সোমবার এলো আকস্মিক ঘোষণা। ভক্ত-সমর্থকদের বিষাদে ভাসিয়ে আর্জেন্টিনার জাতীয় দল থেকে বিদায়ের ঘোষণা দিলেন লিওনেল মেসি। ২০০৫ সালে যে অধ্যায়ের শুরু, তা শেষ করে দিলেন সোশ্যাল মিডিয়ার এক বার্তায়।
২০ বছরেরও বেশি সময়ে মেসি অনেক উত্থান-পতনের মধ্যে দিয়ে গেছেন। তিনি বলেছেন, ‘তার আর কিছুই দেওয়ার নেই।’ এই দুই দশকে যা করেছেন, যে সাফল্য পেয়েছেন, তাতে বলা যায় তার আর কিছু পাওয়ারও নেই। এই সময়ে মেসি যে স্মরণীয় মুহূর্তগুলো তৈরি করেছেন, তা এক নজরে দেখে নেওয়া যাক।
২০০৫: জাতীয় দলে মেসির অভিষেক এবং অবিলম্বে লাল কার্ড
১৮ বছরের মেসি, ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট প্রথমবার আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে দিয়ে মাঠে নামলেন। বুদাপেস্টে হাঙ্গেরির বিপক্ষে সেই প্রীতি ম্যাচের অভিজ্ঞতা হয়তো ভুলে যেতে চাইবেন তিনি। দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে নামার কয়েক সেকেন্ড পরেই সরাসরি লাল কার্ড দেখেন। শুরুটা মোটেও ভালো হয়নি, কিন্তু সেই লাল কার্ডের তিক্ততা ভুলিয়ে দিয়েছেন দুই দশকের চমৎকার নৈপুণ্য আর অর্জন দিয়ে।
২০০৬: বিশ্বকাপে মেসির অভিষেক
প্রথমবার সিনিয়র দলে ডাক পাওয়ার এক বছর পর মেসি তার প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে যান। লম্বা চুলের সেই টিনএজার ততদিনে নিজের নাম কুড়িয়ে ফেলেছেন। ১৮ বছর বয়সী মেসি সার্বিয়ার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে অভিষিক্ত হন এবং বদলি নামার ১৩ মিনিট পর গোল করেন।

২০০৮: আর্জেন্টিনাকে অলিম্পিকে স্বর্ণ জেতান মেসি
মেসির প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা এসেছিল ২০০৮ সালের বেইজিং অলিম্পিকে। আর্জেন্টিনা অনূর্ধ্ব-২৩ দলের সঙ্গে যোগ দিয়ে টানা দুটি অলিম্পিক সোনা জেতাতে সাহায্য করেন তিনি।
বার্সেলোনা থেকে ছাড়পত্র পাচ্ছিলেন না মেসি। কিন্তু পেপ গার্দিওলা তাকে অনুমতি দেন। শেষ পর্যন্ত ছয় ম্যাচের সবগুলো জিতে আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। পাঁচ ম্যাচ খেলে দুটি গোল করেছিলেন মেসি।
২০১০: কোচ হিসেবে ম্যারাডোনার সঙ্গে বিশ্বকাপ
বিশ্বের দুই সেরা খেলোয়াড় একই মঞ্চে। ২০১০ সালে ডিয়েগো ম্যারাডোনার কোচিংয়ে বিশ্বকাপে অংশ নেয় আর্জেন্টিনা। তরুণ মেসির কোচ ছিলেন তিনি।
যদিও ওই আসর আর্জেন্টিনার জন্য ভালো কাটেনি। কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে হেরে যায় তারা। তবে বিশ্বমঞ্চে দুই গ্রেটকে একসঙ্গে দেখার মতো বিরল সুযোগ পাওয়াই ছিল বড় প্রাপ্তি।
২০১৪: হাতের নাগালে থেকেও ছোঁয়া হলো বিশ্বকাপ ট্রফি
২০১৪ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলার সুযোগ পান মেসি। আর্জেন্টিনা প্রতিপক্ষ হিসেবে পায় জার্মানিকে। দলকে ফাইনালে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। কিন্তু হাতের নাগালে এসেও ধরা দেয়নি ট্রফি।
মারিও গোটশের এক্সট্রা টাইমের গোল গড়ে দেয় ম্যাচের পার্থক্য। আর্জেন্টিনা ম্যাচটি হেরে গেলেও মেসি তার অসাধারণ পারফরম্যান্স করে গোল্ডেন বল জেতেন। ওইবার সাত ম্যাচ খেলে চার গোল ও এক অ্যাসিস্ট ছিল তার।
তারপর মেসি হার ছাড়েননি। আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরলেন এবং আট বছর পর প্রথম বিশ্বকাপ ট্রফি জেতেন।
২০১৬: কোপা আমেরিকা ফাইনালে হেরে আন্তর্জাতিক অবসরে মেসি
গতকাল সোমবার মেসির অবসর নেওয়ার ঘোষণা প্রথমবার নয়। ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকা ফাইনালে চিলির কাছে হারের পর জাতীয় দলকে বিদায় জানান তিনি। ম্যাচ পরবর্তী সময়ে মিক্সড জোনে তার ওই ঘোষণা সাংবাদিকদের হতভম্ব করে দিয়েছিল।
জার্মানির কাছে বিশ্বকাপ ফাইনালের হারের দুই বছর পর মহাদেশীয় টুর্নামেন্টেও আরেকটি ব্যর্থতার হতাশা ছিল মেসির জন্য বড় ধাক্কা। আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে সাংবাদিকদের সামনে বলেই দিয়েছিলেন, ‘এই মুহূর্তে আমি যা ভাবছি এবং লকার রুমেও যা নিয়ে ভেবেছি, জাতীয় দলের সঙ্গে আমার খেলা শেষ।’
তবে মেসি আবার ফিরে আসেন এবং টানা দুটি কোপা আমেরিকা এবং বিশ্বকাপ জেতেন ব্যক্তিগত সব রেকর্ড গড়ে।
২০২১: আর্জেন্টিনার ২৮ বছরের শিরোপা খরা ঘুচল
২০০৭, ২০১৫ ও ২০১৬ সালে ব্যর্থতার পর মেসি অবশেষে কোপা আমেরিকা ট্রফি জিতলেন। ২০২১ সালে তার নেতৃত্বে ২৮ বছরের শিরোপা খরা ঘুচায় তারা ব্রাজিলকে ১-০ গোলে হারিয়ে।
২০১৪ সালে সেই মারাকানায় বিশ্বকাপ ট্রফি হাতছাড়া হয়েছিল, সেখানেই মেসির হাতে উঠল প্রথম আন্তর্জাতিক শিরোপা।

২০২২: মেসির দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান, শেষ হলো শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে বিতর্ক
সেই মুহূর্তটি আজীবন মনে থাকার কথা, যখন ফ্রান্সের বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে জয়সূচক গোল করলেন গনসালো মন্তিয়েল। সবাই যখন মাঝমাঠ থেকে দৌড় দিলেন, তখন সবকিছু পাওয়ার ভারে হাঁটু গেড়ে বসলেন মেসি। কত ত্যাগ, কত সংগ্রামের পর এলো সেই অধরা আকাঙ্ক্ষিত ট্রফি।
৩৬ বছরের বিশ্বকাপ শিরোপা খরা কাটিয়ে ২০২২ সালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হলো আর্জেন্টিনা। ফাইনালে নির্ধারিত সময়ে দুটি গোল ও প্রথম পেনাল্টি শুটআউটে জাল কাঁপান মেসি। ১৫ বছরের বেশি জাতীয় দলকে প্রতিনিধিত্ব করার পর অবশেষে এসে গেল চূড়ান্ত জয়।
২০২৬: বিশ্বমঞ্চে প্রথম হ্যাটট্রিক ও বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা
৩৯ বছর বয়সে মেসি কেমন পারফরম্যান্স করতে পারবেন, তা নিয়ে অনেকের সন্দেহ ছিল। চার বছর আগের সেই দুর্দান্ত মেসিকে দেখার আশা করা লোকের সংখ্যা খুব বেশি ছিল না। কিন্তু তিনি নীরবেই সবার চোখ খুলে দিলেন।
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে গোল করে হয়ে গেলেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা। আলজেরিয়ার বিপক্ষে নিজেদের প্রথম ম্যাচে বিশ্বমঞ্চে প্রথম হ্যাটট্রিক করেন মেসি, তাতে ছোঁন আগের সর্বোচ্চ গোলদাতা মিরোস্লাভ ক্লোসাকে (১৬)।
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে পেনাল্টি মিসের পর গোল করেই ভেঙে দেন বিশ্ব রেকর্ড, ওই ম্যাচে করেন জোড়া গোল। বিশ্বকাপ তিনি শেষ করেছে ২১ গোল করে, কিন্তু ফ্রান্স তারকা কিলিয়ান এমবাপে তাকে ছাপিয়ে যান ২২ গোল করে। কিন্তু অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে মেসির ইতিহাস গড়া ম্যাচই সবার মনে থাকবে।

২০২৬: ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল
ঐতিহাসিক প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ডের বি পক্ষে বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল কখনও ভুলে যাবে না আর্জেন্টিনা ভক্তরা। মেসি বলেছিলেন, ‘যদিও এটা কেবলই একটি ম্যাচ ছিল, আমরা কিছু বিশেষ মুহূর্তের দেখা পেয়েছি। অন্য যে কারও চেয়ে বেশি এই জয় চেয়েছিল ভক্তরা, কারণ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনাল জিতে ফাইনালে ওঠার মাহাত্ম্য অন্যরকম।’
আর্জেন্টিনার ২-১ গোলে ঘুরে দাঁড়ানোর সেই জয়ে মেসি দুটি অ্যাসিস্ট করেছিলে। দল নিশ্চিত করে ফাইনাল। ৪০ বছর আগের বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে সেই ‘হ্যান্ড অব গড’ ও ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’তে ইতিহাস গড়া ডিয়েগো ম্যারাডোনার পাশে নাম লেখান অধিনায়ক মেসি।
২০২৬: স্পেনের কাছে বিশ্বকাপ ফাইনালে হার
মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়েছে হৃদয়ভঙ্গের গল্প দিয়ে। ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরেছে আর্জেন্টিনা। ১২০ মিনিট ধরে আবেগ ও শারীরিক ধকলের সঙ্গে লড়তে হয়েছে তাকে। কিন্তু অল্পের জন্য টানা দ্বিতীয় শিরোপা জেতা হয়নি।
ফাইনালে আলবিসেলেস্তেরা হেরে গেলেও মেসির ২০২৬ বিশ্বকাপ স্মরণীয় হয়ে থাকবে ৩৯ বছর বয়সে তার রেকর্ড ও ইতিহাস গড়ার সামর্থ্যের কারণে। ম্যাচের শেষ মিনিট পর্যন্ত মেসি তার কোটি কোটি সমর্থকদের জন্য নিজের সবটুকু উজার করে দিয়েছেন, যেটা হয়ে থাকল তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচও।
এফএইচএম
