World Cup Football Field

বিজ্ঞাপন

বিশ্বকাপে এবারও পদকের লক্ষ্য ক্রোয়েশিয়ার

বিশ্বকাপে এবারও পদকের লক্ষ্য ক্রোয়েশিয়ার

ফ্রান্সে নিজেদের উদ্বোধনী বিশ্বকাপ তৃতীয় স্থানে থেকে শেষ করে ক্রোয়েশিয়া তাদের লক্ষ্যের জানান দিয়েছিল। যুগোস্লাভিয়ার ছত্রছায়ায় কয়েক দশক প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পর স্বাধীনতা লাভ করে তারা। তারপর থেকে বলকান দেশটি ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে ধারাবাহিকভাবে তাদের সামর্থ্যের চেয়েও বেশি ভালো পারফরম্যান্স করে আসছে।

রাশিয়াতে ফাইনালে পৌঁছানো ও কাতারে আরেকবার তৃতীয় স্থান অর্জন করে ক্রোয়েশিয়া। তাতে এখন পর্যন্ত তাদের বিশ্বকাপের উপস্থিতির অর্ধেক সময়ে সেমিফাইনালে ওঠার অবিশ্বাস্য রেকর্ডের অধিকারী তারা। চার মিলিয়নেরও কম জনসংখ্যার একটি দেশের জন্য এটি আরও বেশি চমৎকার ব্যাপার।

৪০ বছর বয়সেও তারকা লুকা মদ্রিচ এখনও দলের অত্যন্ত প্রভাবশালী শক্তি। তার  প্রেরণাতে ক্রোয়েশিয়া উয়েফা বাছাইপর্বে অনায়াসেই পার হয়েছে এবং জ্লাতকো দালিচের শিষ্যরা ফিফা বিশ্বকাপে আবারও অনেক দূর এগিয়ে গেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

ক্রোয়েশিয়ার কোচ: জ্লাতকো দালিচ

দালিচ টানা তৃতীয় ফিফা বিশ্বকাপের জন্য ক্রোয়েশিয়াকে নেতৃত্ব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। গত দুটি টুর্নামেন্টে তিনি দেশটিকে সাফল্যের শিখরে নিয়ে গেছেন। ৫৭ বছর বয়সী এই কোচ ২০১৭ সালে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, শুরুতে কোনো চুক্তি ছিল না এবং তারপর থেকে তিনি এই বলকান দেশটিকে আন্তর্জাতিক ফুটবলে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।

দালিচ মদ্রিচ ও সতীর্থ অভিজ্ঞ খেলোয়াড় ইভান পেরিসিচ এবং আন্দ্রে ক্রামারিচের ওপর নির্ভর করা অব্যাহত রাখলেও বাছাইপর্বের অভিযানে একঝাঁক উদীয়মান খেলোয়াড়কে অন্তর্ভুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন—বিশেষ করে ১৮ বছর বয়সী সেন্টার-ব্যাক লুকা ভুশকোভিচ, সাথে ইগর মাতানোভিচ, ফ্রাঞ্জো ইভানোভিচ ও মার্কো পাসালিচের মতো খেলোয়াড়রা যারা সবাই বিশের কোঠায় রয়েছেন। উত্তর আমেরিকায় তরুণ ও রোমাঞ্চকর প্রতিভায় ভরপুর থাকার লক্ষ্য তাদের।

ক্রোয়েশিয়ার বিশ্বকাপ সূচি

১৭ জুন: ইংল্যান্ড বনাম ক্রোয়েশিয়া - ডালাস স্টেডিয়াম

২৩ জুন: পানামা বনাম ক্রোয়েশিয়া - টরন্টো স্টেডিয়াম

২৭ জুন: ক্রোয়েশিয়া বনাম ঘানা - ফিলাডেলফিয়া স্টেডিয়াম

ক্রোয়েশিয়ার বিশ্বকাপের ইতিহাস

কনফেডারেশন: উয়েফা

সেরা বিশ্বকাপ: রানার্স-আপ (২০১৮)

শেষ বিশ্বকাপ: কাতার ২০২২ (তৃতীয় স্থান)

প্রথম বিশ্বকাপ: ফ্রান্স ১৯৯৮ (তৃতীয় স্থান)

বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ: ৭ বার (১৯৯৮, ২০০২, ২০০৬, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২, ২০২৬)

টানা যোগ্যতার বর্তমান ধারা: চারবার

সামগ্রিক বিশ্বকাপ রেকর্ড: ম্যাচ ৩০, জয় ১৩, ড্র ৮, হার ৯, গোল করেছে ৪৩, গোল খেয়েছে ৩৩

ফিফা র‌্যাঙ্কিং: ১১তম।

ক্রোয়েশিয়ার শেষ বিশ্বকাপ

ক্রোয়েশিয়া রাশিয়ার সেই রূপকথার মতো ফাইনাল যাত্রার পর কাতারে আরও একটি অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখায়। লাল-সাদা চেকআউট জার্সিধারীরা গ্রুপ পর্বে মরক্কো ও বেলজিয়ামের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র এবং কানাডাকে ৪-১ গোলে হারিয়ে নকআউট পর্বে পৌঁছায়। সেখানে তারা জাপান এবং তারপর পেনাল্টিতে ফেভারিট ব্রাজিলকে পরাজিত করে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে।

লিওনেল মেসির অনুপ্রেরণায় আর্জেন্টিনার কাছে সেমিফাইনালে ৩-০ ব্যবধানে হারলেও ক্রোয়েশিয়া মরক্কোকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে তৃতীয় স্থান নিশ্চিত করে টুর্নামেন্ট শেষ করে। দালিচ বলেছিলেন, ‘এটি সোনালি আভার ব্রোঞ্জ। আমরা একটি কঠিন ম্যাচ জিতেছি। এটি ক্রোয়েশিয়ান জনগণের জন্য একটি পদক... এটি সত্যিই দুর্দান্ত যে আমরা দুটি টুর্নামেন্টে দুটি পদক জিতেছি, আমার খেলোয়াড়দের অনেক অভিনন্দন।’

ক্রোয়েশিয়ার প্রথম বিশ্বকাপ

ফ্রান্স ১৯৯৮-এ ক্রোয়েশিয়ার সেমিফাইনালে ওঠার মহাকাব্যিক যাত্রা ছিল সর্বকালের সবচেয়ে সফল অভিষেক বিশ্বকাপ অভিযানগুলোর একটি। বলকান যুদ্ধ এবং যুগোস্লাভিয়ার বিচ্ছেদের পর একটি সদ্য স্বাধীন দেশ হিসেবে বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলোর বিপক্ষে লড়াই এবং জয়ের এই প্রেক্ষাপট জাতীয় গর্বকে বাড়িয়ে তুলেছিল।

মিরোস্লাভ ব্লাজেভিচের নেতৃত্বে উয়েফা ইউরো ১৯৯৬-এর কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছানোর পর ক্রোয়েশিয়ার মধ্যে একটি আত্মবিশ্বাস ছিল। তারা জ্যামাইকার বিপক্ষে ৩-১ ব্যবধানে জয় দিয়ে গ্রুপ পর্ব শুরু করে এবং জাপানের বিপক্ষে ১-০ ব্যবধানে জয় পায়। আর্জেন্টিনার কাছে ১-০ ব্যবধানে হারলেও তারা নকআউট পর্বে ওঠে।

গ্রুপ পর্বে দুটি গোল করা দাভোর শুকার শেষ ১৬-তে রোমানিয়াকে বিদায় করতে পেনাল্টি থেকে গোল করেন। কোয়ার্টার ফাইনালে শক্তিশালী জার্মানির বিপক্ষে ক্রোয়েশিয়ার জয়ের সম্ভাবনা খুব কম মানুষই দেখেছিলেন, কিন্তু ৪০তম মিনিটে শুকারকে ফেলে দেওয়ায় ক্রিশ্চিয়ান ওয়ার্নসের লাল কার্ড খেলার মোড় ঘুরিয়ে দেয়। রবার্ট জার্নি, গোরান ভ্লাওভিচ এবং শুকারের গোলে ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে ৩-০ ব্যবধানে এক চমক জাগানো জয় পায়।

অবিশ্বাস্যভাবে, সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে শুকারের গোলে ক্রোয়েশিয়া লিড নেয়। কিন্তু এক নাটকীয় মোড়ে, ডিফেন্ডার লিলিয়ান থুরাম দুটি গোল করেন—যা ছিল তার ১৪২ ম্যাচের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে করা মাত্র দুটি গোল—এবং স্বাগতিকদের ফাইনালে পৌঁছে দেন। তবে শুকার দমে যাননি, তিনি নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে আবারও গোল করে ফিফা গোল্ডেন বুট ও ক্রোয়েশিয়ার জন্য ব্রোঞ্জ পদক নিশ্চিত করতে সাহায্য করেন।

বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার সর্বোচ্চ গোলদাতা

ফ্রান্স ১৯৯৮-এ ছয়টি গোল করে শুকার ক্রোয়েশিয়ার যৌথ সর্বোচ্চ গোলদাতা, সাথে আছেন পেরিসিচ যার তিনটি টুর্নামেন্ট মিলিয়ে সমান সংখ্যক গোল রয়েছে। পেরিসিচ ব্রাজিল ২০১৪-তে দুটি, রাশিয়া ২০১৮-তে সেমিফাইনাল ও ফাইনালসহ তিনটি এবং কাতার ২০২২-এ জাপানের বিপক্ষে একটি গোল করেছেন। ৩৬ বছর বয়সেও পেরিসিচ এখনও খেলছেন, তাই উত্তর আমেরিকায় এককভাবে শীর্ষ গোলদাতা হওয়ার সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে তার সামনে।

বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা ক্রোয়েশিয়ান খেলোয়াড়

মদ্রিচ চারটি বিশ্বকাপে অবিশ্বাস্যভাবে ১৯টি ম্যাচ খেলেছেন। যদি আগামী বছর ক্রোয়েশিয়া টুর্নামেন্টে অনেক দূর যেতে পারে, তবে তার কাছে সর্বকালের তালিকার শীর্ষে ওঠার সুযোগ থাকবে। সক্রিয় খেলোয়াড়দের মধ্যে কেবল লিওনেল মেসি ওে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এই অভিজাত গ্রুপে এসি মিলানের এই মিডফিল্ডারের চেয়ে এগিয়ে আছেন। পেরিসিচ ১৭টি ম্যাচ নিয়ে মদ্রিচের ঠিক পেছনেই রয়েছেন।

বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার সবচেয়ে বড় জয়

ব্রাজিল ২০১৪-এর গ্রুপ পর্বে ক্রোয়েশিয়া কেবল একটি জয় পেয়েছিল—কিন্তু এটিই এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে তাদের সবচেয়ে বড় জয়। প্রথমার্ধের শেষের দিকে অ্যালেক্স সংয়ের লাল কার্ডের সুবিধা নিয়ে ক্রোয়েশিয়া ক্যামেরুনকে ৪-০ ব্যবধানে পরাজিত করে। গোলগুলো করেছিলেন ইভিকা অলিচ, পেরিসিচ এবং মানজুকিচ (জোড়া গোল)।

ক্রোয়েশিয়ার বিশ্বকাপ স্কোয়াড

গোলকিপার- ডমিনিক লিভাকোভিচ, ডমিনিক কোটারস্কি, ইভর পান্দুর

ডিফেন্ডার- ইয়োশকো গভার্দিওল, দুয়ে চালেতা-সার, ইয়োসিপ শুতালো, ইয়োসিপ স্তানিসিচ, মারিন পংরাচিচ, মার্টিন এরলিচ, লুকা ভুসকোভিচ

মিডফিল্ডার- লুকা মদ্রিচ, মাতেও কোভাচিচ, মারিও পাসালিচ, নিকোলা ভ্লাসিচ, লুকা সুচিচ, মার্টিন বাতুরিনা, ক্রিস্তিয়ান ইয়াকিচ, পেতার সুচিচ, নিকোলা মোরো, টনি ফ্রুক

ফরোয়ার্ড- ইভান পেরিসিচ, আন্দ্রেই ক্রামারিচ, আনে বুডিমির, মার্কো পাসালিচ, পেতার মুসা, ইগর মাতানোভিচ।

এফএইচএম