২০২৬ সালের গ্রীষ্মকালীন দলবদলের সময়সীমা শেষ হয়েছে আজ (বুধবার) ভোরে। জানুয়ারির আগে আর কোনো ক্লাবের সামনে নতুন করে খেলোয়াড় নেওয়ার সুযোগ নেই। এবারের দলবদলে কেউ বিপুল অর্থ খরচ করে নিজেদের শক্তিশালী করেছে, কেউ দুর্বলতা কাটিয়েছে, আবার কেউ বড় তারকাকে ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।
কয়েক মাসের ব্যস্ত দলবদল শেষে কোন ক্লাব নিজেদের পরিকল্পনা সবচেয়ে ভালোভাবে বাস্তবায়ন করেছে এবং কারা ব্যর্থ হয়েছে– এখন সেই হিসাব কষছেন বিশ্লেষকরা। যেখানে রিয়াল মাদ্রিদ-চেলসি-অ্যাতলেটিকো মাদ্রিদকে বিজয়ী; বার্সেলোনা-ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড-আর্সেনাল মাঝামাঝি অবস্থানে এবং লিভারপুল-টটেনহ্যাম-অ্যাস্টন ভিলাকে রাখা হচ্ছে অসফল ক্লাবের তালিকায়।
ট্রান্সফার উইন্ডোতে সফল যেসব ক্লাব
রিয়াল মাদ্রিদ
রিয়াল মাদ্রিদ সবসময়ই গ্রীষ্মকালীন দলবদলকে গুরুত্বের সঙ্গে কাজে লাগায়। এবার তাদের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি ছিল বেশ বড়সড়। শুরুতেই কোচ হিসেবে পুনরায় দায়িত্বে ফেরেন হোসে মরিনিয়ো। ক্লাবের সঙ্গে পারস্পরিক সমঝোতায় বিচ্ছেদের ১৩ বছর পর বার্নাব্যুতে ফিরেছেন তিনি। এরপর মাত্র ৫৫ মিলিয়ন ইউরোতে মার্ক কুকুরেয়াকে দলে নেয় রিয়াল। পরে স্পেনের হয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপ জেতেন তিনি, রিয়ালের খেলোয়াড় হিসেবেই।
ম্যানচেস্টার সিটি ও লিভারপুল থেকে ফ্রি ট্রান্সফারে যথাক্রমে নেয় বার্নার্দো সিলভা ও ইব্রাহিমা কোনাতেকে। এরপর মাত্র ২০ মিলিয়ন ইউরোতে ইন্টার মিলানের উইংব্যাক ডেনজেল ডামফ্রিসকে দলে ভেড়ায়। এরপর আসে বড় অঙ্কের দলবদল। আরবি লাইপজিগ ও আইভরি কোস্টের হয়ে (বিশ্বকাপে) আলো ছড়ানো উইঙ্গার ইয়ান দিয়োমান্দেকে পেতে কয়েকটি ক্লাবকে হারিয়ে জিতেছে লস ব্লাঙ্কোসরা। এবারের ১০০ মিলিয়ন ইউরো বা তার বেশি মূল্যের দলবদলের মধ্যে দিয়োমান্দেকেই সবচেয়ে ভালো মনে করা হচ্ছে। এরপর ব্রাজিলিয়ান তারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে পেতে আর্সেনালের জোর প্রচেষ্টাও ঠেকিয়ে দেয় মাদ্রিদিস্তারা।
বুদ্ধিদীপ্ত ও লাভজনক ব্যবসারও জায়গা ছিল। ব্যাকআপ স্ট্রাইকার গঞ্জালো গার্সিয়াকে ৪০ মিলিয়ন ইউরোতে ফুলহ্যামে বিক্রি করে তারা। তার জায়গা পূরণ করতে লেভান্তের কার্লোস এসপির ২৫ মিলিয়ন ইউরোর রিলিজ ক্লজ সক্রিয় করে তাকে দলে নেয়। রিয়ালের দলবদলের একমাত্র বড় নেতিবাচক দিক হলো স্প্যানিশ মিডফিল্ডার রদ্রিকে দলে আনতে না পারা। তারা হেরে গেছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনার কাছে।
অ্যাতলেটিকো মাদ্রিদ
মাদ্রিদের আরেক ক্লাব অ্যাতলেটিকোও এবার দলবদলে বেশ বুদ্ধিদীপ্ত কাজ করেছে। তারা টটেনহ্যাম থেকে ক্রিস্তিয়ান রোমেরোকে ৪০ মিলিয়ন ইউরো, মর্টেন হাজুলমান্দকে স্পোর্টিং সিপি থেকে ৪০ মিলিয়ন ইউরো, লি কাং-ইনকে পিএসজি থেকে ৩৫ মিলিয়ন ইউরো এবং আলেহান্দ্রো গ্রিমালদোকে বায়ার লেভারকুসেন থেকে মাত্র ১৫ মিলিয়ন ইউরোতে দলে নেয়। সব চুক্তিই ছিল দারুণ সাশ্রয়ী।
তাদের মধ্যে সেরা চুক্তি গ্রিমালদো। এক দশক স্পেনের বাইরে কাটিয়ে আক্রমণাত্মক ফুলব্যাকদের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম সেরা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পর তিনি দেশে ফিরেছেন। এ ছাড়া তেমন কাজে না লাগা মাতেও রুগেরিকে অ্যাস্টন ভিলায়, থিয়াগো আলমাদাকে রিভার প্লেটে এবং নাহুয়েল মোলিনাকে রোমায় পাঠিয়েছে তারা। অ্যাতলেটিকোর দলবদলের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল হুলিয়ান আলভারেজকে ধরে রাখা। যদিও এটি তাদের অন্যতম সেরা তারকার মানসিক অস্থিরতা তৈরি করেছে।
চেলসি
চেলসির এবারের দলবদল দেখে প্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবগুলোর অনেকেই হতাশ। কারণ গত দুই বছর ধরে সবাই চেলসিকে যেসব কাজ করার পরামর্শ দিয়ে আসছিল, এবার তারা প্রায় সবই করেছে। শুরুতে ঘাটতি দূর করেছে ড্রেসিংরুম থেকে। যদিও ৩৫ বছর বয়সী ড্যানি ওয়েলবেককে ব্রাইটন থেকে এবং ৩৬ বছর বয়সী ফ্রি এজেন্ট জর্ডান হেন্ডারসনকে দলে নেওয়াকে কেউ কেউ একটু বাড়াবাড়ি বলতে পারেন, তবে সিদ্ধান্তের যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলা কঠিন।
এ ছাড়া ক্রিস্টাল প্যালেস থেকে ম্যাক্সেন্স লাক্রোয়া ৫২ মিলিয়ন পাউন্ডে এবং আটালান্টা থেকে মার্কো পালেস্ত্রাকে ৬০ মিলিয়ন ইউরোতে নেয় চেলসি। কোচ জাবি আলোনসোর পছন্দের ৩-৪-৩ ফরমেশনের সঙ্গে দুজনই দারুণ মানানসই। বড় চমক ছিল অ্যাস্টন ভিলা থেকে ১১৭ মিলিয়ন পাউন্ডে মরগান রজার্সকে দলে নেওয়া। যা ব্রিটিশ খেলোয়াড়ের দলবদলে নতুন রেকর্ড। এরপর গোলরক্ষক পজিশনেও বড় পরিবর্তন আসে। অ্যাস্টন ভিলা থেকে মাত্র ৭.৫ মিলিয়ন পাউন্ডে এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে দলে নেওয়া ছিল অসাধারণ ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত।
খেলোয়াড় বিক্রিতেও চেলসির কাজ ছিল প্রশংসনীয়। মার্ক গিউকে তারা আরবি লাইপজিগের কাছে ১৬ মিলিয়ন ইউরোতে বিক্রি করেছে। আন্দ্রে সান্তোসকে ৪৮ মিলিয়ন পাউন্ড এবং গত মৌসুমে দুই গোল করা লিয়াম ডেলাপকে ৪৫ মিলিয়ন পাউন্ডে বিক্রি করেছে। এ ছাড়া এনজো ফার্নান্দেজকে ১২০ মিলিয়ন পাউন্ডে বেছে দিয়েছে ম্যানসিটির কাছে।
উল্লেখযোগ্য লাভ-ক্ষতি হয়নি যাদের
বার্সেলোনা
বার্সেলোনা কিছুটা পরাজিত পাল্লায় ঝুঁকে আছে, তবে একটি বিশাল দলবদল তাদের সেই তালিকায় পুরোপুরি ঢুকতে দেননি রদ্রিগো হার্নান্দেজ। বিশ্বের সেরা ‘নম্বর ৬’ খেলোয়াড়কে দলে নেওয়া কোনো ক্লাবের জন্যই খারাপ উইন্ডো হতে পারে না।
তবে আক্রমণভাগে তারা যে খেলোয়াড়দের নিয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছেই। ব্লুগ্রানা ক্লাবটির অগ্রাধিকার ছিল অ্যান্থনি গর্ডনকে নেওয়া। কিন্তু এরপর তারা কি সত্যিই কাঙ্ক্ষিত মানের খেলোয়াড় পেয়েছে? কারিম আদেয়েমি ও গ্যাব্রিয়েল জেসুসকে নেওয়া কখনোই রবার্ট লেভান্ডফস্কির বিকল্প তৈরির প্রথম পরিকল্পনা ছিল না। তারা চেয়েছিল হুলিয়ান আলভারেজকে, কিন্তু তাকে পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় সেন্টারব্যাকও নিতে পারেনি কাতালানরা।
আর্সেনাল
গ্রীষ্মে আর্সেনালের স্পষ্ট পরিকল্পনা ছিল আক্রমণভাগে একজন তারকা খেলোয়াড় যোগ করা। তাবে তাদের তিনটি বড় লক্ষ্যই হাতছাড়া হয়েছে। মরগান রজার্স গেছেন চেলসিতে, ভিনিসিয়ুস আর্সেনালের আশায় পানি ঢেলে রিয়াল মাদ্রিদের সঙ্গে নতুন চুক্তি করেছেন এবং আলভারেজও তাদের প্রস্তাবে রাজি হননি। মিকেল আর্তেতা আক্রমণভাগে তারকাখ্যাতি যোগ করার যে পরিকল্পনা করেছিলেন তাতে ব্যর্থ বলা যায়।
এদিকে, লিয়ান্দ্রো ত্রোসার্ড ১৮ মিলিয়ন পাউন্ডে এবং গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লি ৬০ মিলিয়ন পাউন্ডে ক্লাব ছেড়েছেন। জায়গা পূরণে ক্লাব ব্রুগ থেকে কেবল ক্রিস্তোস জোলিসকে দলে আনা হয়েছে। তবে মিডফিল্ডের দলবদল কিছুটা আশা পূরণ করেছে গানারদের। নিউক্যাসল থেকে ব্রুনো গুইমারেস এবং অ্যাস্টন ভিলা থেকে এজরি কনসাকে নিয়েছে, দুজনই নির্ভরযোগ্য, দুর্দান্ত এবং প্রিমিয়ার লিগে নিজেদের প্রমাণ করা খেলোয়াড়।
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড
এই গ্রীষ্মে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারদের জন্য যে বিশাল দাম উঠেছে, তা এড়াতে পারায় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড সন্তুষ্ট হতেই পারে। তারা চেলসি থেকে আন্দ্রে সান্তোসকে ৪৮ মিলিয়ন পাউন্ড, অ্যাস্টন ভিলার ইউরি তিলেমান্সের ৩৫ মিলিয়ন পাউন্ডের রিলিজ ক্লজ সক্রিয় এবং দীর্ঘদিনের লক্ষ্য কার্লোস বালেবাকে অবশেষে ব্রাইটন থেকে প্রাথমিক ৬৫ মিলিয়ন পাউন্ডে দলে আনে।
তবে ইউনাইটেড একজন ব্যাকআপ স্ট্রাইকারও আনেনি। ফলে জশুয়া জির্কজিকে ক্লাবেই থাকতে হচ্ছে। লেফট-ব্যাক পজিশনে লুক শ-এর জন্য প্রতিযোগিতাও বাড়ানো উচিত ছিল। এসব জায়গায় নিষ্ক্রিয়তা শেষ পর্যন্ত তাদের ভুগতে হতে পারে।
দলবদল বাজারে শোচনীয় দশা যেসব ক্লাবের
লিভারপুল
দলবদল উইন্ডোর শেষ কয়েকদিন লিভারপুল সমর্থকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। নিষ্ক্রিয় একটি মৌসুমের পর দলবদল বাজার প্রায় নিঃশব্দে শেষ হওয়ার পথে ছিল। মাঠে মৌসুমের শুরুটাও ছিল উদ্বেগজনকভাবে খারাপ। অথচ সমস্যার সমাধানে ক্লাব কী করেছে? ২০২৭ সালে যোগ দেবেন এমন প্রতিভাবান তরুণদের সঙ্গে চুক্তি করেছে তারা।
ভবিষ্যতের দিকে নজর রাখা অবশ্যই ভালো। কিন্তু যখন বর্তমান পরিস্থিতিই মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন মনোযোগটা অন্যদিকে সরানোই হয়তো ভালো সিদ্ধান্ত হতো। পিএসজি থেকে ১০৬ মিলিয়ন পাউন্ডে ব্র্যাডলি বারকোলাকে দলে নেওয়া বড় সংযোজন। তবে শুরু থেকেই তাকে দুর্দান্ত পারফর্ম করার চাপ সামলাতে হবে। এ ছাড়া পর্যাপ্ত ফুলব্যাক এবং ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের ঘাটতিও পূরণ হয়নি অলরেডদের।
টটেনহ্যাম
টটেনহ্যামের এবারের গ্রীষ্মকালীন দলবদলে দুটি বিষয় সবচেয়ে স্পষ্ট– অতিরিক্ত অর্থ খরচ ও নতুন খেলোয়াড়ের চুক্তি। নিউক্যাসল থেকে সান্দ্রো টোনালিকে ৯২.৫ মিলিয়ন পাউন্ডে কিনে অতিরিক্ত খরচের শুরু। এরপর ওয়েস্ট হ্যাম থেকে মাতেউস ফার্নান্দেসের জন্য ৮৫ মিলিয়ন পাউন্ড এবং ম্যানচেস্টার সিটি থেকে স্যাভিনিয়োকে নিতে আরও ৭৫ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করা হয়।
অন্তত দুটি চুক্তিকে ভয়াবহ মূল্য নির্ধারণ বলা যায়। রবার্ট ডি জারবির অধীনে পুরো স্কোয়াড নতুন করে সাজাতে ১০ জন খেলোয়াড়কে দলে আনা হয়েছে। নতুনদের জায়গা করে দিতে বিক্রি করা হয়েছে বেশ কয়েকজনকে। তবে বর্তমান বাজারের তুলনায় কিছু খেলোয়াড়ের জন্য পাওয়া অর্থ হতাশাজনক। রোমেরোকে লা লিগায় পাঠিয়ে টটেনহ্যাম পেয়েছে মাত্র ৪০ মিলিয়ন ইউরো। ডিজেড স্পেন্সকে ইন্টার মিলানে বিক্রি করে ৩০ মিলিয়ন পাউন্ড এবং প্রতিভাবান ডিফেন্ডার লুকা ভুশকোভিচকে ৪৬ মিলিয়ন পাউন্ডে ব্রাইটনে পাঠানো হয়েছে।
অ্যাস্টন ভিলা
দলবদল বাজার যখন উত্তাল, তখনও প্রশ্ন উঠেছিল– ভিলা পার্কে আসলে কী হচ্ছে! সাম্প্রতিক মৌসুমগুলোয় তারা নিঃসন্দেহে সফল ছিল। তিন বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বার চ্যাম্পিয়ন্স লিগে জায়গা করে নেওয়া এবং গত মে মাসে ইউরোপা লিগ জেতার পরও নিজেদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বড় খেলোয়াড়ের (মরগান রজার্স ও এমি মার্টিনেজ) বিদায় মেনে নিতে হয়েছে। বিভিন্ন কারণে এবার ছয়জন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় ভিলা ছেড়েছেন।
এএইচএস
