২০০৫ সালে শুরু, ২১ বছরের বর্ণাঢ্য অধ্যায় শেষে লিওনেল মেসির সঙ্গে দীর্ঘ পথচলা থেমেছে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের। তবে ২০১৮ সালের পর মেসি এবং লিওনেল স্কালোনির দারুণ সমন্বয় ও পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ঘটিয়েই দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক পর আলবিসেলেস্তেরা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। এখনকার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন– আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে দুই লিও’র বিদায়টাও কি কাছাকাছি সময়ে হবে, নাকি স্কালোনির হাত ধরে হবে আরেকটি পুনর্গঠন!
মেসি-পরবর্তী যুগ নিঃসন্দেহে আর্জেন্টাইন ফুটবলের ঐতিহাসিক এক বাঁক হতে যাচ্ছে। আলবিসেলেস্তের ইতিহাসে মেসির আগে ও পরের সময়কে আলাদা করতেই হবে। ঠিক যেমনটা হয়েছিল দিয়েগো ম্যারাডোনার পর। তবে এত প্রশ্নের ভিড়ে আরও একটি প্রায় সমান গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসছে। অন্য লিও বা কোচ লিওনেল স্কালোনির ভবিষ্যৎ কী? তিনি স্পেনের কাছে বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের পর বলেছিলেন, ‘আমি ডিসেম্বর পর্যন্ত থাকব। এরপর সভাপতির (ক্লদিও তাপিয়া) সঙ্গে কথা বলব। ভাবনাটা হলো একটু স্বস্তি ও বিরতি নেওয়া।’
সেই বক্তব্যের পরই মেসির জাতীয় দল থেকে অবসরের খবর সামনে আসে। মেসির অবসর হয়তো অনেকের কাছেই অনুমেয় ছিল, কিন্তু কোনো ঘটনা ঘটতে পারে– এমন ধারণা এবং সেটি সত্যিই ঘটে যাওয়ার মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। আর সেই সিদ্ধান্তের প্রভাবও বিশাল। কারণ অধিনায়ক হিসেবে মেসিকে ছাড়া আর্জেন্টিনা আর কখনও আগের মতো থাকবে না। তার ওপর যদি অন্য লিও (স্কালোনি)–কেও হারাতে হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে।
সহজভাবে বললে, আর্জেন্টিনার বর্তমান দলের স্রষ্টা স্কালোনি না থাকলে এটি আর ‘স্কালোনেতা’ থাকবে না। তখন প্রায় পুরো কাঠামো নতুন করে সাজাতে হবে। বলতে গেলে নতুন করে শুরু করতে হবে সব দিক থেকেই। অবশ্য অধিনায়ক ও কোচ উভয়কে ছাড়া সম্ভাব্য পুনর্গঠনের পক্ষে একটি ইতিবাচক দিকও আছে। বিশ্বকাপজয়ী ও রানার্সআপ দলের অনেক খেলোয়াড় এখনও আর্জেন্টিনার হাতে রয়েছে। ফলে ২০১৮ বিশ্বকাপের পরের পরিস্থিতির সঙ্গে এবারের পার্থক্য অনেক।
রাশিয়া বিশ্বকাপে বিপর্যয়ের পর যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, সেখান থেকেই আর্জেন্টিনার সবচেয়ে সফল অধ্যায় গড়ে উঠেছিল। তবে সেই সূত্রের কারিগর স্কালোনি সঙ্গে থাকলে দৃশ্যপট যে ভিন্ন হবে, তা স্পষ্ট। সেটি হবে আরও আশাব্যঞ্জক, আরও কম বেদনাদায়ক। এ কারণেই মেসির অবসরের পর স্কালোনির জাতীয় দলের সঙ্গে থাকা এখন অনেকটা জাতীয় গুরুত্বের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোচ নিজেই বলেছেন, তার বর্তমান চুক্তির মেয়াদ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এর মধ্যে সামনে রয়েছে দুটি ফিফা আন্তর্জাতিক উইন্ডো, সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের দীর্ঘ উইন্ডো এবং নভেম্বরে আরেকটি।
আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যম ‘ওলে’ জানিয়েছে, বিশ্বকাপের পর প্রথম আন্তর্জাতিক উইন্ডোর জন্য আগামী রোববার প্রাথমিক দল ঘোষণা করার কথা স্কালোনির। সেখানে আর মেসি নামটি থাকবে না। স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালে হারের পর স্কালোনির যে বক্তব্যকে অনেকটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মনে হয়েছিল, তার সেই অবস্থান কিছুটা নরম হয়েছে। যদিও তিনি সরাসরি কোনো আশার কথাও বলেননি। তবে এখন বিশ্রাম, ভাবনা ও বিশ্লেষণের জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়ায় নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও তার সিদ্ধান্ত বদলাতে পারে।

সাম্প্রতিক ইঙ্গিতগুলোও নেতিবাচকের চেয়ে ইতিবাচকই বেশি। স্কালোনি বলেছিলেন, ‘আমি যে জায়গায় আছি, সেটি একটি স্বপ্ন। যেদিন চলে যাব, সেদিন আফসোস হবে।’ আসলে বড় কোনো ক্লাবের দায়িত্ব নেওয়ার চেয়ে আর্জেন্টিনার সঙ্গে থাকতেই তিনি বেশি আগ্রহী। কারণ ক্লাব ফুটবলে প্রতিদিনের চাপ, এমনকি গণমাধ্যমের চাপও সামলাতে হবে, যে ধরনের চাপের সঙ্গে তিনি অভ্যস্ত নন। নিজের বর্তমান জীবনেও তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ছুটির সময় প্রায়ই মায়োর্কায় চলে যান এবং বিশ্বের অন্যতম প্রিয় কাজ সাইকেল চালিয়ে দ্বীপটির রাস্তায় ঘুরে বেড়ান। ক্লাবের দায়িত্ব নিলে এমনটা নিয়মিত করার সুযোগ থাকবে না।
তাই স্কালোনির ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা মনে করেন, জাতীয় দলের দায়িত্ব চালিয়ে যেতে আগ্রহী স্কালোনি। তবে সেটি নির্ভর করবে নতুন চুক্তির আর্থিক শর্তের ওপর, বিশেষ করে তার কোচিং স্টাফদের চুক্তির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি ক্রীড়া প্রকল্প নিয়েও সমঝোতা প্রয়োজন। যদিও আর্জেন্টিনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কোন পথে যাচ্ছে, তা নিয়ে খুব একটা সংশয় নেই। সেটি ইতোমধ্যে সামনে চলে এসেছে।
এএইচএস
