সহজাত আকর্ষণ, অসাধারণ ফুটবল দক্ষতা আর সিনেমার নায়কদের মতো ব্যক্তিত্ব– সবমিলিয়ে পাওলো রসি ছিলেন ইতালিয়ান ফুটবলের এক উজ্জ্বল নাম। মাঝে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের মতো অভিযোগে নিষেধাজ্ঞা পেয়েছিলেন। নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের পর ১৯৮২ বিশ্বকাপ জয়ে ইতালিকে নেতৃত্ব দিয়ে দেশটির ক্রীড়া ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন রসি।
রসির শারীরিক গঠন খুব একটা শক্তিশালী ছিল না। কিন্তু মাঠে তার গতি, বল নিয়ন্ত্রণ, নিখুঁত ফিনিশিং এবং বিশেষত কাউন্টার অ্যাটাকে দুর্দান্ত দক্ষতা তাকে বিশ্বমানের গোলদাতায় পরিণত করেছিল। বহু মানুষের কাছে তিনি ছিলেন নায়ক, যদিও ম্যাচ ফিক্সিং কেলেঙ্কারিতে নাম জড়ানোয় সমালোচনাও পিছু ছাড়েনি।
ইতালির তুস্কানি অঞ্চলের প্রাতো শহরে জন্ম নেওয়া পাওলো রসি ছিলেন ভিট্টোরিও রসির ছোট ছেলে। তার বাবা ছিলেন স্থানীয় এক লন্ড্রিম্যান এবং অপেশাদার ফুটবলার। ছোটবেলা থেকেই রসির ফুটবল প্রতিভা নজর কাড়ে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি জুভেন্তাসে যোগ দেন এবং দুই বছর পর পথচলা শুরু করেন পেশাদার ফুটবলার হিসেবে।
ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে উইংয়ে খেলতেন রসি। কিন্তু বারবার চোট তার অগ্রযাত্রায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। হাঁটুর তিনটি অস্ত্রোপচারও করাতে হয় তাকে। জুভেন্তাস মনে করেছিল, হয়তো তিনি শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবলের চাপ সামলাতে পারবেন না। তাই তাকে ধারে (লোন) পাঠানো হয় কোমো ক্লাবে, যেখানে সিরি আ-তে তার অভিষেক হয়। ১৯৭৫-৭৬ মৌসুমে কোমোর হয়ে ছয় ম্যাচ খেলার পর সিরি বি’র ক্লাব লানেরোসি ভিচেঞ্জায় যোগ দেন তিনি। সেখানে দলের মূল স্ট্রাইকার চোটে পড়লে রসিকে সেন্ট্রাল ফরোয়ার্ড হিসেবে খেলানো হয়। আর তাতেই বদলে যায় তার ক্যারিয়ার।

ওই মৌসুমে ২১ গোল করে রসি সিরি বি’র সর্বোচ্চ গোলদাতা হন এবং ভিচেঞ্জাকে শীর্ষ লিগে তুলতে বড় ভূমিকা রাখেন। পরের মৌসুমে সিরি আ-তেও সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার পাশাপাশি অবিশ্বাস্যভাবে রানার্সআপ করতে সাহায্য করেন দলকে। এরপর আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতালির হয়ে ১৯৭৭ সালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে অভিষেক হয় রসির। পরের বছর (১৯৭৮) আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপেও তিনি দলে জায়গা ধরে রাখেন। সেখানে ফ্রাঙ্কো কাউজিও ও রবার্তো বেত্তেগার সঙ্গে তার সমন্বয় ইতালির আক্রমণভাগকে শক্তিশালী করে তোলে।
ফর্মে থাকা রসিকে স্থায়ীভাবে দলে রাখতে জুভেন্তাসকে প্রায় ১৭ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড দেয় ভিচেঞ্জা। যা ওই সময়ে বিশ্বরেকর্ড ট্রান্সফার ফি ছিল। কিন্তু চোটের কারণে তাকে হারিয়ে ভিচেঞ্জা পরে লিগ থেকে অবনমিত হয়। আর রসিও ধারে যোগ দেন পেরুজিয়ায়। ১৯৭৯-৮০ মৌসুমে ক্লাবটির হয়ে ১৩ গোল করলেও সেই সময়ই তিনি জড়িয়ে পড়েন কুখ্যাত ‘টোটোনেরো’ বেটিং কেলেঙ্কারিতে। অভিযোগ ছিল, আভেলিনোর বিপক্ষে ২-২ ড্রয়ের ম্যাচের আগে তিনি এক প্রতিপক্ষকে বলেছিলেন, ‘চাইলে ম্যাচটা ২-২ হতে পারে।’ পরে সেই ম্যাচে দুটি গোলও করেন তিনি।
যদিও ফিক্সিংয়ে অভিযুক্ত রসি সবসময় নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। নানা গুঞ্জন থাকলেও ইতালির আদালত তাকে দোষী সাব্যস্ত করেনি। তবুও তাকে নিষিদ্ধ করা হয় তিন বছরের জন্য। পরে ১৯৮২ বিশ্বকাপের ঠিক আগে সেই নিষেধাজ্ঞা কমিয়ে দেওয়া হয় এবং নাটকীয়ভাবে কোচ এনজো বেয়ারজট তাকে দলে ফেরান। যার জন্য সমালোচিত হয়েছেন এই ইতালিয়ান ফুটবল কিংবদন্তি ও কোচ।
এদিকে, দলে ফিরে বিশ্বকাপে রসির শুরুটা অবশ্য ভালো হয়নি। পরে ব্রাজিলের বিপক্ষে ঐতিহাসিক ৩-২ জয়ের ম্যাচে হ্যাটট্রিক করে তিনি রাতারাতি জাতীয় নায়কে পরিণত হন। এরপর পোল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে আরও দুটি গোল করেন। ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ইতালির হয়ে প্রথম গোলটিও আসে তার পা থেকে। ম্যাচটি ৩-১ ব্যবধানে জিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় আজ্জুরিরা। প্রথম চার ম্যাচে গোল না পেলেও শেষ ৩ ম্যাচে ৬ গোল করে রসি জিতে নেন গোল্ডেন বুট। একই বছর তিনি ব্যালন ডি’অরও শোকেসে পুরেছেন।

‘পাবলিতো’ নামেও পরিচিত ছিলেন রসি। যিনি বিশ্বকাপ জয়, টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়া এবং সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হওয়ার বিরল কীর্তি গড়েন। পরবর্তীতে তিনি আবারও ফিরে যান জুভেন্তাসে। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্লাবটির হয়ে দুটি লিগ শিরোপা ও ইতালিয়ান কাপ জেতেন। ১৯৮৪ সালে উয়েফা কাপ উইনার্স কাপ জেতে জুভেন্তাস। এক বছর পর হেইসেল স্টেডিয়াম ট্র্যাজেডির পরবর্তী ইউরোপিয়ান কাপ ফাইনালে লিভারপুলকে হারিয়ে ক্লাবটি প্রথমবারের মতো ইউরোপসেরার মর্যাদা পায়।
জুভেন্তাসে ৮৩ ম্যাচে ২৪ গোল করার পর ১৯৮৫ সালে রসি যোগ দেন এসি মিলানে। এরপর শেষ মৌসুম খেলেন হেলাস ভেরোনায়। ইতালি জাতীয় দলের হয়ে ৪৮ ম্যাচে ২০ গোল করা এই তারকা ১৯৮৬ বিশ্বকাপ দলে থাকলেও চোট ও মেক্সিকোর উচ্চতার কারণে মাঠে নামতে পারেননি। পরের বছরই তিনি ফুটবলকে বিদায় জানিয়ে দেন। পরে ইতালি ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে কোচিংয়ের প্রস্তাব পেলেও রাজি হননি রসি। বেছে নেন ভিন্ন পেশা, পরিচিতি পান টেলিভিশনের জনপ্রিয় ফুটবল বিশ্লেষক হিসেবে।
ব্যক্তিগত জীবন সবসময় আড়ালেই রাখতে চাইতেন রসি। বসবাস করতেন ভিচেঞ্জার কাছেই, যে শহর তার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। সাবেক সতীর্থ জিয়ানকার্লো সালভির সঙ্গে মিলে তিনি ‘রোসা এস্টেট এজেন্সি’ পরিচালনা করতেন। ২০০২ সালে ‘আই মেইড ব্রাজিল ক্রাই’ নামে আত্মজীবনী প্রকাশ করে জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় সাফল্যের কথা পুনরায় সামনে আনেন রসি। ২০১১ সালে ইতালির রিয়েলিটি শো ‘স্ট্রিক্টলি কাম ড্যান্সিং’-এ অংশ নিয়ে রসি আলোচনায় আসেন। ২০২০ সালে চিরবিদায় নেন খলনায়ক থেকে নায়ক বনে যাওয়া পাবলিতো।
এএইচএস

