এমন দীর্ঘদেহী ফুটবলারের হয়তো অভাব নেই। তবে তখন ৬ ফুট ২ ইঞ্চি উচ্চতার কোনো স্ট্রাইকারের বিদ্যুৎগতির পা, বলে কোমল প্রথম স্পর্শ, জিমন্যাস্টদের মতো নমনীয় ও অ্যাক্রোবেটিক দক্ষতার সঙ্গে বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ে পরিণত করেছিল মার্কো ভ্যান বাস্তেনকে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে নেদারল্যান্ডসের একমাত্র শিরোপা ১৯৮৮ ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। যদিও ইনজুরির কারণে ২৮ বছর বয়সের পর আর খেলা হয়নি বাস্তেনের।
ফুটবল যতই বিবর্তিত হোক না কেন, একটি বিষয় আজও সমান প্রাসঙ্গিক, তা হচ্ছে নির্দিষ্ট পজিশনের গণ্ডি ভেঙে যেকোনো পজিশনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার কৌশল- ‘টোটাল ফুটবল’। পূর্ণাঙ্গতার প্রতীক এই খেলার দর্শন ১৯৭০ দশকের শেষভাগ ও ১৯৮০ দশকজুড়ে ছিল বিস্ময়করভাবে কার্যকর। টোটাল ফুটবল বিশ্বকে উপহার দিয়েছে অসংখ্য কালজয়ী ম্যাচ, খেলোয়াড় তৈরির এক প্রভাবশালী মডেল, আক্রমণাত্মক ফুটবলের পুনর্জাগরণ এবং অবশ্যই ‘টোটাল ফুটবলার’।

ভ্যান বাস্তেন গোল করার অতুলনীয় ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছিলেন এবং বেড়ে ওঠেন ‘টোটাল ফুটবল’-এর আদর্শে। আয়াক্স সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন জোহান ক্রুইফের অন্যতম শিষ্য, আর এসি মিলান সমর্থকদের কাছে ‘সান মারকো’ এবং একজন পরিপূর্ণ স্ট্রাইকার। মূলত চোখের ফলকেই অসাধারণ কোনো দৃশ্যের জন্ম দেওয়াই মহান খেলোয়াড়দের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বাস্তেন তেমনই একটি অভিজ্ঞতায় দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন ১৯৮৮ ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে করা তার গোলটি আজও ফুটবলীয় উৎকর্ষতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
দুই দশকেরও বেশি সময় পরে স্কাই স্পোর্টসের ‘ফুটবলস গ্রেটেস্ট’ অনুষ্ঠানে সেই গোল সম্পর্কে ভ্যান বাস্তেন বলেন, ‘আমি যে গোলটি করেছিলাম...সেটি ছিল আর্নল্ড মুরেনের একটি লম্বা পাস। বলটি আসতে একটু সময় নিচ্ছিল। আমি শুধু চেষ্টা করেছি, পরে সেটি বিশেষভাবে জালে জড়িয়ে যায়।’ ভ্যান বাস্তেন প্রচলিত কোনো পথ বেছে নেননি। তিনি মুহূর্তটিকে যেন সময়ের মধ্যে স্থির করে দেন। তার ডান পা ছিল তুলির মতো, আর মিউনিখের অলিম্পিয়া স্ট্যাডিয়াম ছিল তার ক্যানভাস। সেদিন তিনি এঁকেছিলেন নিজের ফুটবলীয় শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম।

বাস্তেনের দেওয়া সরল ব্যাখ্যার ভেতরেও লুকিয়ে আছে গোলটির অসাধারণত্ব। মুরেনের ভারসাম্যহীন অবস্থায় দেওয়া বাঁ-পায়ের ক্রস যখন বক্সের দূর প্রান্তে ভেসে যাচ্ছিল, তখনও ভ্যান বাস্তেন ছিলেন একজন সোভিয়েত ডিফেন্ডারের কড়া নজরদারিতে। রুড গালিত ছিলেন গোলমুখে, তবে আটকে ছিলেন দুই ডিফেন্ডারের মাঝে। গোলরক্ষক রিনাত দাসায়েভও নিজের নিকটবর্তী পোস্ট রক্ষা করায় ব্যস্ত। প্রচলিত ফুটবলে একজন আক্রমণভাগের খেলোয়াড়কে শেখানো হয় এমন বলের পেছনে ছুটে গিয়ে কর্নার আদায় করতে বা বলটি আবার গোলমুখে পাঠাতে। কিন্তু বাস্তেন স্মরণীয় গোলটি করলেন অপ্রচলিত পন্থায়।
ভ্যান বাস্তেন ছিলেন ভিন্ন ধাঁচে গড়া। জাতে ডাচ, কিন্তু ইতালিয়ান কিংবদন্তি ফুটবলারদের সঙ্গেই তার তুলনা চলে। ক্যারিয়ারের শুরুটা হয় আয়াক্সে, এরপর মিলানে চলে আসেন ১৯৮৭-৮৮ মৌসুমে। খেলতেন একদম প্রথাগত ফুটবলার হিসেবে। লম্বায় ছিলেন ১৮৮ সেন্টিমিটার, একজন স্ট্রাইকার হিসেবে তার বল কন্ট্রোল আর কৌশল ছিল একেবারে ভিন্ন। এই বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে তাকে রোনালদো লিমার চেয়েও এগিয়ে রাখা হয়। ১৯৮৭ থেকে ১৯৮৯ এই তিন বছর তার কাছে ছিল স্বপ্নের মতো। মাত্র তিন বছরের মাঝে ভ্যান বাস্তেন তার অর্জনের ঝুলি প্রায় ভরে ফেলেন। ১৯৮৮ সালে ডাচ দলের হয়ে ইউরো জয়, যেখানে ভ্যান বাস্তেন নিজেই করেছিলেন ৫ গোল।
ওই টুর্নামেন্টের ফাইনালে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে তার গোলের আলোচনা ইতোমধ্যে হয়েছে। ৮৮-৮৯ মৌসুমে তিনি ক্যারিয়ারের প্রথম (ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ লিগ) চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়, ৮৭/৮৮ মৌসুমে ইতালিয়ান লিগ এবং ১৯৮৮ সালে ব্যালন ডি’অর। ক্লাব এবং দলগত দিক দিয়ে জিততে কিছু বাকি রাখেনি তিনি। ইতালিয়ান লিগে এসেছিলেন ১৯৮৭ সালে, যখন তার বয়স মাত্র ২২ বছর ১০ মাস। ২৫ বছর বয়সের মধ্যেই ভ্যান বাস্তেনের দেশ ও ক্লাবের হয়ে বড় শিরোপাগুলো জেতা হয়ে গিয়েছিল।
অর্জনের পাল্লা ভারী করে তোলার পাশাপাশি ইনজুরির সঙ্গে যুদ্ধটাও তার সমান তালে চলছিল। মিলানে রোজান্নেরিদের হয়ে আট মৌসুম খেললেও শেষ দুই মৌসুম কেটেছে মাঠের বাইরেই। তবুও তার অর্জনের খাতায় ৪টি করে স্কুদেত্তো ও সুপারকোপা ইতালিয়া, ৩টি ইউরোপিয়ান কাপ, দুটি করে উয়েফা সুপার কাপ এবং ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ। ২৮ বছর বয়সে যখন ক্যারিয়ারের ইতি টানতে হয় তখন তার ব্যক্তিগত অর্জনের পাশে তিনটি ব্যালন ডি’অর, একবার ফুটবলার অব দ্য ইয়ারের পুরস্কার, একটি ইউরো, দুটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ৯ বার বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় টপ স্কোরার হওয়ার পাশাপাশি আয়াক্স এবং মিলানের হয়ে মোট ৩৫২ গোল।

ফুটবলের এসব পরিসংখ্যান দেখে হয়তো বাস্তেনের প্রাপ্তির খাতাটাকে ঠিকঠাক মনে হবে। তবে তার ক্যারিয়ারটা আরও লম্বা হলে কী হতে পারত– আক্ষেপের সেই সুর আর আলোচনাও শোনা যায়। অবশ্য অনেক পাওয়ার মাঝেও কিছু আক্ষেপ থেকেই যায়। ১৯৯০ বিশ্বকাপে যেমন তিনি কোনো গোলই করতে পারেননি। দুই বছর পর ইউরোতে ডেনমার্কের সঙ্গে তার পেনাল্টি মিসের জন্য সেমিফাইনাল থেকে বাদ পড়ে নেদারল্যান্ডস। নিয়মিত কড়া ট্যাকল এবং অতিরিক্ত খেলার চাপ বাস্তেনের গোড়ালিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। কারও মতে অল্প বয়সে অতিরিক্ত খেলায় এই পরিণতি, আবার অনেকে একে দুর্ভাগ্য বলে মনে করেন।
অস্ত্রোপচারের পর অস্ত্রোপচার ভ্যান বাস্তেনের ফুটবল ক্যারিয়ারে অকাল সমাপ্তি নিয়ে আসে। ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে ফিফাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই ডাচ কিংবদন্তি বলেন, ‘আমি নিজেকে কোনো ভুক্তভোগী মনে করি না। আমি এমন একটি উদাহরণ, যার অসাধারণ ক্যারিয়ারও একদিন শেষ হয়ে যেতে পারে। আমার সবচেয়ে বড় হতাশা গোড়ালিতে আঘাত পাওয়া নয়, বরং কিছু চিকিৎসকের আচরণ। কারণ যে ব্যক্তি আমার গোড়ালির সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে, সে কোনো খেলোয়াড় নয়, একজন সার্জন।’
মার্কো ভ্যান বাস্তেন নেদারল্যান্ডস জাতীয় দলের হয়ে ৫৮টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে ২৪টি গোল করেছেন এবং রয়েছে ১৫টি অ্যাসিস্টও। সর্বকালের অন্যতম সেরা এই স্ট্রাইকার মাঠে তার দূরদর্শিতা ও নিখুঁত পাসিংয়ের মাধ্যমে আক্রমণভাগে আলাদা মাত্রা যোগ করতেন।
এএইচএস

