বিশ্বকাপে মনে পড়েছে বাংলাদেশকে

একটি বিশ্বকাপ—ক্রিকেট দলের জন্য, একটি দেশের জন্য লালিত স্বপ্নের মঞ্চ। কিন্তু সেই স্বপ্নে এবার একরাশ হতাশা। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে চলমান টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ নেয়নি বাংলাদেশ। ক্রিকেটের অভিভাবক সংস্থা আইসিসিও বসে থাকেনি। বাংলাদেশের জায়গায় সহযোগী দেশ স্কটল্যান্ডকে নিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করেছে। শ্রীলঙ্কা ও ভারতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ক্রিকেটের এই মহাযজ্ঞ। আর এক ম্যাচের অপেক্ষা। আগামী রোববার আহমেদাবাদে শিরোপার লড়াইয়ে নামবে ভারত ও নিউজিল্যান্ড।
অধিনায়ক লিটন কুমার দাস কিংবা বিশ্বকাপ স্কোয়াডে থাকা অন্য ক্রিকেটাররা কি বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো দেখেছেন? দেখে থাকলে না খেলতে পারার আক্ষেপ কি তাদের ভেতরটাকে পুড়িয়েছে? সেই উত্তর অজানাই থাকুক। তবে এতটুকুন বলতে পারি—বিশ্বকাপের মঞ্চে দাঁড়িয়ে বারবার মনে পড়েছে বাংলাদেশকে।
বিশ্বকাপের সুপার এইট পর্বের ম্যাচের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়েছিলাম শ্রীলঙ্কায়। চারদিকে রঙিন সাজসজ্জা, দর্শকদের উন্মাদনা—সবই ছিল। শুধু ছিল না বাংলাদেশ। প্রথম ম্যাচের খবর সংগ্রহ করতে হয়েছে বুক ভরা বিষাদ নিয়ে—বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অনুপস্থিতির বিষাদ।
২১ ফেব্রুয়ারি। পাকিস্তান বনাম নিউজিল্যান্ডের ম্যাচ। যথারীতি সংবাদ সংগ্রহের জন্য শ্রীলঙ্কার প্রেমাদাসা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। কিছুক্ষণ পর পাকিস্তান দলের ক্রিকেটারদের বহনকারী বাস স্টেডিয়ামে প্রবেশ করল। গেটের সামনে ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকা পাকিস্তানি সমর্থকরা বাসটি দেখেই স্লোগান তুললেন—“পাকিস্তান জিন্দাবাদ”।
সেই মুহূর্তে অজান্তেই মনে পড়ল বাংলাদেশের কথা। এমন একটি দৃশ্য তো বিশ্বকাপের মঞ্চে বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও হতে পারত। বাংলাদেশের সমর্থকেরা টিম বাস দেখে স্লোগান দিতেন—“বাংলাদেশ! বাংলাদেশ!” তবে সেই ভাবনা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। বৃষ্টির কারণে ম্যাচটি পরিত্যক্ত হয়। সুপার এইটের প্রথম ম্যাচের এমন স্মৃতি সঙ্গী করেই পরদিন দ্বিতীয় ম্যাচ কাভার করতে রওনা দিলাম শ্রীলঙ্কার পাহাড়ঘেরা শহর ক্যান্ডির উদ্দেশে।
গেটের সামনে ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকা পাকিস্তানি সমর্থকরা বাসটি দেখেই স্লোগান তুললেন—“পাকিস্তান জিন্দাবাদ”। সেই মুহূর্তে অজান্তেই মনে পড়েছে বাংলাদেশের কথা। এমন একটি দৃশ্য তো বিশ্বকাপের মঞ্চে বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও হতে পারত।
পাল্লেকেলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম—উঁচু পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে ওঠা এক দৃষ্টিনন্দন মাঠ। প্রেস বক্স থেকে পাহাড়ের সৌন্দর্য আর ক্রিকেট—দুটো মিলেমিশে যেন এক অপূর্ব দৃশ্যপট তৈরি করে। বিশেষ করে ‘গ্রিন গ্যালারি’, যেখানে দর্শকেরা সবুজ ঘাসে বসে পা দুলিয়ে উপভোগ করেন ম্যাচের প্রতিটি মুহূর্ত।
সেদিন শ্রীলঙ্কা ও ইংল্যান্ডের একপেশে ম্যাচ দেখতে হয়েছিল। ঘরের মাঠে সমর্থকদের সামনে শ্রীলঙ্কা হার মানে ইংল্যান্ডের কাছে। চারপাশে পাহাড় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকলেও সেদিন যেন মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেননি স্বাগতিক ক্রিকেটাররা।
পরদিন আবার পাকিস্তান প্রসঙ্গ। অনুশীলনের দিন ও ম্যাচের আগের দিন পাকিস্তান দলের প্রেস কনফারেন্স ছিল। যেহেতু বাংলাদেশ এই বিশ্বকাপে নেই, তাই শ্রীলঙ্কায় পাকিস্তান দলের সংবাদ কাভার করাই যেন একপ্রকার প্রধান দায়িত্ব হয়ে উঠেছিল।
আসলে ইংল্যান্ড, পাকিস্তান কিংবা শ্রীলঙ্কা—এসব দলের ম্যাচ বা অনুশীলন কাভার করার কথা ছিল না। কিন্তু বাংলাদেশ বিশ্বকাপে না থাকায় পরিস্থিতি বদলে যায়। বাংলাদেশের অনুশীলন, প্রেস কনফারেন্স কিংবা টিম হোটেলের নানা আয়োজন—বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলকে ঘিরে যে ধরনের সংবাদ সংগ্রহের কাজ থাকে, সেসব কিছুই ছিল না।
তারপরও মাঠের ক্রিকেট দেখতে দেখতে বারবার মনে পড়েছে বাংলাদেশকেই। শ্রীলঙ্কার কলম্বো থেকে ক্যান্ডি, আবার ক্যান্ডি থেকে কলম্বো—এভাবেই ঘুরে ঘুরে সুপার এইটের ম্যাচ কাভার করে শেষ পর্যন্ত ফিরতে হয়েছে ঢাকায়। বিশ্বকাপ শেষ হয়নি তখনও, কিন্তু আমার কাছে বিশ্বকাপের গল্পে সবচেয়ে বড় শূন্যতা ছিল একটাই—বাংলাদেশের অনুপস্থিতি।
মোশারফ হোসাইন, ফ্রিল্যান্স স্পোর্টস জার্নালিস্ট