হাইতির দুর্বলতা ভালোভাবেই জানা ছিল, যারা বিশ্বকাপে ফিরেছে ৫২ বছর পর। তবুও তাদের সমীহ না করাটা বোকামিই। ব্রাজিলও তেমন কিছু করেনি। কার্লো আনচেলত্তির দল দলগত ও ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স দিয়ে সুযোগ লুফে নিয়েছে। আদায় করেছে পুরো তিন পয়েন্ট।
মরক্কোর সঙ্গে প্রথম ম্যাচ ড্র করেছিল ব্রাজিল। ওই ম্যাচে সেলেসাওদের ফুটবলের চিরাচরিত সৌন্দর্যের ছিটেফোঁটা ছিল না। মাঝমাঠের বড় ফাঁক ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে প্রথমার্ধে তাদের খেলা ছিল ছন্নছাড়া। বিরতির পর কিছু পরিবর্তনে বদলে যায় ম্যাচের চেহারা। ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের চোখ ধাঁধানো গোলে পয়েন্ট ভাগাভাগি করে। আফ্রিকানদের বিপক্ষে ১-১ গোলের ড্র করার পর নকআউটের দরজা খোলা রাখতে হাইতির বিপক্ষে জয়ের বিকল্প ছিল না তাদের সামনে। কৌশলগত দিক থেকে নিচের দিকে থাকা প্রতিপক্ষের বিপক্ষে বেশ গোছালো পারফরম্যান্স করতে দেখা গেল সেলেসাওদের। ৩-০ ব্যবধানের জয়ে তিন গোলেই অবদান ছিল ভিনিসিয়ুসের। তার সঙ্গে ম্যাথিউস কুনহা দুই গোল করে নজর কেড়েছেন।
ম্যাচের নেতিবাচক দিক ছিল রাফিনিয়ার ইনজুরি। প্রথমার্ধে ডান হ্যামস্ট্রিংয়ের ব্যথা নিয়ে মাঠ ছাড়েন তিনি। দিন শেষে ফলাফল ব্রাজিলের পক্ষেই কথা বলছে। দুই ম্যাচে চার পয়েন্ট নিয়ে ‘সি’ গ্রুপের শীর্ষেও উঠে গেছে তারা। অপেক্ষাকৃত দুর্বল দল স্কটল্যান্ডের সঙ্গে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচ, জিতলে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েই খেলবে নকআউট। কিন্তু হাইতির বিপক্ষে দলগত পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে। বিশেষ করে প্রথমার্ধের দুর্দান্ত ব্রাজিলকে দ্বিতীয়ার্ধে দেখা যায়নি। বরং এই সময়ে হাইতির আক্রমণ ছিল সেলেসাওদের জন্য বিপদজনক হয়ে উঠেছিল।

সপ্তাহজুড়ে দল নিয়ে যাচাই বাছাই শেষে কার্লো আনচেলত্তি হাইতির বিপক্ষে শুরুর একাদশে দুটি পরিবর্তন আনেন। ইবানেজের জায়গায় দানিলো এবং ইগোর থিয়াগোর বদলে কুনহাকে। হাইতিয়ানরা আক্রমণের চেষ্টা করায় ডিফেন্সে বেশ ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়, আর সেই সুযোগে প্রথমার্ধে ভালো প্রতিক্রিয়া দেখায় ব্রাজিল।
ব্রাজিলের কৌশল ছিল একদম পরিষ্কার। বল যখন নিয়ন্ত্রণে ছিল না, তাদের ফরমেশন ছিল ৪-৪-২; রাফিনিয়া ডানে, পাকেতা বাঁয়ে এবং ভিনি ও কুনহা স্বাধীনভাবে খেলার সুযোগ পেয়ে কখনও কখনও মাঝমাঠও চষে বেড়ালেন। আর যখন বল নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে, তখন পাঁচজনের রক্ষণভাগ নিয়ে গঠিত হাইতিয়ান ডিফেন্সের পেছনে ফাঁকা জায়গা খুঁজে নেওয়া ছিল মূল উদ্দেশ্য। এভাবেই আনচেলত্তির দল বিশ্বকাপে তাদের প্রথম জয়টি তুলে নেয়।
মাঝমাঠ থেকে তৈরি হওয়া বলেই আক্রমণ হয়েছে ধারালো। হুট করেই অগোছালো হয়ে পড়েছিল হাইতির ডিফেন্স। প্রথমে কুনহা বল দখলে নেন, তারপর ভিনিসিয়ুস পেয়ে যান বল। সাত নম্বর জার্সিধারী একক চেষ্টায় বাঁ দিক দিয়ে বল নিয়ে ঢুকতে চেষ্টা করেন। তারপর শট নেন লক্ষ্যে। গোলকিপারের কাছে রিবাউন্ড হয়ে আসার সুযোগ লুফে নেন কুনহা। বিশ্বকাপে করেন প্রথম গোল।

পাকেতা গত ম্যাচের তুলনায় বেশ স্বতঃস্ফূর্ত ছিলেন। হাইতির এক ডিফেন্ডারকে ফাঁকি দিয়ে তার বাড়ানো বল ধরেন ভিনিসিয়ুস। তারপর চমৎকার এক পাসে রক্ষণভাগের পেছনে বল বাড়িয়ে দেন কুনহার উদ্দেশ্যে। বল ধরে ম্যানইউ ফরোয়ার্ড ডিফেন্ডারদের বোকা বানিয়ে প্রথম পোস্টের দিকে ছুটে যান এবং জোরালো গতিতে জাল লক্ষ্য করে এক বুলেট গতির কোনাকুনি শট নেন। বল সরাসরি জালের একদম ওপরের অংশে আছড়ে পড়ে! তার বাঁ পায়ের রকেট গতির শট ঠেকাতে গোলরক্ষক প্লেসিডের কিছুই করার ছিল না।
দলের দ্বিতীয় গোল উদযাপনের সময়ই রাফিনিয়ার চোটের আভাস মেলে। ডান পায়ের ঊরুতে ব্যথার ছাপ ছিল চোখেমুখে। স্কোর গোলশূন্য থাকা অবস্থায় তার একটি গোল অফসাইডের কারণে বাতিল হয়। রায়ানের বদলি হওয়ার আগে কয়েকবার হাইতিয়ান ডিফেন্সকে সমস্যায় ফেলেছিলেন বার্সেলোনা ফরোয়ার্ড।

উদ্বেগ ছাপিয়ে ব্রাজিলিয়ানরা মাঠে দাপট ধরে রেখেছিল। আরেকটি আক্রমণে হাইতিয়ান ডিফেন্সে চিড় ধরায় ব্রাজিল। প্রথমার্ধের ইনজুরি টাইমে পাকেতা হাইতির ডিফেন্সের ওপর দিয়ে বল ভাসিয়ে দেন এবং ভিনিসিয়ুস সরাসরি গোলের সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে যান। রিয়াল মাদ্রিদের এই তারকা পেনাল্টি এরিয়ার দিকে দ্রুত ছুটে গিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় গোলরক্ষককে পরাস্ত করে বল জালে জড়িয়ে দেন। চলতি বিশ্বকাপে যা ছিল তার দ্বিতীয় গোল।
দ্বিতীয়ার্ধে বিরতির আগের ব্রাজিলকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। জয় মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে যাওয়ায় আনচেলত্তি বেশ কিছু পরিবর্তন আনেন। রায়ান, এন্দ্রিক, মার্তিনেল্লি, এদারসন ও দানিলো সান্তোস ভুল করেননি। কিন্তু ব্রাজিলের আক্রমণের ধার ছিল না। হাইতিয়ানদের বিপক্ষে কাউন্টার অ্যাটাকের জন্য যথেষ্ট জায়গা কিন্তু পেয়েছিল তারা। বরং হাইতি আরও বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। ব্রাজিলিয়ানরা যে কয়েকটি সুযোগ পেয়েছিল, তা লুফে নিতে পারেনি।
শেষ অর্ধে মূলত হাইতি চেপে ধরেছিল ব্রাজিলকে। ৬৩ মিনিটে কর্নার থেকে ইডের হেড ক্ষিপ্রতার সঙ্গে পাঞ্চ করেন আলিসন বেকার। এরপর আরও দুইবার পরীক্ষা দিতে হয়েছে ব্রাজিল কিপারকে। উইলসন ইসিডোর ও ডমিনিক সিমনের লক্ষ্যে নেওয়া শটে বাধা হয়ে দাঁড়ান তিনি। ৬৪ মিনিটে কুনহাকে হ্যাটট্রিকের স্বপ্ন জলাঞ্জলি দিয়ে মাঠ ছাড়তে হয়। তার বদলি নেমে এন্দ্রিক দারুণ ছাপ রাখেন। ৭৮ মিনিটে তিনি জাল কাঁপালেও অফসাইডের বাঁশি বাজে। আগের মিনিটে ডগলাস সান্তোস বল বারের ওপর দিয়ে উড়িয়ে মারেন।
ম্যাচের পরিসংখ্যান কী বলছে?
বল পজেশনে দ্বিতীয়ার্ধে ব্রাজিলকে বেশ টেক্কা দিয়েছে হাইতি—ব্রাজিলের ৫১ শতাংশের বিপরীতে তাদের ছিল ৪৯ শতাংশ। পুরো ম্যাচ শেষে বল পজেশনে তাদের অবস্থান ছিল ৪৩ শতাংশ। ব্রাজিলের অ্যাকুরেট পাস ছিল ৪৬২, হাইতির ৩৩২।
ব্রাজিলের ৫টি শট অন টার্গেটের বিপরীতে দ্বিতীয়ার্ধে তিনটি শট লক্ষ্যে রেখেছিল হাইতি। ব্রাজিলের শট ছিল ৮, হাইতির সাত।

ব্রাজিলকে কি সত্যি ব্রাজিলের মতো লেগেছে?
মরক্কোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে আনচেলত্তি প্রথাগত নম্বর ৯ হিসেবে ইগর থিয়াগোকে খেলিয়েছিলেন, যেখানে কোনো গতি বা ছন্দ ছিল না। কিন্তু হাইতির বিপক্ষে আনচেলত্তি আবার কুনহাকে ফিরিয়ে আনেন এবং এটি দারুণ কাজ করেছে। কুনহার মুভমেন্টের কারণে ভিনিসিয়ুস সহজে ফাঁকা জায়গা তৈরি করতে পেরেছেন। পাকেতা, কুনহা ও ভিনিসিয়ুস পরস্পরের পাস ও পজিশন অদলবদল করে চমৎকার কম্বিনেশন তৈরি করেছিলেন। তুলনামূলক দুর্বল দল হাইতির বিপক্ষে এই জয় নিয়ে খুব বেশি মেতে ওঠার কিছু নেই, তবে ব্রাজিলের জন্য এটি ভবিষ্যতে গুছিয়ে ওঠার ভালো ভিত্তি।
হাইতির জন্য কোনো ‘হলিউডের মতো সমাপ্তি’ হলো না, তবে প্রশংসা পাওয়ার দাবি রাখে
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতার মধ্য দিয়ে যাওয়া হাইতির জন্য ৫২ বছর পর বিশ্বকাপে আসাটাই এক বিশাল গল্প। প্রথম ম্যাচে স্কটল্যান্ডের কাছে অল্পের জন্য হেরে যাওয়ার পর ব্রাজিলের বিপক্ষে চমৎকার কিছুর আশা ছিল তাদের। কিন্তু প্রথমার্ধেই ব্রাজিলের গোল উৎসবের কারণে সেই স্বপ্ন ভেস্তে যায়। দ্বিতীয়ার্ধে তারা লড়াই করার চেষ্টা করলেও কোনো অলৌকিক কিছু ঘটাতে পারেনি। তবে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিলেও নিজেদের নিবেদন দিয়ে তারা সবার মন জয় করেছে।
রাফিনিয়াকে কতটা মিস করবে ব্রাজিল?
ম্যাচের ৩৮ মিনিটে রাফিনিয়া যখন মাঠে বসে পড়েন, তার মুখের অভিব্যক্তিই বলে দিচ্ছিল এটি কোনো সাধারণ চোট নয়। বার্সেলোনার হয়ে গত মৌসুমে ইনজুরির কারণে ১৮টি ম্যাচ মিস করা রাফিনিয়া বিশ্বকাপে হয়তো এখনো গোল বা অ্যাসিস্ট করতে পারেননি, তবে মাঠে তার গতি ও কাজের চাপ দলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ফিট না থাকলে আনচেলত্তির কাছে বোর্নমাউথের তরুণ উইঙ্গার রায়ান অথবা লুইজ হেনরিকের মতো বিকল্প রয়েছে।

কুনহার কি এখন থেকেই শুরুর একাদশে থাকা উচিত?
সহজ উত্তর হলো হ্যাঁ। প্রথম ম্যাচে ইগর থিয়াগো ৬২ মিনিট খেলেও গোলমুখে কোনো শট বা সুযোগ তৈরি করতে পারেননি। অন্যদিকে কুনহা ফিলাডেলফিয়াতে ৬৪ মিনিট খেলে দুটি গোল করেছেন। তিনি শুধু উপরে বলের জন্য অপেক্ষা করেননি, বরং মাঝমাঠে নেমে এসে বল কেড়ে নেন এবং আক্রমণে গিয়ে ফিনিশ করেন। টুর্নামেন্টে এগিয়ে যাওয়ার জন্য কুনহার মতো বৈচিত্রময় খেলোয়াড়ের ওপরই ব্রাজিলের ভরসা করা উচিত।
হাইতিকে হারানোর পর ব্রাজিলের কি আরও আত্মবিশ্বাসী হওয়া উচিত?
ব্রাজিল ফুটবল দল ফিলাডেলফিয়াতে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে সর্বনিম্ন দল হাইতিকে (৮৫তম স্থান) সহজেই ৩-০ ব্যবধানে হারিয়েছে। কিন্তু এই সহজ জয় থেকে ব্রাজিলের বর্তমান পারফরম্যান্স নিয়ে নিশ্চিতভাবে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।
যদিও কুনহা অবশেষে তার গোলখরা কাটিয়েছেন। ভিনিসিয়ুস প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আক্রমণেই নিজেকে জড়িয়ে রেখেছিলেন। ব্রুনো গিমারায়েস ও পাকেতা ভালো ম্যাচ খেলেছেন। এছাড়া রায়ান ও এন্দ্রিকের মতো তরুণ ফুটবলাররা মাঠে নামার সুযোগ পেয়েছেন।
দল মাত্র ৫টি শট লক্ষ্যে রাখতে পেরেছে। মাঝমাঠে এখনও কিছুটা শূন্যতা রয়ে গেছে। কোচ আনচেলত্তি সম্ভবত এন্দ্রিককে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছেন না। যদিও দ্বিতীয়ার্ধে সুযোগ পেয়ে ইতালিয়ান কোচকে খুশি করার উপলক্ষ তৈরি করেছিলেন তিনি। মাঠে নামার ১৪ মিনিট পর গোল করলেও অফসাইডের পতাকা তার স্বস্তি উড়িয়ে দিয়েছে। মূল কথা, মরক্কোর সঙ্গে কষ্টে ড্র করার পর এবারও কোনো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে বড় পারফরম্যান্স দেখাতে পারেনি ব্রাজিল।
বলতেই হয়, একটি দুর্বল দলের বিপক্ষে ৪৫ মিনিট ভালো খেলে ৩-০ গোলে জেতা অবশ্যই ম্যাচ হারার চেয়ে ভালো। তাতে ব্রাজিল তাদের গ্রুপে প্রথম স্থানে থাকার লড়াইয়ে টিকে থাকল। কিন্তু সামনের কোনো ম্যাচই যে সহজ হবে না, সেটাও তাদের মনে রাখতে হবে।
এফএইচএম

