টেস্টে তখন বাংলাদেশ সদ্যোজাত শিশু। ২০০১ সালের ৮ সেপ্টেম্বর তারা তাদের পঞ্চম টেস্ট খেলতে নেমেছিল। মঞ্চ এশিয়ান টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ। শ্রীলঙ্কার মাটিতে ত্রিদেশীয় এই সিরিজে বাংলাদেশের সঙ্গে আরেক দল পাকিস্তান। সিরিজটা দুঃস্বপ্নের মতোই কেটেছিল। দুই ম্যাচেই ইনিংস ব্যবধানে হার! কিন্তু একটি মুহূর্তের কারণে গর্বিত অধ্যায়ে নাম লিখেছিল বাংলাদেশ। সেদিন স্বপ্ন পূরণ হয়েছিল বাংলাদেশি এক কিশোরের।
কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাবে ২৫ বছর আগের এই দিনে ইতিহাসের পাতায় নাম উঠেছিল বাংলাদেশের বিস্ময়বালক মোহাম্মদ আশরাফুলের। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দ্বিতীয় ইনিংসে তিনি করেছিলেন ১১৪ রান। তিন দিনেই লজ্জাজনকভাবে ইনিংস ও ১৩৭ রানের ব্যবধানে হার ছাপিয়ে বিশ্বের নজর কেড়েছিলেন বাংলাদেশের এই কিশোর ব্যাটার।

প্রথম ইনিংসে ৯০ রানে বাংলাদেশকে অলআউট করার পর ৫৫৫ রানে ইনিংস ঘোষণা করে শ্রীলঙ্কা। জাভেদ ওমর বেলিমের প্রতিরোধের পর তৃতীয় দিন ৪ উইকেটে ১০০ রানে বাংলাদেশ খেলা শুরু করেছিল। আশরাফুল ছিলেন ৪ রানে অপরাজিত। প্রথম ইনিংসে বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে লড়াইয়ে ফেরান তিনি আমিনুল ইসলাম ও নাইমুর রহমানকে নিয়ে। দুজনের সঙ্গে ১২৬ ও ৯৬ রানের জুটিতে এগোতে থাকেন আশরাফুল।
১৫৮ বলে ৯০ এর ঘরে পৌঁছানোর পরও করেছেন সাবলীল ব্যাটিং। সেঞ্চুরি করেছেন নায়োকচিতভাবে। চামিন্ডা ভাসকে চার মেরে ১৬৯ বলে ১৪ চারে করে ফেলেন সেঞ্চুরি। বেশিরভাগ কিশোরের জন্য অভিষেকেই টেস্ট সেঞ্চুরি করা নিঃসন্দেহে এক সুদূর স্বপ্ন। আর যেখানে মুত্তিয়া মুরালিধরন ও ভাসদের মতো বোলারদের মোকাবেলা করার চ্যালেঞ্জ, সেখানে সেই স্বপ্ন আঁচ করারও কঠিন। কিন্তু আশরাফুল সেই স্বপ্ন সত্যি করলেন।
সেঞ্চুরির উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘গ রাতে আমার ঘুমাতে কষ্ট হচ্ছিল। আমি লারার ৩৭৫ রান ও আমার সেঞ্চুরি করার স্বপ্ন দেখছিলাম। স্বপ্নের কথা আমি সকালে আমার অধিনায়ককে (নাইমুর) বলেছিলাম। তিনি বললেন আমি এটা সত্যি করতে পারি। তাই আমি ইতিবাচকভাবে খেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।’

পাসপোর্ট অনুযায়ী ১৭তম জন্মদিনের আগের দিন (৯ সেপ্টেম্বর, তাতে ১৬ বছর বয়সে) এই সেঞ্চুরি করেছিলেন আশরাফুল। অভিষেকের এই সেঞ্চুরিতে ৩০ বছর ধরে অক্ষত থাকা একটি রেকর্ড ভেঙে দিয়েছিলেন তিনি। জন্মসনদ অনুযায়ী ১৭ বছর ও ৬৩ দিন বয়সী হিসেবে টেস্টে সর্বকনিষ্ঠ সেঞ্চুরিয়ানের কীর্তি গড়েন আশরাফুল। ভেঙে দেন ১৯৬০/৬১ মৌসুমে দিল্লিতে ভারতের বিপক্ষে পাকিস্তানের ব্যাটার মুশতাক আহমেদের (১৭ বছর ও ৮১ দিন) রেকর্ড।
২১২ বলে ১৬ চারে সাজানো ছিল আশরাফুলের ঐতিহাসিক ইনিংস। দলের ভরাডুবির মাঝেও অবিশ্বাস্য ইনিংস খেলে মুরালিধরনের সঙ্গে ম্যাচসেরা হয়েছিলেন তিনিও। তাকে নিয়ে অধিনায়ক নাইমুর বলেছিলেন, ‘আমার সবসময় মনে হয়েছিল এটা তার ম্যাচ হতে যাচ্ছে। কিন্তু আশরাফুলের ইনিংস ছিল অসাধারণ, সে একজন অভিজ্ঞ চ্যাম্পিয়নের মতো খেলেছে।’

মারভান আতাপাত্তুর ডাবল সেঞ্চুরি ও মাহেলা জয়াবর্ধনের দেড়শ রানের ইনিংস ছাপিয়ে সেদিন এই কিশোর যে আলোর মশাল জ্বালিয়েছিলেন, তা দীর্ঘদিন ধরেই জ্বলছে। আশরাফুলের সেই কীর্তি বাংলাদেশের অনেক উত্থান-পতনের মাঝে এক আলোকবর্তিকা হয়েই টিকে থাকবে।
এফএইচএম
