World Cup Football Field

বিজ্ঞাপন

‘জিততেই হবে’—মিশন ব্রাজিলের

‘জিততেই হবে’—মিশন ব্রাজিলের

ব্রাজিল দলের বর্তমান স্কোয়াডের দুজন খেলোয়াড়ের জন্মই হয়নি, যখন ২০০২ সালে দেশটি তাদের সর্বশেষ ও পঞ্চম ফিফা বিশ্বকাপ জিতেছিল। ব্রাজিলের প্রাপ্তবয়স্কদের একটি পুরো প্রজন্ম বড় হয়ে গেছে দেশের হাতে ট্রফি দেখা ছাড়াই। তাদের কাছে মনে হচ্ছে যেন তাদের একটি জন্মগত অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

সর্বশেষ সেই বিজয়ের পর থেকে দীর্ঘ ২৪ বছর কেটে গেছে। কাকতালীয়ভাবে ১৯৭০ সালের তৃতীয় জয় ও ১৯৯৪ সালের চতুর্থ জয়ের মধ্যবর্তী সময়টাও ঠিক এতটাই ছিল। তবে এবারের শূন্যতা যেন আরও বেশি গুরুতর।

ব্রাজিলে ফুটবল কখনোই শুধু মাঠে কী করছেন তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আসল বিষয় হলো আপনি কীভাবে খেলছেন। আর ব্রাজিলের সেই পুরোনো জাদু জেতার চেয়েও বেশি কিছু ছিল। তা ছিল স্টাইল, দাপট ও জীবনের সম্ভাব্য সব সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলার এক আনন্দময় প্রদর্শনী।

তারা এতটাই চমৎকার ও নান্দনিক ফুটবল খেলত যে, যারা সেই দলটিকে দেখার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন, তারা কখনোই তা ভুলতে পারবেন না। তাই কখনও কখনও হেরেও ব্রাজিলিয়ানরা হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরত ঠিকই, কিন্তু তাদের গ্ল্যামার ও আন্তর্জাতিক মর্যাদা থাকত অক্ষুণ্ন।

তবে এখন আর সেই পরিস্থিতি নেই। ব্রাজিল অবশ্যই এখনও বিশ্ব ফুটবলের পরাশক্তি এবং একমাত্র দল হিসেবে তারা পাঁচবার বিশ্বকাপ জিতেছে। কিন্তু মাঠের নান্দনিকতার ওপর এখন আর তাদের একচেটিয়া অধিকার নেই। মানুষ এখন আর আগের মতো তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে না। তাদের আর ‘সুন্দর ফুটবলের’ আধ্যাত্মিক অভিভাবক হিসেবে আর ভাবা হয় না।

এর মানে হলো, এই গ্রীষ্মে বাজি অনেক বড়। ২০২৬ বিশ্বকাপের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। দেশে সবচেয়ে বড় ও একমাত্র লক্ষ্য হলো টুর্নামেন্ট জেতা।

তবে বর্তমান দলটির কাছ থেকে ১৯৭০ বা ১৯৮২ সালের মতো ফুটবল আশা করাটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। বেশ কিছু সময় ধরেই ব্রাজিল এমন কোনো অসাধারণ সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার তৈরি করতে পারেনি যারা ওই ধরনের ফুটবল উপহার দিতে পারেন। তবে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পজিশনে তারা বেশ শক্তিশালী এবং তাদের আক্রমণে রয়েছে এক ঝাঁক দুর্দান্ত প্রতিভা।

ষষ্ঠবারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের লড়াইয়ে আসার পথটি বেশ দীর্ঘ ও বন্ধুর ছিল। তবে দলটির দায়িত্বে আছেন অভিজ্ঞ ইতালীয় কোচ কার্লো আনচেলত্তি, যিনি এক পথপ্রদর্শক ও অভিজ্ঞ চালক। তিনি ভালো করেই জানেন লক্ষ্যটা কী, আর সে কারণেই তিনি ২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত চুক্তিতে রাজি হয়েছেন। তার জন্য সাফল্য মানেই টুর্নামেন্ট জেতা। আর ব্যর্থতা? তিনি ভালো করেই জানেন, চ্যাম্পিয়ন হওয়া ছাড়া অন্য যেকোনো কিছু মানেই ব্যর্থতা।

কিন্তু ১৯ জুলাই ব্রাজিল যদি শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে তারা অত্যন্ত ভিন্নধর্মী ও অপ্রচলিত পথ পাড়ি দিয়ে মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় চড়ার মতো কৃতিত্ব দেখাবে। নিজের স্বভাবসুলভ ভ্রু কুঁচকে আনচেলত্তি একটি বিশৃঙ্খল প্রস্তুতি পর্বের মধ্যেও শান্ত ভাব বজায় রাখছেন, যার কিছু অবশ্য তার নিজেরই তৈরি।

তবে এর বেশিরভাগই তার আসার আগের। ব্রাজিল প্রায় দুই বছর সময় নষ্ট করেছে—অধিকাংশ বাছাইপর্বের ম্যাচ এবং একটি কোপা আমেরিকা খেলেছে দুজন স্থানীয় কোচের অধীনে, যাদের দেখে মনে হয়েছে তারা এই পদের জন্য একেবারেই উপযুক্ত ছিলেন না। এরপর আনচেলত্তি দায়িত্ব নেন যখন হাতে মাত্র এক বছর সময় ছিল এবং একজন জাতীয় দলের কোচের জন্য যা সাধারণ বিষয়—কাজের জন্য সময় ছিল খুবই কম। অবশ্য নিজের স্বভাবসুলভ শিথিল ভঙ্গিতে এই ইতালিয়ান কোচ খুব একটা অভিযোগ করেন না।

ইনজুরির কারণে তার পরিকল্পনা আরও বড় ধাক্কা খেয়েছে। স্কোয়াড ঘোষণার আগেই তিনি এমন তিনজন খেলোয়াড়কে হারিয়েছেন যারা নিশ্চিতভাবেই শুরুর একাদশে থাকতেন—আক্রমণভাগের রদ্রিগো ও এস্তেভাও এবং রক্ষণভাগের এদের মিলিতাও, যিনি প্রায় নিশ্চিতভাবেই রাইট-ব্যাক হিসেবে খেলতেন।

কিন্তু সমস্যা এখানেই শেষ নয়। প্রথম সমস্যাটি দেখা দেয় রিও ডি জেনিরোর মারাকানা স্টেডিয়ামে পানামার বিপক্ষে বিদায়ী প্রস্তুতি ম্যাচে। ৬-২ গোলের জয়টি দেখতে ভালো লাগলেও এর ভেতরে একটি বড় সমস্যা লুকিয়ে ছিল।

প্রথমার্ধে মূল দল ও তাদের কৌশলগত ফরমেশন খুবই বাজে খেলেছিল। বিরতির পর যখন ১০টি পরিবর্তন করা হয়, তখন দল অনেক ভালো খেলে। সমস্যাটা কোথায়? ব্রাজিলের জন্য আনচেলত্তির পছন্দের ফরমেশন ছিল চারজন ফরোয়ার্ড নিয়ে, যাতে ব্রাজিলের উইঙ্গারদের ব্যবহার করা যায় এবং ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে সামনে মুক্তভাবে খেলার সুযোগ দেওয়া যায়। কিন্তু এর ফলে মিডফিল্ডের মাঝখানে মাত্র দুজন খেলোয়াড় থাকেন, যাদের একজন ৩৪ বছর বয়সী কাসেমিরো।

এই জোনে ব্রাজিলকে বেশ দুর্বল দেখিয়েছে, যেখানে পানামা বল বেশি দখলে রেখেছিল এবং কাসেমিরো ও ব্রুনো গিমায়ারেসের মাঝখান দিয়ে অনায়াসে আক্রমণ সাজাচ্ছিল। দ্বিতীয় অর্ধে ব্রাজিল যখন মিডফিল্ডে তিনজন খেলোয়াড় নিয়ে খেলতে শুরু করে, তখন খেলায় বিশাল উন্নতি দেখা যায়।

আনচেলত্তি স্বীকার করেছেন যে, এই ম্যাচের ফলাফল বিশ্বকাপের ফরমেশন নিয়ে তার মনে সংশয় তৈরি করেছে। আর এই সংশয়ের পাশাপাশি একটি উদ্বেগও যোগ হয়েছে। তার ২৬ জনের স্কোয়াডে মিডফিল্ডার ছিল মাত্র পাঁচজন এবং নিশ্চিতভাবেই তার আরও বেশি মিডফিল্ডারের প্রয়োজন ছিল।

এরপর মিশরের বিপক্ষে ক্লিভল্যান্ডের দ্বিতীয় ও শেষ প্রস্তুতি ম্যাচে ২-১ ব্যবধানে জয়, ব্রাজিল তাদের আক্রমণাত্মক রাইট-ব্যাক ওয়েসলিকে হারায় পেশির ইনজুরিতে। আনচেলত্তি এই পরিস্থিতিটি কাজে লাগিয়ে তার মিডফিল্ডকে শক্তিশালী করেন এবং ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে যোগ দিতে যাওয়া এডারসনকে দলে ডাকেন। তবে এর ফলে দলে কোনো প্রথাগত আক্রমণাত্মক রাইট-ব্যাক থাকল না।

তার পরিবর্তিত দলে ওয়েসলির কাছ থেকে ডান প্রান্তে গতি আশা করা হচ্ছিল। এখন আনচেলত্তিকে রাইট-ব্যাক পজিশনের জন্য দানিলো অথবা ইবানেজের মধ্যে যেকোনো একজনকে বেছে নিতে হবে। মনে হচ্ছে ব্রাজিল যেন একটি সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে আরেকটি নতুন সমস্যা তৈরি করছে।

দলটির একটি শক্তিশালী মেরুদণ্ড রয়েছে—গোলপোস্টে অ্যালিসন, উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনাল খেলা জুটি মার্কিনহোস ও গ্যাব্রিয়েল মাগালায়েস সেন্ট্রাল ডিফেন্সে, মাঝে কাসেমিরো ও গিমায়ারেস এবং সামনে ম্যাচ জেতানোর মতো প্রতিভা ভিনিসিয়ুস ও রাফিনহা। কিন্তু এর বাইরে দলটিতে রয়েছে প্রচুর অনিশ্চয়তা।

আনচেলত্তি জানিয়েছেন যে, মরক্কোর বিপক্ষে শনিবারের উদ্বোধনী ম্যাচের শুরুর একাদশ নিয়ে তার মনে স্পষ্ট ধারণা আছে। কিন্তু স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো সংশয়ে ভুগছে। ফুলব্যাক কারা হবেন? ওয়েসলি না থাকায় ডান প্রান্তে কী হবে? লুকাস পাকেতা কি মিডফিল্ডের তৃতীয় ব্যক্তি হবেন?

সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসেবে কি ম্যাথিউস কুনহা খেলবেন, যার গুণ হলো তিনি নিচে নেমে ভিনিসিয়ুসকে মুক্ত করার জন্য লেফট উইং কভার করতে পারেন? নাকি ইগর থিয়াগো খেলবেন, যিনি দলকে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যবিন্দু দেবেন? আর এন্দ্রিকের কী হবে? কয়েক মাস আগেও যিনি স্কোয়াডের বাইরে ছিলেন, তিনি এখন একাদশে জায়গার জন্য জোর দাবি তুলছেন। মিসরের বিপক্ষে তার জয়সূচক গোলটি ছিল আনচেলত্তির এক বছরের মেয়াদে কোনো প্রথাগত সেন্ট্রাল স্ট্রাইকারের করা প্রথম গোল।

কোচ অবশ্য এসব প্রশ্নে একেবারেই অবিচলিত। বিশ্বকাপের শুরুতেই ঝড় তোলার চেয়ে টুর্নামেন্টের শেষটা দারুণভাবে করার দিকেই তার মনোযোগ অনেক বেশি। আর এখানেই নেইমারকে নিয়ে কথা বলতে হবে।

স্কোয়াড ঘোষণার মুহূর্ত পর্যন্ত আনচেলত্তি সবাইকে এক প্রকার ধোঁয়াশায় রেখেছিলেন, তবে মনে হচ্ছে শুরু থেকেই নেইমারকে দলে রাখার পরিকল্পনা তার ছিল। আনচেলত্তি এখনও একজন খেলোয়াড় হিসেবে নিজের অতীত অভিজ্ঞতা থেকে চিন্তা করেন—একজন নিরেট মিডফিল্ডার যিনি নিজের কাজ ভাবতেন প্রতিভাদের সমর্থন দেওয়া। তারকাদের প্রতি আনচেলত্তির এক ধরনের গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে—যা তার এত এত তারকাদের সাথে সফলভাবে কাজ করার অন্যতম কারণ। আর নেইমারের মধ্যে তিনি একটি বিশেষ সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছেন।

একদিকে, এই ৩৪ বছর বয়সীকে দলে নেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই—যিনি এখনও ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে দামি চুক্তি। সান্তোসের হয়ে এই বছর তার পারফরম্যান্স মোটেও আহামরি ছিল না। ২০২৩ সালের অক্টোবরে হাঁটুতে মারাত্মক ইনজুরির পর তার ফর্মের আর কতটুকু অবশিষ্ট আছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

স্কোয়াড ঘোষণার সময় আনচেলত্তি আশাবাদী ছিলেন যে নেইমার আগামী কয়েক সপ্তাহে তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি করবেন। কিন্তু তা হয়নি। ডান পায়ের কাফের ইনজুরির কারণে তিনি কেবল পুনর্বাসনের মধ্য দিয়েই যাচ্ছেন। তিনি এখনও পুরোপুরি প্রস্তুত নন, অথচ আনচেলত্তি সবসময়ই জোর দিয়ে বলে এসেছেন যে তিনি কোনো ইনজুরিগ্রস্ত খেলোয়াড়কে বিশ্বকাপে নিয়ে যাবেন না।

তাহলে কোচ কেন এই বিশ্বাসের জুয়া খেলছেন? এর সম্পর্ক হয়তো ১৯৯৪ সালের আমেরিকা বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতার সাথে, যখন তিনি ইতালির কোচ আরিগোর সাচ্চির সহকারী ছিলেন। টুর্নামেন্টের শুরুর দিকে ইতালির দুর্দান্ত রক্ষণভাগের সংগঠক ফ্রাঙ্কো বারেসি হাঁটুতে চোট পান এবং একটি ছোট অস্ত্রোপচার করান। সবাই ভেবেছিল তিনি টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে গেছেন।

অথচ ফাইনাল ম্যাচে ইতালির হয়ে ব্রাজিলের মুখোমুখি হতে মাঠে নামেন বারেসি। তার কাজ ছিল টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় রোমারিওকে বোতলবন্দি করে রাখা। কাগজে-কলমে এটি অসম্ভব মনে হলেও, বাস্তবে তা-ই ঘটেছিল। বারেসি সেই দ্বৈরথে জয়ী হন এবং ইতালি ম্যাচটি ০-০ ড্র রাখতে সক্ষম হয়, যদিও পরে টাইব্রেকারে হেরে যায়।

কয়েক বছর পর, দুই কোচ সাচ্চি এবং ব্রাজিলের কার্লোস আলবার্তো পেরেইরা একটি অনুষ্ঠানে একসঙ্গে ছিলেন। তারা বারেসির সেই অবিশ্বাস্য সাফল্য নিয়ে কথা বলেন এবং একই সিদ্ধান্তে পৌঁছান—সেই বিশ্বকাপের তীব্র গরম ও এক মাস ধরে উচ্চ তাপমাত্রার মধ্যে খেলার ধকলের কারণে ক্লান্ত থাকার চেয়ে ইনজুরিতে থেকে বিশ্রাম পাওয়া ভালো ছিল।

আনচেলত্তি এখান থেকে নিজের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। হয়তো টুর্নামেন্টের শেষ দিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ভূমিকায় নেইমার তার জন্য ‘বারেসি’ হয়ে উঠতে পারেন। ক্লান্ত প্রতিপক্ষের বিপক্ষে নেইমারের পূর্ণ ফিটনেসের ঘাটতি হয়তো খুব একটা প্রভাব ফেলবে না এবং তার সহজাত প্রতিভা ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে।

২৬ জনের বড় স্কোয়াড থাকায় আনচেলত্তি মনে করছেন এই ঝুঁকি নেওয়াটা সার্থক। আর এভাবেই নেইমার আরও একটি অপ্রত্যাশিত ও শেষ সুযোগ পেলেন। তার জন্য এটি প্রায় নিশ্চিতভাবেই ‘জিততেই হবে নয়তো সব শেষ’ পরিস্থিতি এবং হয়তো ২৪ বছরের খরা কাটানোর মিশনে ব্রাজিলের জন্যও পরিস্থিতি ঠিক একই।

এফএইচএম