বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে সুন্দর ও নান্দনিক দলগুলোর তালিকা করলে লাতিন আমেরিকার দল ব্রাজিলের পাশাপাশি যে দেশটির নাম সবার আগে আসবে, তারা হলো নেদারল্যান্ডস। মাঠজুড়ে গতির ঝড় আর পাসের ফুলঝুরি ফুটিয়ে ডাচরা যুগে যুগে কোটি ফুটবল ভক্তের মন জয় করেছে ঠিকই, কিন্তু ফুটবলের পরম আরাধ্য সেই সোনালী ট্রফিটা আজও অধরাই রয়েছে গেছে তাদের।
তিন তিনবার বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেও ট্রফি ছুঁয়ে দেখতে না পারার এই আক্ষেপ ডাচ ফুটবলকে দিয়েছে বিশ্বকাপ ‘না জেতা ইতিহাসের সেরা দলের’ ট্র্যাজিক তকমা।
সত্তরের দশকে কোচ রাইনাস মিশেল ও মাঠের জাদুকর ইয়োহান ক্রুইফের হাত ধরে ফুটবল বিশ্বে বিপ্লব ঘটিয়েছিল নেদারল্যান্ডস। তাদের টোটাল ফুটবল দর্শনে মন্ত্রমুগ্ধ ছিল পুরো দুনিয়া। ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপে ফেভারিট হিসেবেই ফাইনালে স্বাগতিক পশ্চিম জার্মানির মুখোমুখি হয়েছিল ডাচরা।
ম্যাচের দ্বিতীয় মিনিটেই পেনাল্টি থেকে গোল করে এগিয়েও গিয়েছিল তারা। কিন্তু জার্মানির রক্ষণাত্মক দেওয়াল আর কিংবদন্তি জার্ড মুলারের জাদুকরী গোলের কাছে শেষ পর্যন্ত ২-১ ব্যবধানে হেরে স্তব্ধ হতে হয় ক্রুইফ বাহিনীকে। বিশ্বজয় না হলেও সেই আসরটি ফুটবল ইতিহাসে ক্রুইফের বিশ্বকাপ হিসেবেই অমর হয়ে আছে।

এর ঠিক চার বছর পর, ১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে আবারও ফাইনালে ওঠে নেদারল্যান্ডস। এবার দলে ছিলেন না ইয়োহান ক্রুইফ। তবুও ডাচ ডিনামাইটদের আটকানো যাচ্ছিল না। ফাইনালে স্বাগতিক আর্জেন্টিনার বিপক্ষে নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা ১-১ সমতায় শেষ হয়।
ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে ডাচ ফরোয়ার্ড রবেন রেনসেনব্রিঙ্কের একটি শট গোলপোস্টে লেগে ফিরে আসলে ভাগ্য সহায় হয়নি নেদারল্যান্ডসের। পরে অতিরিক্ত সময়ে মারিও কেম্পেসের জোড়া গোলে ৩-১ ব্যবধানে হেরে দ্বিতীয়বারের মতো রানার্স-আপ হয়ে মাঠ ছাড়ে ডাচরা।
দীর্ঘ ৩২ বছর পর, ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে আবার কমলার স্রোত আছড়ে পড়েছিল ফাইনালে। এবার প্রতিপক্ষ ছিল টিকিটাকা ফুটবলের জোয়ারে ভাসতে থাকা স্পেন। আরিয়েন রবেন ও রবিন ফন পার্সিদের সামনে সুবর্ণ সুযোগ ছিল ইতিহাসের ঋণ শোধ করার। পুরো ম্যাচে স্পেনের সঙ্গে সমানে সমানে লড়াই করেছিল ডাচরা। ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে আরিয়েন রবেন স্প্যানিশ গোলরক্ষক ইকার ক্যাসিয়াসকে একা পেয়েও গোল করতে ব্যর্থ হন, যা ডাচ ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় আক্ষেপ।

ম্যাচ যখন টাইব্রেকারের দিকে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই অতিরিক্ত সময়ের ১১৬ মিনিটে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার সেই বুলেট গতির শটে নেদারল্যান্ডসের জালে বল জড়ায়। ১-০ গোলের সেই হারে তৃতীয়বারের মতো বুকভাঙা কান্নায় ভেঙে পড়ে পুরো নেদারল্যান্ডস।
বিশ্বকাপ না জিতলেও নেদারল্যান্ডস বিশ্বকে উপহার দিয়েছে মার্কো ফন বাস্তেন, ডেনিস বার্গক্যাম্প, রুড গুলিত, প্যাট্রিক ক্লুইভার্ট ও আরিয়েন রবেনের মতো সব কিংবদন্তি ফুটবলারদের। ট্রফি না পাওয়ার এই ট্র্যাজেডিই ডাচ ফুটবলকে করে তুলেছে আরও বেশি আকর্ষণীয়।
২০২৬ সালের উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপকে সামনে রেখে আবারও নতুন এক সোনালী প্রজন্ম নিয়ে স্বপ্ন দেখছে ডাচরা। ফুটবলপ্রেমীদেরও একটাই চাওয়া- সুন্দর ফুটবলের এই কারিগরদের আক্ষেপ এবার ঘুচুক, কমলার রঙে রাঙুক বিশ্বমঞ্চ।
এমএমএম/

