বিজ্ঞাপন

রূপকথার মতো শেষ না হলেও মেসি থাকবেন চিরভাস্বর

রূপকথার মতো শেষ না হলেও মেসি থাকবেন চিরভাস্বর

২০২২ সালের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ফাইনালের আগেই লিওনেল মেসি বলেছিলেন, বিশ্বমঞ্চে এটাই তার শেষ ম্যাচ। ফ্রান্সের বিপক্ষে সেই নাটকীয় ফাইনাল শেষে ‘গ্রেটেস্ট অব অল টাইমের’ হাতে উঠল প্রতীক্ষিত বিশ্বকাপ ট্রফি। আর কিছু কি চাওয়ার-পাওয়ার ছিল তার! সহজ উত্তর—না। আন্তর্জাতিক অবসর নিলে শেষটা হতো রূপকথার মতো! কিন্তু আর্জেন্টিনার প্রতি ভালোবাসা আর টান তার সিদ্ধান্ত বদলে দিলো। খেলে গেলেন আরও।

আরেকটি বিশ্বকাপ যখন ঘনিয়ে আসছিল, তখনও তিনি জানতেন না, খেলতে পারবেন কি না। শেষ পর্যন্ত খেললেন এবং চমকে দিলেন চল্লিশ ছুঁইছুঁই মেসি। দলকে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখালেন, কিন্তু পুরো টুর্নামেন্টে অবিশ্বাস্য কয়েকটি প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখে ফাইনালের মঞ্চে বিবর্ণ মেসি ও তার দল। স্পেনের বিপক্ষে তাদের হতাশাজনক পারফরম্যান্সে চাপা পড়ল আগের সাত ম্যাচের কীর্তি। শেষটা হলো বেদনাবিধুর। 

​আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপের ফাইনালে নিয়ে গিয়ে জয়ের একেবারেই দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করানোর পর সোমবার নিজের বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানার ঘোষণা দিলেন মেসি। ১৯ জুলাই নিউইয়র্কে স্পেনের বিপক্ষে স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় সিক্ত ম্যাচটি হয়ে থাকল তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ। রূপকথার মতো না হয়ে গল্পটা হলো পরাজিত, ক্লান্ত এক নায়কের। কিন্তু দুই দশকের বেশি সময় ধরে যা করে গেছেন তিনি, তা কি চাপা পড়ে গেছে ওই এক ম্যাচের ব্যর্থতায়? ​বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রথম অভিষেকের দুই দশক পর দেশের সাথে সব জটিল মান-অভিমান মিটিয়ে ৩৯ বছর বয়সে বিদায় নিলেন মেসি। একসময় মনে করা হতো, দেশের হয়ে ট্রফি না জেতার আক্ষেপটাই হয়তো তার পুরো ক্যারিয়ারের পরিচয় হয়ে থাকবে।

আটবারের ব্যালন ডি’অর বিজয়ী এই তারকা বিদায় নিচ্ছেন একজন বিশ্বকাপজয়ী ও দুইবারের কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন হিসেবে। ডিয়েগো ম্যারাডোনার বিশাল ছায়া থেকে বের হয়ে আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে সম্পূর্ণ নিজের একটি তৈরি করা পরিচয় রেখে গেলেন তিনি। যদিও বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের কাছে পরাজয় মেসিকে একটি নিখুঁত বিদায় ও দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে। কিন্তু বার্সেলোনা, আর্জেন্টিনা ও আধুনিক ফুটবলকে একেবারে বদলে দেওয়া একটি ক্যারিয়ারের পর নতুন করে প্রমাণ করার মতো তার আসলেই কি কিছু বাকি ছিল?

পুরো ক্যারিয়ারজুড়ে যে ট্রফি হন্যে হয়ে খুঁজেছিলেন, চার বছর আগে কাতারে সেটি তুলে ধরেছিলেন মেসি। ​এটি কেবল একটি অসাধারণ ক্যারিয়ারের সেরা মুহূর্তই ছিল না, বরং ফুটবলের অন্যতম সেরা ঘুরে দাঁড়ানো ও ধৈর্যের গল্পের এক চমৎকার ইতি ছিল। ​বার্সেলোনায় তার অর্জনের কোনো শেষ ছিল না। সেখানে তার ব্যক্তিগত ও দলগত প্রায় সব সম্মান, ট্রফি, রেকর্ড জুটেছিল। তবে অনেক বছর ধরে আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির সম্পর্কটি তার সাফল্যের চেয়ে আক্ষেপ দিয়েই বেশি পরিমাপ করা হতো।

​২০১৪ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছিলেন। কিন্তু অতিরিক্ত সময়ে জার্মানির কাছে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। এরপর ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকা ফাইনালে টানা পরাজয় আন্তর্জাতিক শিরোপা না পাওয়ার আক্ষেপকে আরও বাড়িয়ে তোলে। পরপর দুইবার চিলির কাছে পেনাল্টিতে হেরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়া মেসি সাময়িকভাবে আন্তর্জাতিক ফুটবল ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, ‘জাতীয় দল আমার জন্য শেষ।’ ​কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। মেসি আবার ফেরেন, ধীরে ধীরে গল্পের প্লট ঘুরিয়ে দেন।

​কোচ লিওনেল স্কালোনির অধীনে আর্জেন্টিনা তাদের অধিনায়কের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিল না। কিন্তু তাকে ঘিরে একটি শক্তিশালী দল গড়ে ওঠে। বয়সের চাপ ছিল, কিন্তু তরুণদের শক্তি, আক্রমণাত্মক মানসিকতা ও যৌথ প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার মেধাকে পূর্ণতা দেওয়া হয়েছিল। ​প্রথম বড় সাফল্য আসে ২০২১ সালের কোপা আমেরিকায়। আর্জেন্টিনা মারাকানায় ব্রাজিলকে হারিয়ে মেসিকে তার প্রথম কোনো বড় আন্তর্জাতিক সিনিয়র ট্রফি উপহার দেয়। ​এর ১৮ মাস পরই আসে বহুল প্রতীক্ষিত বিশ্বকাপ।

​কাতারে মেসি ছিলেন এক কথায় অসাধারণ। প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের কাছে অপ্রত্যাশিত হারের ধাক্কা সামলে দলকে ফাইনালে নিয়ে যেতে তিনি উপহার দেন গোল, অ্যাসিস্ট এবং জাদুকরী সব মুহূর্ত। ​ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে দুইবার বল জালে পাঠানোর পর পেনাল্টি শুটআউটেও গোল করেন তিনি। অবশেষে তার হাতে ওঠে সেই ট্রফি, যা তাকে সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়দের তালিকায় সবার ওপরে রাখার অবশিষ্ট শর্তটি পূরণ করে দেয়।



অথচ ১৩ বছর বয়সে স্বদেশ ছেড়ে স্পেনের বার্সেলোনায় যাওয়ার কারণে তাকে নিজ দেশে মাঝে মাঝে আর্জেন্টাইনের চেয়ে ‘কাতালান’ হিসেবে মনে করা হতো। কিন্তু তিনি জানতেন, তার হৃদয় কোথায় পড়ে আছে। তাই তো মান-অভিমান ভুলে একটা সময় আর্জেন্টিনার অবিসংবাদিত নেতা হয়ে উঠলেন। ​আগের ব্যর্থতার কান্না আর হতাশা ভুলে যান দর্শকদের উন্মাদনা থেকে। ​মেসি হয়ে উঠেছিলেন শতভাগ আর্জেন্টিনার মেসি।

২০২২ বিশ্বকাপ শেষে চাইলে থেমে যেতে পারতেন মেসি। কিন্তু তিনি খেলা চালিয়ে যান। প্যারিস সেন্ট জার্মেই থেকে ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেন এবং ২০২৪ সালে আর্জেন্টিনাকে আবারও কোপা আমেরিকা জিততে সাহায্য করার পর শেষবারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের মিশনে নামেন। যে অদম্য গতি দিয়ে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের একসময় অসহায় বানিয়ে দিতেন, সেটা বয়সের ভারে প্রত্যাশিতভাবে কমে এসেছিল। কিন্তু মেসি নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিলেন তার সতীর্থদের সমর্থনে। দৌড়ের চেয়ে মাঠজুড়ে হাঁটার পরিমাণ বাড়িয়েছিলেন। অপেক্ষায় থাকতেন সঠিক সুযোগ পাওয়ার জন্য। তার তরুণ সতীর্থরা যখন চারপাশে কঠোর পরিশ্রম করতেন, তখন তিনি সতর্ক থেকে হিসাবনিকাশ কষতেন। মাঠের স্পেস বোঝার ক্ষমতা, পাসের সঠিক টাইমিং ও এক ছোঁয়াতেই ম্যাচের রঙ বদলে দেওয়ার দক্ষতা ছিল সেই তরুণ বয়সের মতোই। তাকে বদলে যেতে দেখে আর্জেন্টিনাও বদলে গিয়েছিল।

​যার প্রমাণ মিলেছে গত বিশ্বকাপে। ফাইনালে পৌঁছানো দলটি আর কেবল মেসির দিকে সাহায্যের আশায় তাকিয়ে থাকা কোনো সাধারণ দল ছিল না। জয়ে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল তারা। মেসির সঙ্গে বছরের পর বছর খেলে গড়ে ওঠা এক অভিজ্ঞ ও শক্ত সামর্থ্যে গড়া দল। এ কারণেই মেসি তার প্রত্যাশার চেয়েও বেশিদিন আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার টেনে নিয়েছেন নির্ভার থেকে।

আন্তর্জাতিক ফুটবলের সুপারস্টারদের তালিকায় মেসি সবসময়ই শীর্ষ সারিতে থাকবেন। কিন্তু এসব পরিসংখ্যান দিয়ে তার এই মান-অভিমান, প্রত্যাখ্যান, হৃদয়ভঙ্গ ও পরবর্তীতে সর্বজনীন ভালোবাসায় রূপ নেওয়ার গল্প পুরোপুরি প্রকাশ করা সম্ভব নয়। 

​বহু বছর ধরে প্রতিটি পরাজয়কে ম্যারাডোনার সঙ্গে তার পার্থক্যের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা হতো। তবে শেষের দিকে এসে সেই তর্ক একদম অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। ​একজন ১৯৮৬ সালে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ এনে দিয়েছিলেন। আর অন্যজন অনেক বছর চেষ্টার পর ২০২২ সালে তা করেছেন এবং চার বছর পর দেশকে আরও একটি শিরোপার একেবারে দোরগোড়ায় নিয়ে গেছেন।

কিন্তু এনে দিতে পারেননি আরেকটি শিরোপা। কিন্তু তার অবিশ্বাস্য ক্যারিয়ারে এর একচুল প্রভাবও পড়ার কথা নয়। চার বছর আগে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ইতি টানলে হয়তো রূপকথার গল্পের শেষটা হতে পারতো সুখময়। নিউইয়র্কের হৃদয় ভাঙার গল্পের অংশ হয়ে শেষ করলেও আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে এক অমলিন প্রভাব রেখেই জাতীয় দলকে বিদায় জানালেন মেসি।

এফএইচএম