World Cup Football Field

বিজ্ঞাপন

একসময় ছিলেন কারখানার মেশিন অপারেটর, সেই উন্দাভ এখন বিশ্বকাপ তারকা

একসময় ছিলেন কারখানার মেশিন অপারেটর, সেই উন্দাভ এখন বিশ্বকাপ তারকা

খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, যখন ম্যানেজার জুলিয়ান নাগেলসমান প্রকাশ্যেই তার সমালোচনা করেছিলেন—কিন্তু এখন বিশ্বকাপ মঞ্চে জার্মানির অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করছেন দেনিজ উন্দাভ।

আইভরি কোস্টের বিপক্ষে ২-১ গোলের নাটকীয় জয়ে উন্দাভের জোড়া গোল আবারও তার সক্ষমতা ফুটিয়ে তুলেছে, যে জয়ে ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ জয়ের পর প্রথমবারের মতো জার্মানি বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে পৌঁছেছে।

বেঞ্চ থেকে বদলি হিসেবে নেমে মাত্র দুটি ম্যাচে ৩টি গোল এবং ২টি অ্যাসিস্ট করেছেন এই স্ট্রাইকার, যার ফলে মাত্র দুই ম্যাচেই পাঁচটি গোলে সরাসরি অবদান রাখার রেকর্ড গড়েছেন তিনি। ১৯৬৬ সালের পর থেকে বিশ্বকাপে কোনো বদলি খেলোয়াড়ের পক্ষে এটিই যৌথভাবে সর্বোচ্চ অবদান, ১৯৯০ সালে ক্যামেরুনের রজার মিলার রেকর্ডে ভাগ বসালেন তিনি।

তবে গত মার্চে ঘানার বিপক্ষে বদলি হিসেবে নেমে একদম শেষ মুহূর্তে জয়সূচক গোল করার পর নাগেলসমানের সাথে প্রকাশ্য বিরোধের কারণে ২৯ বছর বয়সী এই তারকার জার্মানির বিশ্বকাপ দলে জায়গা পাওয়াটা নিশ্চিত ছিল না।

উন্দাভ প্রকাশ্যে জার্মানির মূল একাদশে খেলার ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু লাইপজিগ ও বায়ার্ন মিউনিখের সাবেক এই কোচ তার জবাবে সতর্ক করে বলেছিলেন যে, এ ধরনের মন্তব্য করে উন্দাভ নিজেই নিজের ওপর অযাচিত চাপ তৈরি করছেন।

নাগেলসমান এমনকি এমন আভাসও দিয়েছিলেন যে, উন্দাভ যদি শুরু থেকে খেলতেন তবে হয়তো গোলই পেতেন না। অবশ্য পরে তিনি এই ফরোয়ার্ডের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন বলেও জানান।

আর এরপর থেকে উন্দাভ নিজের পারফরম্যান্স দিয়েই সব সমালোচনার জবাব দিচ্ছেন, একেবারে চমৎকারভাবে।

পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, আন্তর্জাতিক ১১ ম্যাচে নিজের গোলসংখ্যা ৯-এ নিয়ে যাওয়ার পর এখন বিশ্বকাপের মূল একাদশে জায়গা পাওয়ার অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার তিনি। ‘হ্যাঁ, অবশ্যই,’ শনিবারের জয়ের পর নাগেলসমানের কাছে যখন জানতে চাওয়া হয়েছিল যে আগামী বৃহস্পতিবার ইকুয়েডরের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে উন্দাভ মূল একাদশে থাকতে পারেন কি না, প্রশ্নে তিনি এই উত্তর দেন।

‘আমি আগেও বলেছি যে আমরা বিভিন্ন কৌশল নিয়ে অনেক কথা বলতে পারি। কিন্তু আমি কেন ওর ছন্দ নষ্ট করতে যাব? ও দুইবার মাঠে নেমেছে এবং দুইবারই গোল এনে দিয়েছে।’

সব বাধা ও প্রত্যাশাকে ভুল প্রমাণ করে ক্যারিয়ার গড়া এক স্ট্রাইকারের অসাধারণ জীবনের এটি কেবলই একটি নতুন অধ্যায়।

‘বেঁচে থাকার টাকার জন্য আমাকে সেই চাকরিটা করতে হয়েছিল’

আইভরি কোস্টের বিপক্ষে জোড়া গোলের মাধ্যমে ২০০২ সালে মিরোস্লাভ ক্লোসার পর প্রথম জার্মান খেলোয়াড় হিসেবে নিজের প্রথম দুই বিশ্বকাপ ম্যাচেই গোল করার কৃতিত্ব দেখালেন উন্দাভ।

এটি নিঃসন্দেহে এক অভিজাত তালিকায় নাম লেখানো। তবে একসময় বিশ্বকাপে খেলা উন্দাভের জন্য ছিল দূর আকাশের স্বপ্ন, যাকে ১৪ বছর বয়সে ওয়ের্ডার ব্রেমেন দল থেকে বাদ পড়তে হয়েছিল।

১৭ বছর বয়সে জার্মানির চতুর্থ স্তরের লিগে আধা-পেশাদার ফুটবলার হিসেবে সপ্তাহে মাত্র ১২০ পাউন্ড আয় করতেন তিনি, একই সাথে ফুটবল ক্যারিয়ারের পাশাপাশি একটি কারখানায় প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা কাজ করতেন।

বেলজিয়ান সংবাদমাধ্যম ‘সেভেন সার সেভেন’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে উন্দাভ বলেন, ‘যখন ওয়ের্ডার ব্রেমেন ১৪ বছর বয়সে আমাকে বলেছিল যে আমার উচ্চতা কম হওয়ায় তাদের দলে আমার কোনো ভবিষ্যৎ নেই, তখন আমার মন ভেঙে গিয়েছিল।’

‘কিন্তু আমি আশা হারাইনি। ১৭ বছর বয়সে ঘর ছেড়ে জার্মানির চতুর্থ বিভাগের দল হাভেলসের সাথে চুক্তি করি, যেখানে ফুটবল খেলা ও অনুশীলনের পাশাপাশি একটি কারখানায় লেজার মেশিন অপারেটর হিসেবে পূর্ণকালীন ৮ ঘণ্টা কাজ করতাম।’

‘আমি ভোর ৪টার দিকে ঘুম থেকে উঠতাম, কারখানায় যেতাম, তারপর অনুশীলনে যেতাম এবং রাত ৮টার দিকে বাড়ি ফিরতাম... পরদিন আবারও একই রুটিন।’

‘বেঁচে থাকার খরচের জন্যই আমাকে সেই চাকরিটি করতে হয়েছিল, কারণ কেবল ফুটবল থেকে পাওয়া টাকা দিয়ে টিকে থাকা অসম্ভব ছিল।’

উন্দাভ ২০২০ সালে বেলজিয়ামের দ্বিতীয় বিভাগের দল ইউনিয়ন সেন্ট-জিলোয়াঁতে যোগ দেন। পরের বছরই তাদের প্রথম বিভাগে উঠতে সাহায্য করেন এবং শীর্ষ লিগে ২৫টি গোল করেন, যা তাকে ইংলিশ ক্লাব ব্রাইটনে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়।

কিন্তু ২০২২-২৩ মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে ২২ ম্যাচে মাত্র ৫টি গোল করার পর তাকে স্টুটগার্টে ধারে পাঠানো হয়, যারা ২০২৪ সালে তাকে স্থায়ীভাবে দলে নেয়।

২০২৫-২৬ মৌসুমে বুন্দেসলিগায় ১৯টি গোল করে হ্যারি কেইনের পেছনে থেকে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন উন্দাভ, যা তাকে বিশ্বকাপের দলে জায়গা এনে দেয়।

উন্দাভ এখন তার ক্যারিয়ারের চূড়ায় থেকে বিশ্বকাপে

নাগেলসমান কুরাসাও এবং আইভরি কোস্টের বিপক্ষে জার্মানির জয়গুলোতে আক্রমণভাগে আর্সেনালের কাই হাভার্টজকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। তবে উন্দাভ এখন তাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছেন।

জার্মানি কোচ বলেন, ‘খেলা যখন একটু উন্মুক্ত হয়ে যায়, তখন ওর মুভমেন্ট দুর্দান্ত থাকে।’

‘আমি বলতে পারি যে নিজের ছন্দ ধরে রাখো এবং তোমার জন্য ফিনিশার হিসেবে মাঠে নামাটাই ভালো। সে সত্যিই বিশ্বকাপের জন্য নিজের সেরা ফর্মে রয়েছে। আমি তাকে মূল একাদশেও রাখতে পারি। প্রতিটি খেলোয়াড়ই শুরু থেকে খেলতে চায়, তবে আমি মনে করি সে যেভাবে আছে তাতেই খুশি, কারণ সে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং আমরা তার পারফরম্যান্সে অত্যন্ত সন্তুষ্ট।’

‘দেনিজের ক্ষেত্রে বিষয়টি পরিষ্কার, গত ম্যাচে বদলি হিসেবে নেমে সে আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে। দেনিজের আলাদা প্রস্তুতির প্রয়োজন হয় না, সে যেকোনো মুহূর্তে মাঠে নেমে মানিয়ে নিতে পারে।’

জার্মানির হয়ে শেষবার মূল একাদশে ছিলেন ৩১ মে  ফিনল্যান্ডের বিপক্ষে, ৪-০ ব্যবধানের প্রীতি ম্যাচে দুটি গোল করার পাশাপাশি একটি অ্যাসিস্ট করেছিলেন উন্দাভ।

আইভরি কোস্টের বিপক্ষে ম্যাচসেরার পুরস্কার নেওয়ার পর স্টুটগার্টের এই ফরোয়ার্ড বলেন, ‘এটি একটি দারুণ অনুভূতি।’

‘গতবারও এটি পেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু হয়নি। এটি চমৎকার, একটি অসাধারণ অনুভূতি। ট্রফিটা পাওয়া আমার জন্য দারুণ ব্যাপার, তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমরা ম্যাচটি জিতেছি এবং পরের রাউন্ডে জায়গা করে নিয়েছি, এখন দেখা যাক সামনে কী হয়।’

যদি তিনি এই ফর্ম ধরে রাখতে পারেন, তবে সামনে হয়তো আরও অনেক সম্মান অপেক্ষা করছে। এমনকি জার্মানির পঞ্চম বিশ্বকাপ ট্রফি জয়ের অভিযানে ফুটবলের সবচেয়ে বড় পুরস্কারটি জেতাও অসম্ভব নয়।

এফএইচএম