ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং দূরদর্শী চরিত্রগুলোর নাম নিলে সবার আগে যে কজনার নাম আসবে, তাদের অন্যতম ডাচ কিংবদন্তি ইয়োহান ক্রুইফ। মাঠের ফুটবলার হিসেবে তিনি যতটা অনন্য ছিলেন, ফুটবল রূপরেখার প্রবক্তা হিসেবে ছিলেন তার চেয়েও অনেক বড় জাদুকর। তবে ক্রুইফের ফুটবল ক্যারিয়ারের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং একই সাথে ট্র্যাজিক অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল ফিফা বিশ্বকাপের মঞ্চে। ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে ক্রুইফের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে কেবল একটি টুর্নামেন্টের অতিমানবীয় পারফরম্যান্স এবং একটি বিপ্লবের গল্প হিসেবে।
১৯৭৪ সালের পশ্চিম জার্মানি বিশ্বকাপ ছিল ইয়োহান ক্রুইফের ক্যারিয়ারের একমাত্র বিশ্বকাপ। আর এই একটি বিশ্বকাপেই তিনি বিশ্ব ফুটবলকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন এক নতুন দর্শনের সাথে, যার নাম ‘টোটাল ফুটবল’। ডাচ কোচ রিনাস মিশেলসের এই কৌশলের মূল চালিকাশক্তি বা মাঠের জেনারেল ছিলেন অধিনায়ক ক্রুইফ। এই কৌশলে মাঠের কোনো খেলোয়াড়ের পজিশন নির্দিষ্ট ছিল না। একজন ডিফেন্ডার আক্রমণে উঠলে, ফরোয়ার্ড এসে ডিফেন্স সামলাতেন। আর ক্রুইফ খেলতেন এক ‘ফ্রি রোল’ বা মুক্ত পাখির মতো—কখনো মাঝমাঠ থেকে খেলা নিয়ন্ত্রণ করতেন, কখনো উইং দিয়ে ডিফেন্স চূর্ণ করতেন, আবার কখনো স্ট্রাইকার হিসেবে বক্সে ঢুকে গোল করতেন।

সেই বিশ্বকাপে হল্যান্ড বা নেদারল্যান্ডস দল যেন মাঠে এক নান্দনিক কবিতা লিখছিল। গ্রুপ পর্বে উরুগুয়ে, বুলগেরিয়াকে উড়িয়ে দেওয়ার পর দ্বিতীয় পর্বে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলকে খড়কুটোর মতো ভাসিয়ে দেয় ডাচরা। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ৪-০ গোলের জয়ে ক্রুইফ করেছিলেন জোড়া গোল, আর ব্রাজিলের বিপক্ষে ২-০ জয়ের ম্যাচে তার করা সেই শূন্যে ভেসে ভলি করার দৃশ্যটি বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম সেরা আইকনিক ছবি হয়ে আছে। এই টুর্নামেন্টেই তিনি বিশ্বকে দেখান তার সিগনেচার ড্রিবলিং 'ক্রুইফ টার্ন', যা ডিফেন্ডারদের বোকা বানানোর এক চিরন্তন শিল্পে রূপ নেয়।
নেদারল্যান্ডস ফাইনালে মুখোমুখি হয় স্বাগতিক পশ্চিম জার্মানির। ম্যাচের প্রথম মিনিটেই ক্রুইফ এক একক দৌড়ে জার্মানির ডিবক্সে ঢুকে পড়েন এবং ফাউলের শিকার হন। ম্যাচের দ্বিতীয় মিনিটে জার্মানির কোনো খেলোয়াড় বল ছোঁয়ার আগেই পেনাল্টি থেকে গোল করে এগিয়ে যায় নেদারল্যান্ডস। কিন্তু অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস আর জার্মানির ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারের লড়াকু ফুটবলের সামনে শেষ পর্যন্ত ২-১ ব্যবধানে হেরে রানার্স-আপ হতে হয় ডাচদের। ট্রফি না জিতলেও, পুরো ফুটবল দুনিয়ার মন জয় করে নিয়েছিলেন ক্রুইফ। ৩ গোল ও ৩ অ্যাসিস্ট করে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে তিনি জেতেন 'গোল্ডেন বল'।

এরপর আসে ১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ। মাত্র ৩১ বছর বয়সে, ক্যারিয়ারের চূড়ায় থেকেও ক্রুইফ সেই বিশ্বকাপে অংশ নেননি। দীর্ঘদিন ধরে মানুষ ভাবত হাঙ্গেরির মতো ডাচ রাজনৈতিক প্রতিবাদের অংশ হিসেবে বা বোর্ডের সাথে ঝামেলার কারণে তিনি যাননি। তবে দীর্ঘ ৩০ বছর পর ক্রুইফ প্রকাশ করেন আসল সত্য—বিশ্বকাপের ঠিক আগে বার্সেলোনায় তার পরিবার এক মারাত্মক অপহরণ চেষ্টার শিকার হয়েছিল। রাইফেল মাথায় ধরে তাদের বেঁধে রাখা হয়েছিল। এই মানসিক ট্রমা ও পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবেই তিনি আর্জেন্টিনার বিমানে চড়েননি।
ক্রুইফহীন নেদারল্যান্ডস সেবারও ফাইনালে হেরে রানার্স-আপ হয়। অনেকেই বিশ্বাস করেন, ক্রুইফ থাকলে ১৯৭৮ সালের ট্রফিটা ডাচদের ঘরেই যেত।

ইয়োহান ক্রুইফ ফুটবল ইতিহাসের সেই বিরল মহানায়ক, যিনি ট্রফি না জিতেও বিশ্বকাপকে চিরতরে বদলে দিয়েছিলেন। ১৯৭৪ বিশ্বকাপে তার সেই কমলা রঙের ১৪ নম্বর জার্সি আর মাঠের মায়াবী ফুটবল আজও ফুটবলপ্রেমীদের কাছে রোমান্টিকতার শেষ কথা। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, ফুটবলে জেতার চেয়ে সুন্দর খেলে মানুষের মনে দাগ কেটে যাওয়াটা কোনো অংশে কম নয়।
এফএইচএম

