ইতিহাস বলছে, বিশ্বকাপের প্রথম দুই ম্যাচে জয়হীন থাকার অভিজ্ঞতা ব্রাজিলের খুবই বিরল। ১৯৭৮ সালের পর কোনো বিশ্বকাপে প্রথম দুই ম্যাচে জয়হীন থাকেনি তারা। ফলে হাইতির বিপক্ষে ম্যাচটি ব্রাজিলের জন্য শুধু তিন পয়েন্টের নয়, আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধারেরও।
পরিসংখ্যান, র্যাংকিং কিংবা অতীত ইতিহাস অনেক সময় ম্যাচের আগে মাঠের লড়াইয়ের একটি ধারণা দেয়, কিন্তু মাঠের ৯০ মিনিট সেই চিত্র বা ধারণা মুহূর্তেই বদলে দিতে পারে। আর বিশ্বকাপের সৌন্দর্যই হলো এর অনিশ্চয়তা।ব্রাজিল ও হাইতির মধ্যকার ম্যাচের আগে পরিসংখ্যান বলছে—এটি ব্রাজিলের ম্যাচ, হারানোর কিছু নেই হাইতির।
ফিলাডেলফিয়া স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই ম্যাচে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের সামনে সুযোগ রয়েছে বিশ্বকাপ অভিযানে প্রথম জয় তুলে নেওয়ার। অন্যদিকে হাইতির সামনে বাঁচা-মরার লড়াই। গ্রুপ পর্বে টিকে থাকার আশা জিইয়ে রাখতে হলে তাদের প্রয়োজন এমন এক ফল, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটন হিসেবে বিবেচিত হবে।
প্রত্যাশার ভারে ব্রাজিল
বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে মরক্কোর বিপক্ষে ১-১ ড্র করে কিছুটা হতাশই করেছে কার্লো আনচেলত্তির দল। ম্যাচের ২১ মিনিটে পিছিয়ে পড়ার পর ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের দুর্দান্ত গোলে সমতায় ফেরে সেলেসাওরা। তবে পুরো ম্যাচে ব্রাজিলকে স্বাভাবিক ছন্দে দেখা যায়নি।
আরও উদ্বেগের বিষয়, মরক্কোর বিপক্ষে ব্রাজিল নিজেরা যত শট নিয়েছে, তার চেয়ে বেশি শট নিতে দিয়েছে প্রতিপক্ষকে। ২০০৬ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের পর এই প্রথম কোনো বিশ্বকাপ ম্যাচে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় তারা। প্রায় দুই দশকের এক ধারাবাহিকতা ভেঙে গেছে সেই ম্যাচে। তবুও ব্রাজিলকে নিয়ে আশাবাদী হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
ভিনিসিয়ুস—ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় ভরসা
ব্রাজিলের আক্রমণভাগে এখন সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। রিয়াল মাদ্রিদের এই তারকা গত দুই বিশ্বকাপে নিজের খেলা পাঁচ ম্যাচে সরাসরি চারটি গোলে অবদান রেখেছেন—দুটি গোল ও দুটি অ্যাসিস্ট।
গড় হিসেবে প্রতি ৯৮ মিনিটে একটি করে গোল বা অ্যাসিস্ট করছেন তিনি। সাম্প্রতিক বিশ্বকাপ ইতিহাসে ব্রাজিলের আর কোনো খেলোয়াড় এত কার্যকর ছিলেন না। হাইতির বিপক্ষে ম্যাচেও ব্রাজিলের আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার কথা এই উইঙ্গারের।
৫৪ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা হাইতি
হাইতির গল্পটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ১৯৭৪ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছে ক্যারিবিয়ান দেশটি। দীর্ঘ ৫৪ বছরের অপেক্ষার পর ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে ফেরার আনন্দ থাকলেও বাস্তবতা তাদের জন্য কঠিন। প্রথম ম্যাচে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ১-০ ব্যবধানে হার তাদের নকআউট পর্বের সম্ভাবনাকে অনেকটাই কঠিন করে তুলেছে। এখন ব্রাজিলের মতো দলের বিপক্ষে পয়েন্ট হারালে বিদায়ের দ্বারপ্রান্তে চলে যাবে তারা।
তবে পরাজয়ের মাঝেও আশার কিছু খুঁজে পেয়েছে হাইতি। গ্রুপ ‘সি’-এর প্রথম রাউন্ডে সবচেয়ে বেশি শট নেওয়া দল ছিল তারাই—১৫টি। প্রতিপক্ষের বক্সে বল স্পর্শের সংখ্যাতেও তারা ছিল শীর্ষে। যদিও ব্রাজিলের বিপক্ষে সেই পরিসংখ্যান ধরে রাখা হবে বিশাল এক চ্যালেঞ্জ।
স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে হাইতি পরাজিত দল হলেও ম্যাচে সবচেয়ে উজ্জ্বল ছিলেন হ্যানেস ডেলক্রোয়া। পুরো ম্যাচে তিনি ৬৬টি পাস সম্পন্ন করেছেন, একটিও ভুল পাস দেননি। শুধু তাই নয়, বল পুনরুদ্ধার ও ক্লিয়ারেন্সের ক্ষেত্রেও ছিলেন দলের সেরা। বিশ্বকাপ ইতিহাসে কোনো হাইতিয়ান ফুটবলারের সর্বোচ্চ সফল পাসের রেকর্ডও গড়েছেন তিনি। ব্রাজিলের মতো আক্রমণাত্মক দলের বিপক্ষে আবারও তার কাঁধেই থাকবে রক্ষণ সামলানোর বড় দায়িত্ব।
দুই দলের মুখোমুখি লড়াই
ব্রাজিল ও হাইতি বিশ্বকাপে এবারই প্রথম মুখোমুখি হচ্ছে। তবে এর আগে তিনবার দেখা হয়েছে দুই দলের, এবং তিনবারই জিতেছে ব্রাজিল।
সেই ম্যাচগুলোতে ব্রাজিল করেছে ১৭ গোল, হাইতি পেয়েছে মাত্র একটি। সবচেয়ে স্মরণীয় সাক্ষাৎ ২০১৬ কোপা আমেরিকায়, যেখানে ব্রাজিল ৭-১ গোলের বিশাল জয় পেয়েছিল। সেই ম্যাচে বর্তমান স্কোয়াডের আলিসন বেকার ও মারকিনিয়োস খেলেছিলেন, আর ফিলিপে কৌতিনিয়ো করেছিলেন হ্যাটট্রিক।
ফিফা র্যাঙ্কিংয়েও দুই দলের ব্যবধান বিশাল। ব্রাজিল রয়েছে ষষ্ঠ স্থানে, আর হাইতি ৮৪তম। অর্থাৎ দুই দলের মধ্যে ব্যবধান ৭৮ ধাপ।
সুপারকম্পিউটার কী বলছে?
অপ্টার সুপারকম্পিউটারের হিসাব অনুযায়ী, ব্রাজিলের জয়ের সম্ভাবনা ৮৭.৩ শতাংশ। ড্র হওয়ার সম্ভাবনা ৮.৪ শতাংশ, আর হাইতির জয়ের সম্ভাবনা মাত্র ৪.৩ শতাংশ। এমনকি পুরো গ্রুপের শীর্ষে থাকার সম্ভাবনাও ব্রাজিলের ৫২ শতাংশ। শেষ ৩২-এ ওঠার সম্ভাবনা ৯০.৩ শতাংশ। অন্যদিকে হাইতির নকআউট পর্বে যাওয়ার সম্ভাবনা মাত্র ৫.৮ শতাংশ।
পরিসংখ্যান, ইতিহাস, অভিজ্ঞতা এবং স্কোয়াডের গভীরতা—সবকিছুই ব্রাজিলের পক্ষে। কাগজে-কলমে এটি একপেশে লড়াই বলেই মনে হচ্ছে। কিন্তু বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় গল্পগুলো লেখা হয়েছে তখনই, যখন সংখ্যাগুলো ভুল প্রমাণিত হয়েছে। হাইতির সামনে সেই অসম্ভবকে সম্ভব করার চ্যালেঞ্জ। আর ব্রাজিলের সামনে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দেওয়ার সুযোগ।
এইচজেএস

