২০০৬ সালে শুরু, মাঝে ২০১০ সালে খরা। তারপর যতই দিন গেছে, বিশ্বকাপে অনবদ্য পারফরম্যান্স করেছেন লিওনেল মেসি। গত কাতার বিশ্বকাপ ও চলতি আসর মিলে টানা ৬ ম্যাচে ১০ গোল তার। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে প্রথম গোল করে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতাও হয়েছেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। আলজেরিয়ার বিপক্ষে প্রথম বিশ্বকাপ হ্যাটট্রিক, আর অস্ট্রিয়াকে দুই গোল দিয়ে ১২ বছরের পুরোনো রেকর্ড ভেঙে দিয়েছেন তিনি। চলুন দেখে নেওয়া যাক, তার ১৮ গোল কেমন ছিল।
২০০৬ বিশ্বকাপে মেসি একমাত্র গোল করেন। ২০১০ সালে কোনো গোল পাননি। ২০১৪ সালে ক্যারিয়ারের প্রথম ফাইনালে ওঠার পথে চার গোল করেন। ২০১৮ সালেও সুবিধা করতে পারেননি, মাত্র এক গোল। তবে ২০২২ ছিল তার জন্য স্মরণীয়। প্রথম ট্রফি জেতার পথে ৭ গোল করেন। আর এবার ২ ম্যাচেই হয়ে গেল পাঁচ গোল। কোথায় থামবেন মেসি?
জার্মানি ২০০৬

গ্রুপ পর্ব: আর্জেন্টিনা ৬-০ সার্বিয়া অ্যান্ড মন্টেনিগ্রো
১৯তম জন্মদিনের মাত্র কয়েকদিন আগে তরুণ লিওনেল মেসি সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে ম্যাচের শেষ ১৬ মিনিটের জন্য মাঠে নামেন। কার্লোস তেভেজের পাস থেকে গোল করে আর্জেন্টিনার জয় নিশ্চিত করেন এই বিস্ময় তারকা।
ব্রাজিল ২০১৪
![]()
গ্রুপ পর্ব: আর্জেন্টিনা ২-১ বসনিয়া-হার্জেগোভিনা
২০১০ সালে গোল করতে ব্যর্থ হন। সারা বিশ্বের রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা ছিল মেসির আরেকটি গোল দেখার। আট বছর পর ২৭ বছর বয়সে তিনি সেই অপেক্ষার অবসান ঘটালেন। গঞ্জালো হিগুয়েইনের একটি পাস নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বসনিয়ার দুজন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে পোস্টে লেগে বল জালে জড়ান তিনি।
গ্রুপ পর্ব: আর্জেন্টিনা ১-০ ইরান
আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ইরানের মজবুত রক্ষণভাগ। কিছুতেই ভেদ করতে পারছিল না আলবিসেলেস্তেরা। ৯০ মিনিটে মেসি পেনাল্টি এলাকার কিনারা থেকে বল পেয়ে তার ট্রেডমার্ক বাঁ পায়ের শটে বিপরীত কোণায় বল পাঠিয়ে লা আলবিসেলেস্তের জয় নিশ্চিত করেন।

গ্রুপ পর্ব: আর্জেন্টিনা ৩-২ নাইজেরিয়া
তৃতীয় রাউন্ডে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করে মেসি গ্রুপ পর্ব শেষ করেন। অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়ার শট পোস্টে লাগলে বক্সে দ্রুতগতিতে ঢুকে মেসি সজোরে শট মেরে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে এগিয়ে দেন।
গ্রুপ পর্ব: আর্জেন্টিনা ৩-২ নাইজেরিয়া
নাইজেরিয়া একটি গোল শোধ করার পর মেসি একটি অসাধারণ ফ্রি কিক গোল করে আলবিসেলেস্তেকে আবারও এগিয়ে দেন। বলটি জালে জড়ানোর সময় অসহায় চোখে তাকিয়ে ছিলেন নাইজেরিয়ার গোলরক্ষক।
রাশিয়া ২০১৮

গ্রুপ পর্ব: আর্জেন্টিনা ২-১ নাইজেরিয়া
চার বছর পর মেসি আবারও বিশ্বমঞ্চে নাইজেরিয়াকে ভড়কে দেন। তিনি এভার বানেগার কাছ থেকে পাওয়া একটি পাস নিয়ন্ত্রণে নিয়ে গোলরক্ষকের মুখোমুখি হন। তারপরই ম্যাচের ফলাফল চূড়ান্ত হয়ে যায়।
কাতার ২০২২
গ্রুপ পর্ব: সৌদি আরব ২-১ আর্জেন্টিনা
কাতারে অনুষ্ঠিত এই বিশ্ব আসরের দশ মিনিটের মাথায় পেনাল্টি এরিয়ায় লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে ফাউল করা হয়। এরপর দায়িত্ব নিয়ে মেসি টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনার হয়ে প্রথম গোলটি করেন। সৌদি আরব ঘুরে দাঁড়িয়ে পরপর দুটি গোল করে এক অপ্রত্যাশিত পরাজয়ের স্বাদ দেয় তাদের।
গ্রুপ পর্ব: আর্জেন্টিনা ২-০ মেক্সিকো
সৌদি আরবের কাছে হারের পর আর্জেন্টিনা ২-০ গোলে মেক্সিকোকে হারিয়েছে। মেসি আবারও গোল করেছেন। ডি মারিয়া ডি-বক্সের বাইরে ফাঁকা জায়গায় অধিনায়ককে খুঁজে নেন। আর্জেন্টিনার এই কিংবদন্তি নিকটতম মেক্সিকান ডিফেন্ডারদের চেয়েও দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে নিচু শটে মেক্সিকান গোলরক্ষককে পরাস্ত করেন।
শেষ ষোলো: আর্জেন্টিনা ২-১ অস্ট্রেলিয়া
পেনাল্টি এরিয়ায় নিকোলাস ওতামেন্দির কাছ থেকে পাস পেয়ে মেসি অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে গোলমুখ খোলেন। এই খুদে জাদুকর নিচু শটে বলটি বেশ কয়েকজন অস্ট্রেলিয়ান ডিফেন্ডারের মাঝ দিয়ে জালে জড়ান।
কোয়ার্টার ফাইনাল: আর্জেন্টিনা ২-২ (৪-৩ পেনাল্টি) নেদারল্যান্ডস
একটি অ্যাসিস্ট করার পর মেসি পেনাল্টি থেকে গোল করে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার লিড বাড়িয়ে দেন। পেনাল্টি এরিয়ায় ডেনজেল ডামফ্রিস নাহুয়েল মলিনাকে ফাউল করলে তিনি আন্দ্রিস নোপার্টের বাম পাশ দিয়ে বল জালে জড়ান।
সেমিফাইনাল: আর্জেন্টিনা ৩-০ ক্রোয়েশিয়া
পেনাল্টি এরিয়ায় লিভাকোভিচের ফাউলের শিকার হন জুলিয়ান আলভারেজ। মেসি আবারও পেনাল্টি থেকে গোল করেন। স্পট-কিকটি এতটাই নিখুঁতভাবে নিয়েছিলেন তিনি, যে ক্রোয়েশিয়ার গোলরক্ষক সেটির ধারেকাছেও যেতে পারেননি এবং আর্জেন্টিনা দাপট দেখিয়ে ফাইনালে পৌঁছে যায়।
ফাইনাল: আর্জেন্টিনা ৩-৩ (৪-২ টাইব্রেকার) ফ্রান্স
শিরোপা জয়ের ম্যাচে উসমান দেম্বেলের হাতে ডি মারিয়া ডি-বক্সে ফাউলের শিকার হলে পেনাল্টি থেকে গোল করে মেসি তার গোলের ধারা বজায় রাখেন।

ফাইনাল: আর্জেন্টিনা ৩-৩ (৪-২ টাইব্রেকার) ফ্রান্স
কিলিয়ান এমবাপের জোড়া গোলে দোহায় ফাইনালটি অতিরিক্ত সময়ে গড়ায়। কিন্তু শেষ হাসিটা হাসে মেসি ও আর্জেন্টিনা। লাউতারো মার্টিনেজের একটি শট হুগো লরিস ধরতে ব্যর্থ হলে মেসি দ্রুতগতিতে এগিয়ে গিয়ে আর্জেন্টিনার তৃতীয় গোলটি করেন। ফাইনালটি পেনাল্টি শুটআউটে গড়ায় এবং ম্যারাডোনার কাপ জয়ের ৩৬ বছর পর মেসি অবশেষে আর্জেন্টিনাকে তৃতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা এনে দেন।
যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা ২০২৬
গ্রুপ পর্ব: আর্জেন্টিনা ৩-০ আলজেরিয়া
মেসি ও আর্জেন্টিনা বর্তমান চ্যাম্পিয়ন হিসেবে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে অংশ নেয়। প্রথমার্ধের শুরুতেই আলবিসেলেস্তে অধিনায়ক রদ্রিগো দে পলের কাছ থেকে একটি চমৎকার পাস পেয়ে ঘুরে, গতি বাড়িয়ে এক দর্শনীয় বাঁকানো শট নেন। আলজেরিয়ার গোলরক্ষককে পরাস্ত করে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন তিনি।
গ্রুপ পর্ব: আর্জেন্টিনা ৩-০ আলজেরিয়া
বিরতির পর আলজেরিয়ার গোলরক্ষক দূর থেকে নেওয়া অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের একটি শট হাত থেকে ফেলে দেন। দ্রুতগতিতে ছুটে এসে ফিরতি বলে মেসি গোল করে আর্জেন্টিনার ব্যবধান দ্বিগুণ করেন।
গ্রুপ পর্ব: আর্জেন্টিনা ৩-০ আলজেরিয়া
দ্বিতীয়ার্ধের শেষের দিকে বদলি খেলোয়াড় নিকোলাস গঞ্জালেজের কাছ থেকে বল পেয়ে জালে বল জড়িয়ে নিজের হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন মেসি। এই গোলটি দলের জয় নিশ্চিত করে এবং বিশ্বকাপে ১৬ গোল করে মেসিকে মিরোস্লাভ ক্লোসার পাশে বসায়। এটি ছিল বিশ্বকাপে তার প্রথম হ্যাটট্রিক।

গ্রুপ পর্ব: আর্জেন্টিনা ২-০ অস্ট্রিয়া
৩৮ মিনিটে আসে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। বাম দিক থেকে আর্জেন্টিনার আক্রমণের সূত্রপাত করেন মেসি নিজেই এবং পেনাল্টি বক্সের প্রান্ত থেকে বলটিকে নিখুঁত শটে পোস্টের নিচের বাম কোণ দিয়ে জালে জড়িয়ে ফিনিশিং করেন। বিশ্বকাপের রেকর্ড ১৭তম গোলে মিরোস্লাভ ক্লোসাকে ছাড়িয়ে তো গেলেনই, দলকেও এগিয়ে দিলেন।
গ্রুপ পর্ব: আর্জেন্টিনা ২-০ অস্ট্রিয়া
মেসি শেষ দিকে করেছেন আরেকটি গোল। ইনজুরি টাইমের পঞ্চম মিনিটে বাম দিক থেকে আলভারেস বল নিয়ে দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই আর্জেন্টিনা এক বিধ্বংসী কাউন্টার-অ্যাটাকে ওঠে। তার নেওয়া শটটি শ্লাগার ঠেকিয়ে দিলেও বল চলে যায় মেসির পায়ে, যদিও তখন বেশ কয়েকজন অস্ট্রিয়ান ডিফেন্ডার গোললাইন আগলে দাঁড়িয়েছিলেন।
মেসির প্রথম প্রচেষ্টাটি সাইওয়াল্ডের গায়ে লেগে ফিরে আসে। কিন্তু দ্বিতীয় শটে তিনি গোললাইনে দাঁড়িয়ে থাকা দানসোকে পরাস্ত করে বল জালে জড়ান।
চলবে.....!!!
এফএইচএম

