ফিফা বিশ্বকাপে তিউনিসিয়ার যোগ্যতা অর্জন এখন আর কোনো বিরল ঘটনা নয়। উত্তর আমেরিকায় হতে যাওয়া প্রতিযোগিতার টিকিট নিশ্চিত করে ‘ইগলস অফ কার্থেজ বিশ্বমঞ্চে তাদের অবস্থান আরও সুসংহত করেছে। এটি তাদের সব মিলিয়ে সপ্তম এবং টানা তৃতীয়বারের মতো অংশগ্রহণ। এর মাধ্যমে তিউনিসিয়া একবিংশ শতাব্দীর সাতটি বিশ্বকাপের মধ্যে পাঁচটিতেই খেলার যোগ্যতা অর্জন করল।
যদিও তারা এখন পর্যন্ত গ্রুপ পর্বের বাধা টপকাতে পারেনি, তবে সাম্প্রতিক আসরগুলোতে তাদের ধারাবাহিক উপস্থিতি দলকে অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ করেছে। কানাডা, মেক্সিকো এবং যুক্তরাষ্ট্রে যখন তারা মাঠে নামবে, সেই অভিজ্ঞতা ও অনুপ্রেরণা তাদের গ্রুপ পর্বের গণ্ডি পেরোতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তিউনিসিয়া কোচ: সাবরি লামুশি
২০২৫ সালের আফ্রিকান কাপ অফ নেশনস থেকে বিদায়ের পর সামি ট্রাবেলসিলের স্থলাভিষিক্ত হয়ে সাবরি লামুশি বিশ্বকাপের ডাগআউটে তিউনিসিয়ার হাল ধরেছেন। ৫৪ বছর বয়সী সাবেক এই ফরাসি আন্তর্জাতিক ফুটবলারের বিশ্বমঞ্চে দল পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে। এর আগে তিনি ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে আইভরি কোস্টের প্রধান কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

তিউনিসিয়ার বিশ্বকাপ সূচি
১৪ জুন: সুইডেন বনাম তিউনিসিয়া – এস্তাদিও মন্টেরি
২০ জুন: তিউনিসিয়া বনাম জাপান – এস্তাদিও মন্টেরি
২৫ জুন: তিউনিসিয়া বনাম নেদারল্যান্ডস – কানসাস সিটি স্টেডিয়াম
তিউনিসিয়ার বিশ্বকাপ ইতিহাস
কনফেডারেশন: সিএএফ
সেরা বিশ্বকাপ ফলাফল: গ্রুপ পর্ব
সর্বশেষ বিশ্বকাপ: কাতার ২০২২ (গ্রুপ পর্ব)
প্রথম বিশ্বকাপ: আর্জেন্টিনা ১৯৭৮ (গ্রুপ পর্ব)
বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ: ৭ বার (১৯৭৮, ১৯৯৮, ২০০২, ২০০৬, ২০১৮, ২০২২, ২০২৬)
টানা যোগ্যতা অর্জন: ৩ বার
সামগ্রিক বিশ্বকাপ রেকর্ড: ম্যাচ-১৮, জয়-৩, ড্র-৫, হার-১০, গোল দিয়েছে-১৪, গোল খেয়েছে-২৬।
ফিফা র্যাঙ্কিং: ৪৬তম
তিউনিসিয়ার শেষ বিশ্বকাপ
কাতার ২০২২-এ তিউনিসিয়া অত্যন্ত কঠিন একটি গ্রুপে পড়েছিল, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স, ডেনমার্ক ও অস্ট্রেলিয়া। জালেল কাদ্রির দলের জন্য বাছাইপর্বের পথটি বেশ কঠিন ছিল এবং প্রত্যাশাও খুব বেশি ছিল না। তবে ইগলস অফ কার্থেজ সবাইকে চমকে দিয়ে ৪১,০০০-এর বেশি দর্শকের সামনে ডেনমার্কের সাথে ০-০ ড্র করে আসর শুরু করে।
দ্বিতীয় ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার কাছে ১-০ গোলের বেদনাদায়ক হার তাদের পরের রাউন্ডে যাওয়ার সমীকরণ কঠিন করে তোলে। তবে তারা তাদের সেরা মুহূর্তটি জমিয়ে রেখেছিল শেষ ম্যাচের জন্য। নকআউট নিশ্চিত করে ফেলা আগের আসরের চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সের বিপক্ষে ৫৮ মিনিটে ওয়াহবি খাজরির দর্শনীয় গোলে ১-০ ব্যবধানে জয় পায় তিউনিসিয়া।
এই রোমাঞ্চকর জয় সত্ত্বেও অন্য ম্যাচে অস্ট্রেলিয়া ডেনমার্ককে হারিয়ে দেওয়ায় তিউনিসিয়াকে গ্রুপে তৃতীয় হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়। তবুও বিশ্বজুড়ে সমর্থকদের মুগ্ধ করে তারা মাথা উঁচু করেই টুর্নামেন্ট শেষ করেছিল।

তিউনিসিয়ার প্রথম বিশ্বকাপ
১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনার মাটিতে প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে নামে তিউনিসিয়া। মেক্সিকোর বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও ৩-১ গোলে জয় পায়। প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে বিশ্বকাপে জয়ের স্বাদ পায় তারা। তারপর পোল্যান্ডের কাছে মাত্র ১-০ গোলে হারের পর পশ্চিম জার্মানির সঙ্গে গোলশূন্য ড্রয়ে চমক দেখিয়ে আসর শেষ করেছিল তারা।
তিউনিসিয়ার বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা
বিশ্বকাপের ছয়টি আসরে তিউনিসিয়ার করা ১৪টি গোলের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩টি গোল করেছেন ওয়াহবি খাজরি। রাশিয়া ২০১৮ এবং কাতার ২০২২—এই দুই আসরে খেলে তিনি তিউনিসিয়ার সর্বকালের সেরা বিশ্বকাপ গোলদাতার আসনটি দখল করেছেন। রাশিয়ায় বেলজিয়ামের বিপক্ষে হামদি নাগগুয়েজের ক্রস থেকে থিবো কুর্তোয়াকে পরাস্ত করে তিনি তার খাতা খোলেন। ওই টুর্নামেন্টেই পানামার বিপক্ষে ২-১ জয়ের ম্যাচেও তিনি গোল করেছিলেন।
তবে তার সবচেয়ে স্মরণীয় গোলটি আসে চার বছর পর কাতারে। মাঝমাঠের ওপাশ থেকে বল নিয়ে দুর্দান্ত কাউন্টার অ্যাটাকে পেনাল্টি এরিয়ার সামনে পৌঁছে নিচু শটে গোলরক্ষক স্টিভ মানদানদাকে বোকা বানিয়ে তিনি আগের আসরের চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সের বিপক্ষে জয় নিশ্চিত করেন।
তিউনিসিয়ার রেকর্ড বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলা খেলোয়াড়
মিডফিল্ড তারকা কায়েস গোধবানে এবং রিয়াদ বুয়াজিজি যৌথভাবে তিউনিসিয়ার হয়ে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ডটি ধরে রেখেছেন। তারা ১৯৯৮, ২০০২ এবং ২০০৬—এই টানা তিন আসরে মোট ৮টি করে ম্যাচ খেলেছেন। তাদের ঠিক পরেই রয়েছেন হাতেম ট্রাবেলসি, যিনি এই তিন আসরে মোট ৭টি ম্যাচ খেলেছেন।
তিউনিসিয়ার সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ জয়
তিউনিসিয়ার বিশ্বকাপ ইতিহাসের তিনটি জয়ের মধ্যে ১৯৭৮ সালের অভিষেকে মেক্সিকোর বিপক্ষে ৩-১ ব্যবধানের জয়টি আজও অনন্য হয়ে আছে। এটিই বিশ্বকাপের মঞ্চে তিউনিসিয়ার একমাত্র ২ গোলের ব্যবধানের জয় এবং একমাত্র ম্যাচ যেখানে তারা ৩টি গোল করেছিল। কোচ আবদেল মজিদ শেতালির শিষ্যদের গড়া সেই রেকর্ডটি দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে অক্ষত রয়েছে।
তিউনিসিয়ার বিশ্বকাপ স্কোয়াড
গোলকিপার- সাবরি বেন হাসান, আবদেলমউহিব চামাখ, আয়মান দাহমেনে
ডিফেন্ডার- আলি আবদি, মোহামেদ আমিন বেন হামিদা, আদেম আরৌস, ডিলান ব্রোন, রায়েদ চিকাহুই, মউতাজ নেফাতি, ওমর রেকিক, মন্তাসার তালবি, ইয়ান ভ্যালেরি
মিডফিল্ডার- মরতাদা বেন ওয়ানেস, আনিস বেন স্লিমান, ইসমাইল ঘারবি, রানি খেদিরা, হাদজ মাহমুদ, হানিবাল মেজব্রি, এলিয়েস স্কিরি
ফরোয়ার্ড- এলিয়াস আচৌরি, খলিল আয়ারি, ফিরাস শাওয়াত, রায়ান এল্লুমি, হাযেম মাস্তুরি, এলিয়াস সাদ, সেবাস্তিয়ান তৌনেকতি
এফএইচএম

