শুরু হয়ে গেছে বিশ্বকাপের মহারণ। ৪৮ দলের টুর্নামেন্ট শেষ হবে ৩৯ দিনের লড়াই শেষে। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডাতে হবে ১০৪টি ম্যাচ। আগামী ১৯ জুলাই হবে ফাইনাল। নিউ ইয়র্কের নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে শিরোপার লড়াই হবে। কোন দুটি দল যাবে সেখানে, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে। গ্রুপ পর্বের পাঁচটি ও নকআউটের একাধিক ম্যাচ হবে এই ভেন্যুতে। যে মাঠে মেসি কোপা আমেরিকার বিশেষ আয়োজনে হেরে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন, সেই মাঠে ব্রাজিলের প্রথম ম্যাচ। পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা গ্রুপ পর্বে ফিলাডেলফিয়া স্টেডিয়াম ও মায়ামি স্টেডিয়ামে গ্রুপ ম্যাচ খেলবে।
স্টেডিয়াম: নিউ ইয়র্ক বা নিউ জার্সি স্টেডিয়াম
সাধারণ নাম: মেটলাইফ স্টেডিয়াম
অবস্থান: ইস্ট রাদারফোর্ড, নিউ জার্সি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
উদ্বোধন: ২০১০
টুর্নামেন্ট ধারণক্ষমতা: ৮২,৫০০
বিশ্বকাপ ২০২৬ এর ম্যাচগুলো:
ব্রাজিল বনাম মরক্কো, ১৩ জুন
ফ্রান্স বনাম সেনেগাল, ১৬ জুন
নরওয়ে বনাম সেনেগাল, ২২ জুন
ইকুয়েডর বনাম জার্মানি, ২৫ জুন
পানামা বনাম ইংল্যান্ড, ২৭ জুন
রাউন্ড অব ৩২, ৩০ জুন (আই১ বনাম সি/ডি/এফ/জি/এইচ৩)
রাউন্ড অব ১৬, ৫ জুলাই (বিজয়ী ৭৬ বনাম বিজয়ী ৭৮)
ফাইনাল, ১৯ জুলাই (বিজয়ী ১০১ বনাম বিজয়ী ১০২)

এবারের বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচের এই ভেন্যুটি বড় বড় ইভেন্ট আয়োজনে মোটেও নতুন নয়। এটি শীতপ্রধান শহরের অল্প কয়েকটি উন্মুক্ত ছাদবিহীন স্টেডিয়ামগুলোর একটি, যা সুপার বোল আয়োজন করেছিল। প্রায় ১.৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এই স্টেডিয়ামটি যৌথভাবে ব্যবহার করে এনএফএল-এর দুটি দল ‘জায়ান্টস’ এবং ‘জেটস’, যারা যৌথভাবেই এর নকশা করেছিল। এর বাইরের অংশটি অ্যালুমিনিয়ামের স্ল্যাট বা পাত দিয়ে ঘেরা এবং এর বিশাল গ্যালারির মাঝখানে কেবল চারটি হাই-ডেফিনিশন টিভি স্ক্রিন রয়েছে। স্টেডিয়ামের ওপর কোনো ছাদ নেই এবং কেবল কিছু আসনের ওপর ছোট একটি ছাউনি রয়েছে। ফান্ডিং চুক্তির শেষ মুহূর্তের পরিবর্তনের কারণে মূলত একটি প্রস্তাবিত স্লাইডিং বা রিট্র্যাক্টেবল ছাদের পরিকল্পনা বাদ দেওয়া হয়েছিল।
নিউ ইয়র্ক সিটি থেকে হাডসন নদীর ওপারে নিউ জার্সির জলাভূমি অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় স্বাভাবিক সময়েও এই স্টেডিয়ামে আসা-যাওয়া করা কিছুটা ঝামেলার। নিউ ইয়র্ক সিটির সাথে এই স্টেডিয়ামের ছোট স্টেশনটির কোনো সরাসরি রেল যোগাযোগ নেই এবং বড় ম্যাচগুলোর পর গাড়ির জটলা প্রায়ই চরম গ্রিডলকে (স্থবিরতা) রূপ নেয়। তবে কিছুটা ইতিবাচক দিক হলো, ‘আমেরিকান ড্রিম’ মলটি একটি পথচারী সেতুর মাধ্যমে মেটলাইফের সাথে যুক্ত, যেখানে প্রচুর খাওয়ার জায়গার পাশাপাশি একটি ওয়াটার পার্ক এবং ইনডোর স্কিইং সুবিধা রয়েছে।
ফুটবলে স্মরণীয় ম্যাচ: এই স্টেডিয়ামটি দুটি উল্লেখযোগ্য ফাইনালের সাক্ষী। প্রথমটি ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকা সেন্টেনারিও ফাইনাল, যেখানে টাইব্রেকারে চিলির কাছে হেরে যাওয়ার পর এক হতাশ ও বিপর্যস্ত লিওনেল মেসি টানেলের ভেতরেই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন। যদিও সেই অবসর স্থায়ী হয়নি। অন্য উল্লেখযোগ্য ফাইনালটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল গত বছর, যেখানে ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপস্থিতিতে চেলসি ক্লাব বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছিল।

স্টেডিয়াম: মায়ামি স্টেডিয়াম
সাধারণ নাম: হার্ড রক স্টেডিয়াম
অবস্থান: মায়ামি গার্ডেনস, ফ্লোরিডা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
উদ্বোধন: ১৯৮৭
টুর্নামেন্ট ধারণক্ষমতা: ৬৫,০০০
বিশ্বকাপ ২০২৬-এর ম্যাচগুলো:
সৌদি আরব বনাম উরুগুয়ে, ১৫ জুন
উরুগুয়ে বনাম কেপ ভার্দে, ২১ জুন
স্কটল্যান্ড বনাম ব্রাজিল, ২৪ জুন
কলম্বিয়া বনাম পর্তুগাল, ২৭ জুন
রাউন্ড অব ৩২, ৩ জুলাই (জে১ বনাম এইচ২)
কোয়ার্টার-ফাইনাল, ১১ জুলাই (জয়ী ৯১ বনাম জয়ী ৯২)
তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ, ১৮ জুলাই (রানার্সআপ ১০১ বনাম রানার্সআপ ১০২)
যুক্তরাষ্ট্রের সমস্ত স্টেডিয়ামগুলোর মধ্যে এই স্টেডিয়ামটির মতো চেহারা বদল আর কোনোটিরই হয়নি। এনএফএল এর দল ‘মায়ামি ডলফিন্স’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও মালিকের নামানুসারে শুরুতে এর নাম রাখা হয়েছিল ‘জো রবি স্টেডিয়াম’। প্রথমদিকে এটি সম্পূর্ণ খোলা (ছাদবিহীন) ছিল এবং সময়ের সাথে সাথে আমেরিকান ফুটবলের পাশাপাশি বেসবল আয়োজনের উপযোগী করে একে সংস্কার করা হয়। বেসবল দলটি চলে যাওয়ার পর এখানে একটি বড় ধরনের সংস্কার কাজ করা হয়, যার মধ্যে বেশিরভাগ সিটের ওপর একটি ছাউনি বা ক্যানোপি যোগ করা অন্যতম। এর ফলে স্টেডিয়ামটি আরও ঐতিহ্যবাহী রূপ পায়।
এই ছাউনিটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল, কারণ দক্ষিণ ফ্লোরিডার তীব্র গরম এখানকার বহু ম্যাচে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াত। ইতিহাসে বিভিন্ন বড় বড় ইভেন্ট আয়োজন করা ছাড়াও এই ভেন্যুটি তার ঘন ঘন নাম পরিবর্তনের জন্য পরিচিত। ‘মায়ামি স্টেডিয়াম’ হবে এর নবম নাম; এর আগের নামগুলো ছিল—জো রবি স্টেডিয়াম, প্রো প্লেয়ার পার্ক, প্রো প্লেয়ার স্টেডিয়াম, ডলফিন্স স্টেডিয়াম, ডলফিন স্টেডিয়াম, ল্যান্ড শার্ক স্টেডিয়াম, সান লাইফ স্টেডিয়াম, নিউ মায়ামি স্টেডিয়াম এবং এর বর্তমান নাম হার্ড রক স্টেডিয়াম, টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার পর আবার এই নামেই ফিরে যাবে।
ফুটবলে স্মরণীয় ম্যাচ: মায়ামি ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা ফাইনাল আয়োজন করেছিল, যেখানে আর্জেন্টিনা ১-০ গোলে কলম্বিয়াকে হারায়। তবে ম্যাচটি মাঠের বাইরের বিশৃঙ্খলার জন্যই বেশি স্মরণীয় হয়ে আছে। টিকিট ছাড়াই প্রায় ৭,০০০ দর্শক জোরপূর্বক ভেতরে ঢুকে পড়ায় খেলা শুরু হতে এক ঘণ্টারও বেশি দেরি হয়েছিল। কলম্বিয়ান ফেডারেশনের সভাপতি বেশ কয়েকটি মারামারিতে জড়িয়ে গ্রেপ্তার হন এবং ভেন্যুটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। তবে ভালো দিক ছিল যে, শাকিরা এর হাফ-টাইম শো-তে পারফর্ম করেছিলেন। তিনি ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালের হাফ-টাইম শো-তেও সহ-প্রধান পারফর্মার হিসেবে থাকছেন।

স্টেডিয়াম: ফিলাডেলফিয়া স্টেডিয়াম
সাধারণ নাম: লিঙ্কন ফাইন্যান্সিয়াল ফিল্ড
অবস্থান: ফিলাডেলফিয়া, পেনসিলভানিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
উদ্বোধন: ২০০৩
টুর্নামেন্ট ধারণক্ষমতা: ৬৯,০০০
বিশ্বকাপ ২০২৬-এর ম্যাচগুলো:
আইভরি কোস্ট বনাম ইকুয়েডর, ১৪ জুন
ব্রাজিল বনাম হাইতি, ১৯ জুন
ফ্রান্স বনাম ইরাক, ২২ জুন
কুরাসাও বনাম আইভরি কোস্ট, ২৫ জুন
ক্রোয়েশিয়া বনাম ঘানা, ২৭ জুন
রাউন্ড অব ১৬, ৪ জুলাই (বিজয়ী ৭৪ বনাম বিজয়ী ৭৭)
সেই যুগের আর দশটা স্টেডিয়ামের মতোই ফিলাডেলফিয়ার এই ভেন্যুটি উন্মুক্ত ইস্পাত এবং অসম বসার গ্যালারির এক বিশাল কাঠামো। এর একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো স্টেডিয়ামের উত্তর প্রান্তে অবস্থিত একটি স্টিল টাওয়ার, যার ওপর 'ইগলস নেস্ট' নামের একটি ছোট বৃত্তাকার বসার জায়গা রয়েছে। এক সময় এর পাশের গ্যালারির ওপর এক সারি উইন্ড টারবাইন মানে বায়ুকল শোভা পেত, তবে ২০১৯ সালে সেগুলো সরিয়ে ফেলা হয় এবং আর কখনো লাগানো হয়নি।
ইন্টারস্টেট-৯৫ হাইওয়ের ঠিক পাশেই এবং শহরের বেসবল স্টেডিয়াম ও বাস্কেটবল/হকি অ্যারেনার সংলগ্ন পার্কিং লটের বিশাল চত্বরে এটি অবস্থিত। স্টেডিয়ামটি শহরের কেন্দ্রস্থলে না হলেও সেপ্টা ট্রেনের মাধ্যমে এখানে খুব সহজেই যাতায়াত করা যায়। বিশ্বকাপের ম্যাচগুলোর সময় এই ট্রেনগুলো অতিরিক্ত ট্রিপ দেবে এবং এর সাধারণ ভাড়া ২.৯০ ডলার হলেও খেলা শেষে ফেরার ট্রিপের জন্য কোনো ভাড়া লাগবে না।
ফুটবলে স্মরণীয় ম্যাচ: এই স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত প্রথম ক্রীড়া ইভেন্টটি ছিল ২০০৩ সালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এবং বার্সেলোনার মধ্যকার একটি প্রীতি ম্যাচ। রোনালদিনহোর অ্যাসিস্ট থেকে প্যাট্রিক ক্লুইভার্ট গোল করে এই স্টেডিয়ামের ইতিহাসের প্রথম গোলদাতা হন, যদিও পরে ইউনাইটেড ঘুরে দাঁড়িয়ে ৩-১ ব্যবধানে ম্যাচটি জিতে নেয়। সেদিনের ৬৮,৩৯৬ জন দর্শকের উপস্থিতি ফিলাডেলফিয়ার ফুটবল ম্যাচের ইতিহাসে টানা ২১ বছর ধরে রেকর্ড ছিল, যা পরবর্তীতে ২০২৪ সালে লিভারপুল বনাম আর্সেনালের প্রীতি ম্যাচে ৬৯,৮৭৯ জন দর্শকের উপস্থিতির মাধ্যমে ভেঙে যায়।
এফএইচএম

