আবহাওয়া, ভাষা, খাবার কিংবা অন্য যেকোনো বিষয়– সবদিক থেকেই ব্রাজিল ও স্কটল্যান্ডকে ভিন্ন দুই জগতের দেশ মনে হতে পারে। তবে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের উত্থানে স্কটল্যান্ডের সঙ্গে গভীর একটি সম্পর্ক রয়েছে। সেই দুটি দেশ বৃহস্পতিবার ভোর ৪টায় চলতি বিশ্বকাপে ‘সি’ গ্রুপের ম্যাচে মুখোমুখি হবে। নকআউট রাউন্ডে ওঠা কিংবা শীর্ষ অবস্থান নিশ্চিতে উভয়ের জন্যই ম্যাচটি গুরুত্বপূর্ণ।
ব্রাজিলে ফুটবলে বিস্তারে স্কটিশ পরিবারের জড়িত থাকার গল্পটি অনেকেরই জানা। ইংল্যান্ডে দীর্ঘ সময় কাটানোর পর চার্লস মিলার এক জোড়া ফুটবল বুট, দুটি চামড়ার বল, একটি পাম্প এবং ফুটবলের নিয়মাবলির একটি কপি নিয়ে ব্রাজিলে ফিরে আসেন। সে সময় যুক্তরাজ্যজুড়ে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল এই খেলা। তবে তুলনামূলক কম পরিচিত বিষয় হলো– সাও পাওলোতে জন্ম নেওয়া এই ফুটবল অগ্রদূতের পিতৃসূত্রে ছিল স্কটিশ বংশপরিচয়।
চার্লস মিলারের বাবা জন মিলারের জন্ম ১৮৪৪ সালের ১৩ জুন স্কটল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলীয় শহর ফেয়ারলিতে। সেখানেই তিনি পরিবারের সঙ্গে বেড়ে ওঠেন। জন মিলার ব্রাজিলে পাড়ি জমান ১৮৬০–এর দশকে। সেখানকার সাও পাওলো রেলওয়েতে কাজ করতেন তিনি। বড় ভাই অ্যান্ড্রুর সঙ্গে ব্রাজিলে আসা জনকে আকৃষ্ট করেছিল নিজ দেশে পাওয়া আয়ের চেয়ে বেশি উপার্জনের সম্ভাবনা।
জনের ঘরে ১৮৭৪ সালের ২৪ নভেম্বর সাও পাওলোতে জন্ম নেন চার্লস মিলার। ঘরেই তিনি ইংরেজি ভাষায় পড়তে-লিখতে শিখলেও, প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার জন্য নয় বছর বয়সে চার্লসকে ইংল্যান্ডে পাঠানো হয়। সেখানে তিনি বিভিন্ন খেলাধুলার সঙ্গে পরিচিত হলেও ফুটবলই হয়ে ওঠে তার সবচেয়ে প্রিয় খেলা। সেখানে তিনি সেন্ট মেরিস ও করিন্থিয়ান ফুটবল ক্লাবের হয়ে খেলে সুনাম অর্জন করেন। পরবর্তীতে করিন্থিয়ান ক্লাবই ব্রাজিলের বিখ্যাত ক্লাব করিন্থিয়ানস প্রতিষ্ঠার অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।

যুক্তরাজ্যে প্রায় এক দশক কাটানোর পর তিনি ব্রাজিলে ফিরে আসেন এবং ব্রিটিশ সম্প্রদায়ের সদস্যদের মধ্যে এমন একটি খেলার প্রচার শুরু করেন, যা তখনও ব্রাজিলের অধিকাংশ মানুষের কাছে অপরিচিত ছিল। ১৮৯৫ সালের ১৪ এপ্রিল সাও পাওলোর ভারজেয়া দো কারমো এলাকায় যে ম্যাচ আয়োজন করেন তিনি, সেটিকে ব্যাপকভাবে ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসের প্রথম ম্যাচ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সেই ম্যাচে চার্লস নিজেই সাও পাওলো রেলওয়ের কর্মীদের দলে খেলেন। এটি ছিল সেই একই প্রতিষ্ঠান, যেখানে তার বাবা কাজ করেছিলেন এবং পরবর্তীতে তিনি নিজেও কর্মরত ছিলেন। মিলারের দল গ্যাস কোম্পানির কর্মীদের দলকে ৪-২ গোলে পরাজিত করে। সাও পাওলো অ্যাথলেটিক ক্লাবের হয়ে খেলে চার্লস মিলার ১৯০২, ১৯০৩ ও ১৯০৪ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম তিনটি ক্যাম্পিওনাতো পাওলিস্তা শিরোপা জেতেন। সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন ১৯০২ ও ১৯০৪ সালে।

পরবর্তী কয়েক দশকে ফুটবল ব্রাজিলজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে পেশাদার রূপ লাভ করে, যা মিলারের প্রতিষ্ঠিত অপেশাদার ঐতিহ্য থেকে অনেক দূরে সরে যায়। বর্তমানে চার্লস মিলারের প্রতি সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধার নিদর্শন হলো তার নামে নামকরণ করা ‘প্রাসা চার্লস মিলার’। এখানেই অবস্থিত ব্রাজিলের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী স্টেডিয়াম পাকায়েম্বু, যা ১৯৫০ সালের ফিফা বিশ্বকাপের ম্যাচও আয়োজন করেছিল।
১৯৮২ সালের বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ব্রাজিলিয়ান তারকা জিকোর সেই দুর্দান্ত ফ্রি-কিক এখনও ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল। দুই দল এখন পর্যন্ত চারটি বিশ্বকাপ মুখোমুখি হয়েছে। এর মধ্যে জিকোর অসাধারণ ফ্রি-কিকে দেওয়া গোলের ম্যাচ অন্যতম স্মরণীয়, যেখানে ব্রাজিল ৪-১ গোলে স্কটল্যান্ডকে হারিয়েছিল।
এএইচএস

