World Cup Football Field

বিজ্ঞাপন

মেসিকে ঘিরে সতীর্থদের আবেগ–গান–লড়াই, আরেকটি ট্যাঙ্গো নাচের উপলক্ষ্য

মেসিকে ঘিরে সতীর্থদের আবেগ–গান–লড়াই, আরেকটি ট্যাঙ্গো নাচের উপলক্ষ্য

‘লা কুয়ার্তা এসত্রেয়া’—২০২৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টাইন ফুটবলার ও সমর্থকদের মুখে বারবার বেজে ওঠে এই সুর। কী কথা আছে এই গানে, কেন নিজেদের ২০২২ বিশ্বকাপে গাওয়া ‘মুচাচোস’ বাদ দিয়ে নতুন সংগীত বেছে নিলো আলবিসেলেস্তেরা? সেই কারণ খোঁজার চেয়ে গানটির কথায় নজর দেওয়া বরং আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। যেখানে মেসির সঙ্গে চতুর্থ বিশ্বকাপ জেতার কথা বলছেন তার সতীর্থরা। একই সুর ছিল গত বিশ্বকাপেও, আর এখানেই অন্যদের চেয়ে আলাদা আর্জেন্টিনা! 

ফুটবল ইতিহাসে আগে কখনও এমন হয়নি যে, একজন কিংবদন্তি খেলোয়াড়কে তার সতীর্থরাই খেলার সময় তাকে উৎসর্গ করে গান গেয়েছেন। কিন্তু মেসির ক্ষেত্রে যেন প্রতিনিয়তই নতুন ইতিহাস লেখা হচ্ছে। লিয়েন্দ্রো পারেদেস ঘটনাটির সবচেয়ে সুন্দর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ইংল্যান্ড ম্যাচের পর যখন মেসিকে কাঁদতে দেখেছিলেন, তখন সবাই তাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। শুধু সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য নয়, বরং তাকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য যে, তারা তার পাশে আছে এবং তার শেষ ম্যাচটি যেন কখনও না আসে, সে জন্য মাঠে নিজেদের সর্বস্ব উজাড় করে দিতেও প্রস্তুত।

অর্থাৎ, মেসিকে ঘিরে গড়ে ওঠা যে স্বপ্নের বাস্তবায়ন হয়েছে কাতারে, আবারও সেই স্বপ্নে বিভোর হয়ে উজাড় করে দিতে চায় আর্জেন্টাইন মহাতারকার সতীর্থরা। আর মেসি? তিনি কি বাকিদের ওপর নির্ভর করে বসে আছেন? সমস্ত পরিসংখ্যান এই প্রশ্নকে কেটে টুকরো টুকরো করে দেয়! মেসি বল পায়ে কিংবা বল ছাড়াই যখন ম্যাচের মোমেন্টাম বুঝে হাঁটেন, তখনও উপকৃত হয় আর্জেন্টিনা। সম্প্রতি এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে– চলতি বিশ্বকাপে মেসি তার অতিক্রম করা মোট দূরত্বের ৪৭ শতাংশই হেঁটেছেন, যা সব আউটফিল্ড খেলোয়াড়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। 

বহু বছর ধরে আর্জেন্টিনার বড় একটি অংশ মেসিকে ছোট করে দেখেছে। কারণ তাদের কাছে মেসিকে শুধু মেসি হলেই চলত না, তাকে হতে হতো দিয়েগো ম্যারাডোনা। যখন বিশ্বের বাকি অংশ নিজের দলে একজন মেসিকে পাওয়ার স্বপ্ন দেখছিল, তখন অনেক আর্জেন্টাইন বিশ্বাস করতেন, কোপা লিবার্তাদোরেসে কয়েকজন কঠিন ডিফেন্ডারের মুখোমুখি হলেই মেসি চায়ের কাপে গলে যাওয়া চিনির মতো হারিয়ে যাবেন। তবে মেসি সেই বৃত্তের মধ্যে বন্দী কেউ নন, ম্যারাডোনার সঙ্গে তার তুলনা হয় না সেভাবে। বরং নিজেই নিজের পরিচয় হয়ে উঠেছেন। অর্জন করেছেন সর্বসম্মত স্বীকৃতি ও ভালোবাসা।

ম্যারাডোনা শুধু একজন ফুটবলার ছিলেন না, তিনি ছিলেন প্রতিভাবান, আত্মবিশ্বাসী এবং স্বদেশকে পরাশক্তি হিসেবে দেখার মানসিকতার প্রতীক। এ কারণেই জর্জ বুশ, পোপ, ফিফা, ফিদেল কাস্ত্রো কিংবা হুগো শাভেজ– সব বিষয়েই কথা বলতে দেখা যেত। ম্যারাডোনা ছিলেন অসাধারণ প্রতিভাবান এবং প্রায়ই উদার মনের মানুষ। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি আঘাত করতে, অপমান করতে, আক্রমণ করতে ও বিতর্ক সৃষ্টি করতেও পারদর্শী ছিলেন। রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থার সুফল পাওয়া ম্যারাডোনা শব্দের শক্তি বুঝতেন। অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে জন্ম হলেও নিজের অনুভূতি প্রকাশে তার ছিল অসাধারণ দক্ষতা।

বিপরীতে, অপেক্ষাকৃত দুর্বল এক আর্জেন্টাইন ঘরের সন্তান মেসির ভাষা অনেক সংক্ষিপ্ত। তার শব্দভাণ্ডার সীমিত, বাক্যও ছোট। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এতে উন্নতি এসেছে। কিন্তু এভাবেই তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন এবং এই পথেই গড়ে তুলেছেন আর্জেন্টাইন ফুটবল ও জাতীয় পরিচয়ের এক নতুন রূপ। এখন আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের সর্বোচ্চ আসনে ম্যারাডোনার পাশে নিজের জায়গা স্থায়ী করে নিয়েছেন মেসি।

চলতি বিশ্বকাপে ফেরা যাক, দল যখনই বিপদে পড়েছে ৩৯ বছরের মেসিই সেই রোগের উপশম হয়েছেন। গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন। গোল করেছেন, করিয়েছেন। ক্যারিয়ারে পড়ন্ত বেলাতেও ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট করে প্রতিনিয়ত গোল্ডেন বুটের দৌড়ে শীর্ষ সারিতে আছেন। ভেঙেছেন বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডও (এখন পর্যন্ত ২১, তবে ২২ গোল করে তাকে টপকেছেন কিলিয়ান এমবাপে)। গোলের সুযোগ তৈরি, কাঙ্ক্ষিত গোল, প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে বারবার আতঙ্ক তৈরি সবদিক থেকেই মেসি এগিয়ে। ফলে ২১ বছর বয়সেই প্রথম ব্যালন ডি’অর জেতা তারকা এখন ৩৯ বছর বয়সে নবম ব্যালন জেতার মতো সুযোগ তৈরি করে ফেলেছেন।

এই আর্জেন্টিনা দলটি মেসিকে কেন্দ্র করেই গড়ে তোলা হয়েছে। তাকে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জেতানোর লক্ষ্যেই সব পরিকল্পনা। এই দলের অনেকের কাছেই মেসি প্রথমে সতীর্থ নন। তিনি সেই শৈশবের নায়ক, যাকে দেখে তারা ফুটবল খেলতে শুরু করেছিলেন। মাঠে নামার সময়ও দৃশ্যটা একই রকম। সামনে মেসি, পাশে রদ্রিগেো ডি পল, আর পেছনে বাকি সতীর্থরা। যেন নিজেদের সেনাপতিকে ঘিরে রাখা একদল যোদ্ধার সামনে মার্চ করে চলা। আর জাতীয় দল ও ক্লাবের জার্সি বদলালেও মাঠে ও বাইরে ডি পল থাকেন মেসির ছায়া হয়ে।

নিজের তৃতীয় বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলতে নামছেন মেসি। তার সামনে প্রতিপক্ষ স্পেন। যাদের অন্যতম প্রধান ক্লাব বার্সেলোনার লা মাসিয়ায় তার বেড়ে ওঠা। মেসির সেখানকার উত্তরসূরীরাও আছেন স্প্যানিশ দলটিতে। এর মধ্যে লামিনে ইয়ামালের নামটি সবচেয়ে বেশি জ্বলজ্বল করছে। ছোট্ট লামিনেকে বিশেষ এক প্রেক্ষাপটে সাবেক এই বার্সা তারকার কোলে নেওয়া ও গোসল করানোর ছবি তো সবার সামনেই আছে। অবিশ্বাস্যভাবে সেই ফ্রেমের দুজন এখন দুই প্রজন্মের আইকন হিসেবে মুখোমুখি হওয়ার অপেক্ষায়। নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ ফাইনালে আর কয়েক ঘণ্টা পর নামছে মেসি-ইয়ামালের আর্জেন্টিনা-স্পেন।

২০২২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ের অপেক্ষা ফুরোনোর সঙ্গে সঙ্গে তাদের ট্যাঙ্গো নাচটিও নতুন করে আলোচনায় আসে। ছোট ছোট পদক্ষেপে একজন সঙ্গীকে নিয়ে নেচে যেতে হয় অবিরাম। তাদের ফুটবলও সেই ট্যাঙ্গো ধারা মেনে চলে। ছোট ছোট পাসের ফুটবলটাই আর্জেন্টিনা খেলছে। মেটলাইফের ফাইনাল শেষে তাদের সেই নাচ নাকি স্পেনের ফ্লামেঙ্কোর মনোমুগ্ধকর ভঙ্গিমার দর্শক হতে হবে, তা জানতে অপেক্ষাটা বেশি সময়ের নয়!

এএইচএস