১৯৮২ সালে স্পেনে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের দ্বাদশ আসরটি ফুটবল ইতিহাসে এক অনন্য জায়গা দখল করে আছে। এই আসরটি যেমন ইতালির তৃতীয় শিরোপাজয়ের জন্য স্মরণীয়, তেমনি তার চেয়েও বেশি আলোচিত হয়ে আছে ব্রাজিলের সেই সর্বকালের অন্যতম সেরা নান্দনিক দলের করুণ বিদায়ের জন্য।
এই বিশ্বকাপের আসল রূপকথার নায়ক ছিলেন ইতালির ফরোয়ার্ড পাওলো রসি। অথচ টুর্নামেন্ট শুরুর মাত্র কয়েক মাস আগেও তার ফুটবল ক্যারিয়ার ছিল ধ্বংসের মুখে। টোটোনেরো ম্যাচ ফিক্সিং কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে দুই বছরের জন্য ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ ছিলেন তিনি। নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে যখন দলে ফিরলেন, তখনও তার ফিটনেস নিয়ে ছিল তীব্র সমালোচনা। গ্রুপ পর্বেও ছিলেন পুরোপুরি গোল খরায়।
কিন্তু নকআউট পর্বে যেতেই রসি ধারণ করেন এক অবিশ্বাস্য রুদ্রমূর্তি। দ্বিতীয় পর্বে বিশ্বকাঁপানো ব্রাজিলের বিপক্ষে তার সেই ঐতিহাসিক ও অতিমানবীয় হ্যাটট্রিক আজও বিশ্বকাপের ইতিহাসের সেরা একক পারফরম্যান্সের তালিকায় শীর্ষ স্থান দখল করে আছে। এই ধাক্কা সামলে সেমিফাইনালে পোল্যান্ডের বিপক্ষে জোড়া গোল এবং ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষেও গোল করেন তিনি। পুরো টুর্নামেন্টে মোট ৬টি গোল করে গোল্ডেন বুট ও গোল্ডেন বল- দুটি সর্বোচ্চ পুরস্কারই নিজের শোকেসে পুরে নেন এই পুনরুত্থিত নায়ক।

সক্রেটিস, জিকো, ফ্যালকাও আর এদেরকে নিয়ে গড়া ১৯৮২ সালের ব্রাজিল দলটিকে ফুটবল বিশ্লেষকরা একবাক্যে বলেন শিরোপা না জেতা ইতিহাসের সেরা দল। তাদের জোগো বনিতো বা সুন্দর ফুটবলের জাদুতে পুরো বিশ্ব বুঁদ হয়ে ছিল। আক্রমণাত্মক ফুটবলের যে নিখুঁত প্রদর্শনী তারা দেখিয়েছিলেন, তা ছিল চোখে জল এনে দেওয়ার মতো সুন্দর।
কিন্তু অতি-আক্রমণাত্মক মানসিকতা আর রক্ষণভাগের চরম দুর্বলতাই তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। দ্বিতীয় পর্বের বাঁচা-মরার ম্যাচে ইতালির রক্ষণাত্মক কৌশলের কাছে ৩-২ গোলে হেরে স্তব্ধ হয়ে যায় সেলেসাওরা। ব্রাজিলের এই করুণ বিদায়কে আজও ফুটবলের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিগুলোর একটি বলা হয়, যা প্রমাণ করে- ফুটবলে সবসময় সুন্দর ফুটবলের জয় হয় না।

মাদ্রিদের সান্তিয়াগো বার্নাব্যু স্টেডিয়ামে শিরোপা নির্ধারণী ফাইনাল ম্যাচে শক্তিশালী পশ্চিম জার্মানিকে ৩-১ গোলের বড় ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে ইতালি। দলের ৪০ বছর বয়সী কিংবদন্তি গোলরক্ষক ও অধিনায়ক ডিনো জফ ইতিহাসের প্রবীণতম খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফি উঁচিয়ে ধরার অনন্য রেকর্ড গড়েন।
তবে এই আসরের সবচেয়ে নাটকীয় ও বিচিত্র ঘটনাটি ঘটেছিল কুয়েত বনাম ফ্রান্সের গ্রুপ পর্বের ম্যাচে। ফ্রান্সের এক গোলের পর কুয়েতের ডিফেন্ডাররা দাবি করেন গ্যালারি থেকে রেফারির বাঁশির মতো কোনো আওয়াজ শুনে তারা খেলা থামিয়ে দিয়েছিলেন।
এই নিয়ে মাঠে চরম উত্তেজনা তৈরি হলে কুয়েতি ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি শেখ ফাহাদ আল-আহমেদ আল-সাবাহ সরাসরি ভিআইপি গ্যালারি থেকে মাঠে নেমে আসেন। তিনি রেফারির সাথে তীব্র তর্কাতর্কি করে তার দল নিয়ে মাঠ ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি দেন। ফুটবল ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা ঘটিয়ে কুয়েতি শেখের সেই প্রতিবাদের মুখে রেফারি শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সের দেওয়া সেই বৈধ গোলটি বাতিল করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
এই বিশ্বকাপেই প্রথমবারের মতো ১৬ দলের পরিবর্তে ২৪টি দল অংশ নেয়। এই আসরেই হাঙ্গেরি এল সালভাদরকে ১০-১ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসের বৃহত্তম জয়ের রেকর্ড গড়ে। এছাড়া ইতিহাসের প্রথম পেনাল্টি শুট-আউটের সাক্ষী হয় এই আসর।
এমএমএম/

