দূর পাহাড়ে রুপনাদের কুঁড়েঘর যেন প্রেরণার বাতিঘর

Dhaka Post Desk

মিশু মল্লিক, রাঙামাটি

২২ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৫:৫০ পিএম


দূর পাহাড়ে রুপনাদের কুঁড়েঘর যেন প্রেরণার বাতিঘর

নিজের সেই ছোট্ট কুঁড়েঘরের সামনে রুপনার মা কালাসোনা চাকমা

মঙ্গলবার দিনটি আর দশটা দিনের মতোই সাদামাটা ছিল কালাসোনা চাকমার। সাফের মাঠে মেয়ের অসামান্য কৃতিত্বের কথা লোকমুখে শুনেছেন। ফুটবল খুব একটা না বুঝলেও মোবাইলে দেখেছেন মেয়ের খেলা। নিজের ছেলেদের মুখে বোনের প্রশংসা শুনে আঁচ করতে পেরেছিলেন মেয়ের সাফল্য। কিন্তু মেয়ের সাফল্যের এই গল্প কতটা প্রেরণাদায়ী আর গুরুত্বপূর্ণ তা হয়তো ভালোভাবে বুঝতে পেরেছেন প্রশাসনের কর্মকর্তা, সাংবাদিকসহ অনেক মানুষকে এক সঙ্গে নিজের বাড়ির উঠোনে দেখার পর। কালাসোনা চাকমা কেবল আবেগে ভেসেছেন, তার চোখে তখন খেলা করছে আনন্দের অশ্রু।

গত সোমবার (১৮ সেপ্টেম্বর) নেপালকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জয় করে বাংলাদেশ। সেই জয়ের কারিগরদের একজন রাঙামাটির দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল থেকে উঠে আসা রুপনা চাকমা। রুপনা চাকমা নেপালের দশরথ স্টেডিয়ামে পাহাড়ের মতো দৃঢ়তায় বাংলাদেশ দলের গোলপোস্ট সামলেছেন। হয়েছেন গোটা টুর্নামেন্টের সেরা গোলরক্ষক।

দেশকে দীর্ঘদিন পর আন্তর্জাতিক শিরোপা জেতানো এই রুপনা চাকমার বেড়ে ওঠাটা ফুটবল মাঠে জয় ছিনিয়ে আনার চেয়েও বুঝি কিছুটা কঠিন সংগ্রামের। যে সংগ্রামের গল্প আপনার চোখ ভেজাবে, আবার আপনাকে প্রাণিতও করবে জীবনের কঠিন সময়ে।

রুপনাদের বাড়ি রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলার দুর্গম ভূইয়াদম এলাকায়। সেখানে যেতে হলে প্রধান সড়ক থেকে হেঁটে যেতে হবে আধা ঘন্টা। সেই হাঁটা পথের শেষে আছে একটা ভাঙা নড়বড়ে সেতু। ওই সেতু পার হয়ে তারপর রুপনাদের বাড়ি। বাড়ি বলতে বাঁশের বেড়ার এতটুকুন একটা কুঁড়ে ঘর। যেটিতে মা-বাবা ভাইদের নিয়ে রুপনা থাকেন অনেক বছর।

এই ছোট্ট ঘরটিতে টিকে থাকাও সহজ নয় রুপনাদের। বাবা মারা গেছেন, দুই ভাই আর মা কাজ করেন মাঠে। জুম চাষের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন করে কোনোরকমে চলে তাদের জীবন। বাড়ি থেকে স্কুলে যেতে হলে হাঁটতে হয় মাইলের পর মাইল। খাওয়ার পানির জন্য পাড়ি দিতে হয় দূরের পথ। রোগ-শোকে চিকিৎসা পাওয়াটা তো প্রায় অসম্ভবই। ভালো খাবারের অভাব, ভালো পোশাকের অভাব। দুর্গম অঞ্চল, তাই পৌঁছায় না সরকারি সহায়তার হাতও।   

এত সমস্যা, এত কষ্ট জীবন চলায়, তবু ফুটবল টানতে থাকে রুপনাকে। খেয়ে না খেয়ে তিনি ছুটে যান খেলার মাঠে। বাড়ি থেকে স্কুল, স্কুল থেকে বাড়ি- মাইলের পর মাইল পথ হাঁটেন ফুটবলের জন্য। ফুটবলেই ধ্যান-জ্ঞান, ফুটবলেই জীবন খুঁজে পান তিনি।

অনেক পরিশ্রম, অনেক ত্যাগ আর অনেক দুঃখের পরে অবশেষে এই ফুটবল রুপনাকে কিছুটা সুখ দিতে শুরু করেছে। সবাই এখন তার কথা বলছে, তার বীরত্ব নিয়ে গল্প করছে, তার সংগ্রামী মা-কে সালাম জানাচ্ছে। দূর পাহাড়ে তাদের ছোট্ট কুঁড়েঘরটি এখন রূপ নিয়েছে প্রেরণার বাতিঘরে।

মঙ্গলবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরটা যেমন রুপনাদের বাড়ির উঠোন যেন হয়ে উঠেছিল এক আনন্দ নিকেতন। রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মো. মিজানুর রহমান সদলবলে হাজির হয়েছিলেন সেদিন রুপনাদের বাড়িতে। সাথে ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, রাঙামাটির সাবেক ফুটবলার, জেলা ক্রীড়া সংস্থার কর্মকর্তা ও টিভি-পত্রিকার সাংবাদিকরা। 

জেলা প্রশাসক ফুল, মিষ্টি আর দেড় লক্ষ টাকার চেক তুলে দেন রুপনা চাকমার মা কালাসোনা চাকমার হাতে। ফুল হাতে নিয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন কালাসোনা চাকমা। আবেগ ছুঁয়ে যায় জেলা প্রশাসককেও। রুপনাদের জরাজীর্ণ ঘরটি দেখে বেশ দুঃখ বোধ করেন তিনি। ওই উঠোনেই সবার সামনে নতুন ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার আশ্বাস দেন জেলা প্রশাসক। একইসঙ্গে ওই বাড়িতে যাওয়ার সেতুটি নির্মাণের ব্যাপারেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের কথা জানান তিনি।

রুপনাদের বাড়িতে যাওয়ার অনুভূতি জানাতে গিয়ে জেলা প্রশাসক মিজানুর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, জীবন সম্পর্কে আমার নতুন উপলব্দি হলো এবং ব্যক্তিগত অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করলাম আমি। কত প্রতিভা ছড়িয়ে আছে দেশের আনাচে কানাচে সেটা আরেকবার বুঝতে পারলাম ওদের বাড়িতে গিয়ে।

তিনি বলেন, রুপনার মাকে সম্মানিত করতে পেরে আমি নিজে সম্মানিত বোধ করেছি। আসলে ওদের বাড়িতে না গেলে জানতেই পারতাম না কতটা প্রত্যন্ত এলাকা থেকে তারা উঠে এসেছে। প্রতিভা দেশের যেকোনো জায়গায় জন্ম নিতে পারে সেটার উদাহরণ রুপনা-ঋতুপর্ণারা। এই প্রতিভাকে যত্ম ও লালন-পালন করার দায়িত্ব রাষ্ট্রসহ আমাদের সকলের। 

রুপনাকে বাড়ি করে দেয়ার বিষয়ে জেলা প্রশাসক আরো বলেন, আমি নানিয়ারচর উপজেলা কর্মকর্তাকে ওর বাড়ি করে দেয়া এবং ওর বাড়িতে যাওয়ার সেতুটি করে দেয়ার ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়েছিলাম। এর মধ্যে আজ (বুধবার) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আমাকে ফোন করা হয়েছিল ওর বাড়ি নির্মাণ করে দেয়ার ব্যাপারে। নানিয়ারচর উপজেলা কর্মকর্তা এবং এলজিইডির প্রকৌশলী ওখানে গিয়েছেন। তারা বাড়ির নকশার কাজে হাত দিয়েছেন। অতি দ্রুত আমরা রুপনাদের বাড়ির কাজ শুরু করব।

রুপনা চাকমার বাবা বেঁচে নেই। তার দুই ভাই মাঠে জুম চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। টানাপোড়েনের সংসারে রুপনাই এখন আশার আলো। 

বড়ভাই শান্তি জীবন চাকমা বলেন, আমি মাঠে কাজ করতে গিয়েছিলাম তাই বোনের খেলা দেখতে পারিনি। পরে আমার মায়ের কাছ থেকে বোনের সাফল্যের কথা শুনে খুব আনন্দিত হয়েছি। রুপনা আজ আমাদের মাথাটা উঁচু করে দিয়েছে।

মেয়ের সাফল্যের ব্যাপারে জানতে চাইলে রুপনা চাকমার মা কালাসোনা চাকমা বলেন, আমার মেয়ে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে। গর্বে আমার বুকটা ভরে যাচ্ছে। আমার মেয়ের কারণে এত বড় অফিসাররা আমার বাড়িতে এসেছেন, আমার অনেক খুশি লাগছে। খেলা শেষ করার পর মেয়ে আমাকে ভিডিও কলে কাপ দেখিয়েছিল। মেয়ের কারণেই আজ আমাদের এ সম্মান।

সাফ জয়ের পরদিন মঙ্গলবার জেলা প্রশাসকসহ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা রুপনার বাড়িতে যাওয়ার পর থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রুপনাদের কুঁড়েঘরটির ছবি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। তারপর প্রশাসনসহ অনেকেই তার বাড়ি নির্মাাণের আশ্বাস দেন এবং বুধবার স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তার বাড়ি নির্মাণের নির্দেশ দেন। পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিষ্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমনও রুপনার বাড়ি বানিয়ে দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

এটি

Link copied