আমি অতদূর চিন্তা করতেছি না। আমার লক্ষ্য হচ্ছে যেখানে সুযোগ পাব, সেখানে ভালো করার চেষ্টা করব। যে কারণে জাতীয় দলে যদি সুযোগ পাই, আলহামদুলিল্লাহ ভালো করার চেষ্টা থাকবে। নির্বাচকরা যদি মনে করে যে আমি প্রস্তুত তাহলে আমাকে নেবেন।
পুরো দেশে আপনাকে নিয়ে কথা হচ্ছে, আপনার মা দেখে যেতে পারলে নিশ্চয়ই খুশি হতেন!
রুবেল : খুশি তো অবশ্যই হতেন। আম্মা ছোটবেলা থেকেই আমার খেলায় সাহায্য করতেন অনেক। আব্বু অনেক বকলেও আম্মা কখনও আমাকে বকেন নি। তিনি সবসময় পাশে ছিলেন, আমি মনে করি এখনও আম্মার দোয়া আছে আমার সঙ্গে। যে কারণে আমি সাফল্য পাচ্ছি। সবকিছুই আমার আম্মার জন্য, আজকে আমার যা কিছু সবই তার জন্য!
এসএইচ/এএইচএস
