দুই দশকের বেশি সময় ধরে আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সি মানেই যেন একজন মানুষের নাম- লিওনেল মেসি। অসংখ্য গোল, অবিশ্বাস্য সব মুহূর্ত, হতাশার রাত, চোখের জল আর শেষ পর্যন্ত বিশ্বজয়ের আনন্দ জাতীয় দলের সঙ্গে তার পথচলা ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ গল্পের মতো। সেই গল্পের শেষ অধ্যায় এখন যেন খুব কাছেই।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ৩৯ বছর বয়সী মেসি জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার দীর্ঘ যাত্রার সমাপ্তির সময় এসে গেছে। সিদ্ধান্তটি সহজ ছিল না। কারণ আর্জেন্টিনার জার্সি তার কাছে কখনও শুধুই একটি জার্সি ছিল না, ছিল স্বপ্ন, দায়িত্ব এবং কোটি মানুষের প্রত্যাশা।
২০০৫ সালে জাতীয় দলের হয়ে শুরু হয়েছিল মেসির পথচলা। এরপর কেটে গেছে দুই দশকেরও বেশি সময়। দীর্ঘ এই সময়ে তিনি আর্জেন্টিনার হয়ে খেলেছেন ২০৭টি ম্যাচ এবং করেছেন ১২৫ গোল। দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ ও গোলের মালিক এখন তিনিই। তবে সংখ্যার হিসাব দিয়ে মেসির আর্জেন্টিনা অধ্যায়কে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।
একসময় জাতীয় দলের হয়ে তার ক্যারিয়ার ছিল প্রশ্ন আর সমালোচনায় ভরা। একের পর এক ফাইনালে হার, বড় ম্যাচে ব্যর্থতার অভিযোগ এবং দেশের মানুষের প্রত্যাশার বিশাল চাপ- সবকিছুই পেরিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। এমনকি এক পর্যায়ে হতাশ হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় বলার সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন।

কিন্তু গল্পটা সেখানেই শেষ হয়নি। মেসি ফিরে এসেছিলেন। হয়তো নিজের জন্য নয়, বরং অসমাপ্ত একটি স্বপ্নের জন্য! সেই প্রত্যাবর্তনের ফল আসে ২০২১ সালে। কোপা আমেরিকা জয়ের মাধ্যমে আর্জেন্টিনার হয়ে প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা নিজের হাতে তোলেন তিনি। দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে পুরো একটি জাতি।
এরপর আসে সেই রাত, যেটির জন্য অপেক্ষা ছিল সবচেয়ে বেশি। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ। ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন পূরণ করেন মেসি। বিশ্বকাপ হাতে নিয়ে তিনি শুধু একটি ট্রফি জেতেননি, পূর্ণ করেছিলেন আর্জেন্টিনার কোটি সমর্থকের বহু বছরের স্বপ্ন।
এরপরও থেমে থাকেননি। ২০২৪ সালে আবার কোপা আমেরিকার শিরোপা জেতে আর্জেন্টিনা। জাতীয় দলের হয়ে অর্জনের তালিকা আরও সমৃদ্ধ হয় মেসির।
তবে প্রতিটি গল্পেরই শেষ থাকে। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হারের পর শেষ হয়ে যায় আর্জেন্টিনার আরেকটি বিশ্বকাপ স্বপ্ন। বিশ্বকাপ জিতে জাতীয় দলকে বিদায় জানানোর যে রূপকথার মতো সমাপ্তি কল্পনা করেছিলেন অনেকেই, বাস্তবে তা আর হয়নি। সেই ম্যাচটিই আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শেষ ম্যাচ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
জাতীয় দলের হয়ে মেসির অর্জনের তালিকাও কম নয়। বিশ্বকাপ, দুটি কোপা আমেরিকা এবং ২০০৮ সালের অলিম্পিক স্বর্ণপদক কিংবা যুব বিশ্বকাপ- সবই আছে তার সংগ্রহে। ব্যক্তিগত অর্জনে তিনি জিতেছেন রেকর্ড আটটি ব্যালন ডি’অর।
কিন্তু মেসির সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো কোনো ট্রফি নয়। তার সবচেয়ে বড় অর্জন হলো, তিনি আর্জেন্টিনাকে আবার বিশ্বাস করতে শিখিয়েছেন। বারবার ব্যর্থ হওয়ার পরও স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন। অপেক্ষার পর জয় কতটা সুন্দর হতে পারে, সেটি দেখিয়েছেন তিনি।
হয়তো আর্জেন্টিনার হয়ে নতুন নতুন প্রতিভাবান তরুণেরা মাঠে নামবেন। নতুন প্রজন্ম নতুন ইতিহাস লিখবে। ফুটবল থেমে থাকবে না। কিন্তু নীল-সাদা জার্সি দেখলেই কোটি মানুষের মনে যে নামটি প্রথম ভেসে উঠবে, সেই নামটি হয়তো দীর্ঘদিন একই থাকবে- লিওনেল মেসি।
এমএমএম/
