তাহিতি—ফ্রেঞ্চ পলিনেশিয়ার সবচেয়ে বড় ও জনবহুল একটি দ্বীপ। পর্যটকদের জন্য এটি যেন এক স্বর্গ, যেখানে রয়েছে চোখ ধাঁধানো সৈকত আর মনোমুগ্ধকর নীল জলরাশি। সামনে হাজার হাজার মাইল বিস্তৃত প্রশান্ত মহাসাগর– যা দৈনন্দিন জীবনের সব দুশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেলে দিতে যথেষ্ট। কিন্তু ফুটবলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এটা যেন পৃথিবীর বাইরের কোনো একটি স্থান।
বিজ্ঞাপন
তাহিতি ইউনাইটেডের কথা ধরুন। তারাই বিশ্বের একমাত্র দল, যারা অ্যাওয়ে ম্যাচ খেলতে গেলে ক্যালেন্ডারের পাতা একদিন এগিয়ে যায়, আর যখন ঘরে ফেরে, তখন যেন ফিরে আসে ‘গতকালে’।
সম্প্রতি ওশেনিয়ার প্রথম পেশাদার ফুটবল প্রতিযোগিতা ওএফসি প্রো লিগের প্রথম আসরে তাহিতিয়ানরা নাম লিখেছে। তাদের খেলতে হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া, ফিজি, নিউজিল্যান্ড, পাপুয়া নিউগিনি, সলোমন আইল্যান্ডস ও ভানুয়াতুর অন্য সাতটি দলের বিপক্ষে। এই সবকটি দেশ তাহিতির পশ্চিমে অবস্থিত—আন্তর্জাতিক তারিখ রেখার পূর্বে।

মানচিত্রে উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর মাঝে ১৮০ ডিগ্রি দ্রাঘিমাংশ বরাবর চলা এই কাল্পনিক রেখাটি বিশ্বজুড়ে দিন পরিবর্তনের চিহ্ন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। উদাহরণস্বরূপ ফিজি থেকে তাহিতির দূরত্ব মাত্র ২,০০০ মাইল– নিউইয়র্ক থেকে ফিনিক্সের দূরত্বের সমান। কিন্তু সময়ের হিসাবে ফিজি তাহিতির চেয়ে ২২ ঘণ্টা এগিয়ে।
বিজ্ঞাপন
বেশ লম্বা দূরত্ব ও ভ্রমণ খরচের কারণে খেলাগুলো হয় একটি সার্কিটে, যেখানে দলগুলো একত্রিত হয়ে প্রত্যেকে দুটি করে ম্যাচ খেলে। ২০২৬ সালের সার্কিটগুলো নির্ধারণ করা হয়েছে অকল্যান্ড, ফিজি, হনিয়ারা, মেলবোর্ন, পোর্ট মোর্সবি ও এর আশপাশ জুড়ে। পুরো মৌসুমে তাহিতি ইউনাইটেডকে প্রায় ৩০,০০০ মাইল আকাশপথ পাড়ি দিতে হবে, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ক্লান্তিকর।
তাহিতির কোনো হোম সূচি নেই। ফলে দীর্ঘ আকাশপথ পাড়ি দিতে হয় তাদের। তারা যখনই অ্যাওয়ে ম্যাচ খেলতে পশ্চিমে যায়, তারা একদিন সামনে এগিয়ে যায়। আবার ফেরার সময় তারা যেন অতীতে ফিরে আসে। দ্বীপের সমর্থকদের কাছে তাদের প্রতিটি ম্যাচই অনুষ্ঠিত হয় ‘আগামীকাল’।

এই কঠিন সূচি সত্ত্বেও ওএফসি প্রো লিগে তাহিতি ইউনাইটেডের অংশগ্রহণ ফ্রেঞ্চ পলিনেশিয়ার ফুটবলে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। ক্লাবের জেনারেল ম্যানেজার তেমুই ক্রলাস ইএসপিএন-কে বলেন, ‘লজিস্টিক চ্যালেঞ্জটা বিশাল। স্কোয়াড ম্যানেজমেন্ট, ট্রেনিং এবং যাতায়াতের সমন্বয় করাটা অনেক জটিল হয়ে যায় যখন আপনি সবসময় আসাযাওয়া করছেন। কিন্তু তাহিতির ফুটবলের পেশাদারীকরণের জন্য এই প্রজেক্টটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
বিজ্ঞাপন
পেশাদার ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নে অনেক খেলোয়াড় তাদের পুরোনো চাকরি ও পরিবারের নিরাপত্তা ছেড়ে এসেছেন। কোচ স্যামুয়েল গার্সিয়া জানান, ইউরোপে গিয়ে সফল হওয়ার হার খুবই কম। তাই এই লিগ স্থানীয় তরুণদের জন্য ঘরোয়া পরিবেশে পেশাদার হওয়ার নতুন সুযোগ করে দিয়েছে।
মাঠের লড়াইয়েও চমক দেখাচ্ছে দলটি। ফিজির বুলা এফসিকে ১-০ গোলে হারিয়ে লিগে প্রথম জয় পায়। দ্বিতীয় জয় আসে পাপুয়া নিউগিনির হেকারির বিপক্ষে। ২-১ গোলের ওই জয়ে তারা প্রমাণ করেছে যে তারা কেবল ভ্রমণের জন্যই আসেনি, জয়ের জন্যও লড়ছে। অধিনায়ক তেওনুই তেহাউ বলেন, ‘অনেকেই আমাদের কাছ থেকে এত ভালো পারফরম্যান্স আশা করেনি। এই জয়গুলো আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে।’

২০২৭ সালে তাহিতি আয়োজন করবে মাল্টিস্পোর্ট ইভেন্ট প্যাসিফিক গেমস, যেখানে ওশেনিয়ার বিভিন্ন দেশের অ্যাথলেটরা যোগ দেবে। ফুটবলও থাকছে এই ইভেন্টে। নিউ ক্যালডনিয়া ও সোলোমন আইল্যান্ডের মতো দলগুলোর বাধা টপকাতে পারলে সেখানে খেলার গৌরব অর্জন করবে তাহিতির জাতীয় দল। কিন্তু তার প্রভাব পড়বে তাহিতি ইউনাইটেডের পরিকল্পনার ওপর।
ক্লাবের জেনারেল ম্যানেজার তেমাউই ক্রোলাস বললেন, ‘আমরা ওএফসি প্রো লিগ সার্কিট আয়োজন করতে চাই ভবিষ্যতে। কিন্তু প্যাসিফিক গেমসের জন্য সেটা কঠিন। আমাদের হোম স্টেডিয়াম এই ইভেন্টের একটি ভেন্যু। তাই আমাদের প্রথম দুটি ওএফসি প্রো লিগের মৌসুম এখানে খেলা সম্ভব নয়। আমাদের লক্ষ্য ২০২৮ সালে প্রথম হোম ম্যাচ খেলা।’
ততদিন পর্যন্ত তাহিতির সমর্থকদের দূর থেকেই খেলা দেখে সন্তুষ্ট থাকতে হবে। আন্তর্জাতিক তারিখ রেখার কারণে ভক্তরা হয়তো সময়ের হিসেবে বর্তমানে ‘অতীত’-এ বাস করছেন, কিন্তু তাদের প্রিয় দলটি ওশেনিয়ার ফুটবলে এক নতুন ‘ভবিষ্যৎ’ লিখছে।
এফএইচএম/
