বিজ্ঞাপন

প্রেসবক্স থেকে দেখা তিন বিশ্বকাপের মেসি

প্রেসবক্স থেকে দেখা তিন বিশ্বকাপের মেসি

অনলাইন মিডিয়ায় ঘুম থেকে উঠার পর থেকে ঘুমানো পর্যন্ত সংবাদের মধ্যেই থাকতে হয়। এরপরও বিকেলের পর থেকে মূলত সংবাদের প্রবাহ থাকে বেশি। গতকাল রাতে এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ কন্টিনজেন্ট নিয়ে যখন লিখছিলাম, তখনই লিওনেল মেসির অবসরের সংবাদ আসে।

কিছুক্ষণের জন্য কি-বোর্ড থেকে চোখে ভাসল মেসির শেষ ম্যাচের শেষ ক্ষণের চিত্র। নিউ জার্সির মেট লাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের ফাইনালে রেফারির শেষ বাঁশির পর রদ্রিদের উল্লাস আর মেসির কান্না। সেই কান্নাই যে শেষ...।

প্রেস ট্রিবিউন দর্শকদের গ্যালারির সঙ্গেই ছিল। আর্জেন্টিনার এক সমর্থক বলছিলেন, ‘স্পেন বিশ্বকাপ জেতায় শুধু স্পেনেই আনন্দ, মেসি জিতলে সারাবিশ্বেই উৎসব হতো।’ আর্জেন্টিনার সমর্থকের এই মন্তব্য পুরোটাই আবেগঘন হলেও গত দুই দশকের বেশি সময় ফুটবল মেসিতেই বুঁদ হয়ে ছিল। বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষ মেসির পায়ের জাদু দেখার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকতেন।

বাংলাদেশের সাংবাদিকরা বিশ্বকাপেই কেবল বিশ্বমানের ফুটবলারদের খানিকটা কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান। ২০১৮ সালের রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে আর্জেন্টিনা-নাইজেরিয়া ম্যাচ দিয়ে এই প্রতিবেদকের বিশ্বকাপ অভিষেক। সেই ম্যাচেই মেসিকে খুব কাছ থেকে মিক্সড জোনে দেখা। ফুটবলাররা ম্যাচ শেষে সাংবাদিকদের সামনে দিয়ে হেটে বাসে উঠে হোটেলে যান। ঐ দিন সৌভাগ্যক্রমে মেসি তার পরিচিত এক সাংবাদিকের সাথে হ্যান্ডশেকের জন্য একটু থেমেছিলেন। আমিও তার সঙ্গে দাঁড়ানো ছিলাম। সেবার মিক্সডজোনে ছবি কিংবা ভিডিওর সুযোগ ছিল না। রাশিয়া বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার পথচলা কোয়ার্টারেই থেমে যায়। আর্জেন্টিনা ও মেসির তিনটি ম্যাচ কাভার করেছিলাম।

কাতার বিশ্বকাপে ম্যাচের পাশাপাশি অনুশীলন কাভারও করেছি অনেক। একই শহরে সব স্টেডিয়াম ও অনুশীলন ভেন্যু। আবার কাতার সরকার সাংবাদিক ও বিশ্বকাপের টিকিটধারীদের যাতায়াতও ছিল ফ্রি। তাই মেসির অনুশীলনও কাভার করেছি একাধিক দিন। সাংবাদিকদের সবার আকর্ষণ থাকত মেসি কখন আসছেন, কী করছেন। ১৫ মিনিটের বেশি সময় সাংবাদিকরা অনুশীলনে থাকতে পারতেন না। ঐ পুরো সময় কোচের কৌশল কিংবা অন্য খেলোয়াড়দের চেয়ে সবার ক্যামেরা ও চোখের নজর থাকত মেসির দিকেই।

আর্জেন্টিনা কাতার বিশ্বকাপ শুরু করেছিল সৌদির বিপক্ষে হার দিয়ে। ঐ ম্যাচে স্টেডিয়াম থেকে হারের পর মেসির ব্যাথা মনোভাব খুব কাছ থেকে দেখা গেছে। ঐ হার মেসি ও আর্জেন্টিনা দলকে তাতিয়ে তুলেছিল ব্যাপকভাবে। কাতার বিশ্বকাপে মেসি এক ম্যাচের আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে এসেছিলেন। মাঠে যেমন বল নিয়ে দ্রুত গতিতে ছোটেন, সংবাদ সম্মেলনে বেশ ধীর স্থির। স্প্যানিশ ভাষাতে উত্তর দিয়েছেন আস্তে আস্তে। রোনালদো-নেইমার কিংবা সর্বকালের সেরা নিয়ে প্রশ্ন হলেও কখনও উত্তেজিত হতে দেখা যায়নি।

আর্জেন্টিনার সকল খেলোয়াড়রা যেন চেয়েছিলেন মেসির হাতে উঠুক বিশ্বকাপ। কাতারের লুসাইলের মহাকাব্যিক ফাইনাল কাভারের অভিজ্ঞতা যে কোনো ক্রীড়া সাংবাদিকের ক্যারিয়ারে অনন্য ঘটনা। সেই ফাইনালের পর মেসির ট্রফি নিয়ে বিশেষভাবে উদযাপন কাছ থেকে দেখা ছিল আরও উপভোগ্য। যা পরবর্তীতে পুরো বিশ্বের ক্রীড়াঙ্গনের উদযাপনের প্রতীক হয়ে দাড়ায়।

বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর মেসিকে দেখা গেল আরও ক্ষুরধার রুপে। উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপের শুরুই করেছিলেন হ্যাটট্রিক করে। আমেরিকায় এক ভেন্যু থেকে আরেক ভেন্যুর অনেক দূরত্ব এবং শারীরিক খানিকটা অসুস্থতার জন্য এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রথম ম্যাচ কাভার করেছি কোয়ার্টার ফাইনালে কানসাসে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে। সুউচ্চ প্রেসবক্স থেকে ৩৯ বছর বয়সী মেসির দুরন্ত ছোটাছুটি ছিল সুস্পষ্ট। মেসিই ছিলেন আর্জেন্টিনার আক্রমণের মূল ভরসা। শেষ পর্যন্ত তার পারফরম্যান্সেই সুইসদের হারিয়ে সেমিফাইনালে উঠে আর্জেন্টিনা।

সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড। এই দুই দেশের লড়াই মানে সেই ফকল্যান্ড, ম্যারাডোনার হ্যান্ডস অফ গড ও গোল অফ সেঞ্চুরি। আটলান্টায় ইংল্যান্ড দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে গোল দিয়ে লিড নেয়। ৮০তম মিনিট পর্যন্ত আর্জেন্টিনা গোল শোধ করতে পারেনি। মেসির জাদুকরী ক্রসে এনজোর গোল ম্যাচের চিত্র বদলে দেয়। কাতার বিশ্বকাপ মেসির জন্য খেলেছিলেন অন্য সবাই। আর মেসি যেন একাই আর্জেন্টিনার হয়ে লড়লেন আমেরিকা বিশ্বকাপে।

ফাইনালে রদ্রি-পেদ্রিদের কড়া মার্কিং আর স্প্যানিশ কোচ দেল ফুয়েন্তের কৌশলে মেসি ছিলেন বোতলবন্দি। ১২০ মিনিটের ফাইনালে মেসি ছিলেন নিষ্প্রভ। পুরো টুর্নামেন্টে মেসির পারফরম্যান্সে অন্য দল যেখানে কেঁদেছে, সেখানে মেসির কান্নায় সমাপ্তি হয়েছে বিশ্বকাপ। সেই কান্নাই আর্জেন্টিনার জার্সিতে পরিসমাপ্তির ঘোষণা আসল মাস দেড়েক পর।

এজেড/এমএমএম