World Cup Football Field

বিজ্ঞাপন

এবারের বিশ্বকাপে গোলবন্যা, পেছনের রহস্য জানালেন গবেষকরা

এবারের বিশ্বকাপে গোলবন্যা, পেছনের রহস্য জানালেন গবেষকরা

২০২৬ বিশ্বকাপে গোলের বন্যা যেন থামছেই না। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ৬৪ ম্যাচে হয়েছিল ১৭২ গোল, ম্যাচপ্রতি গড় ছিল ২.৬৮। আর এবার ৫৪ ম্যাচ শেষেই গোলসংখ্যা ১৬১, যেখানে গড় প্রায় তিনের কাছাকাছি।

শুধু ফরোয়ার্ডদের দুর্দান্ত ফিনিশিং নয়, গোলকিপারদের একের পর এক অপ্রত্যাশিত ভুলও এই গোলবন্যার বড় কারণ হয়ে উঠছে। আলজেরিয়ার গোলরক্ষক লুকা জিদানই যেমন দুই ম্যাচে হজম করেছেন পাঁচ গোল। লিওনেল মেসি ও জর্ডানের নিজার আল-রেশদানের শট তার হাতের আঙুল ছুঁয়ে জালে জড়িয়েছে এমনভাবে, যা সাধারণত এই পর্যায়ের গোলরক্ষকদের ক্ষেত্রে খুব কমই দেখা যায়। একই চিত্র সেনেগালের এদুয়ার্দো মেন্দি কিংবা ইরাকের আহমেদ বাসিলের ক্ষেত্রেও। বলের লাইনে হাত ছোঁয়ালেও শেষ পর্যন্ত গোল ঠেকাতে পারছেন না তারা। এত বেশি গোল হওয়ার রহস্য কি এটাই?

ইংল্যান্ডের সাবেক গোলরক্ষক জো হার্ট অবশ্য সন্দেহের তীর ছুড়েছেন এবারের বিশ্বকাপের অফিসিয়াল বল অ্যাডিডাস ‘ট্রিওন্ডা’র দিকে। বিবিসির এক বিশ্লেষণে তিনি বলেন, ‘পা থেকে বের হওয়ার পর বলটি যতটা গতিশীল মনে হয়, গোলরক্ষকদের কাছে পৌঁছানোর সময় তার চেয়েও বেশি গতিতে ছুটে আসছে। বলের গতি বুঝতে গোলরক্ষকদের বেশ বেগ পেতে হচ্ছে।’

হার্টের এই পর্যবেক্ষণ এবার বৈজ্ঞানিক ভিত্তিও পেয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল উইমেনস ইউনিভার্সিটি এবং জাপানের ইউনিভার্সিটি অব সুকুবোর একদল গবেষক উইন্ড টানেলে ট্রিওন্ডা বল নিয়ে পরীক্ষা চালিয়ে প্রকাশ করেছেন একটি গবেষণা প্রতিবেদন। গবেষণার শিরোনাম— ‘ওরিয়েন্টেশন-ডিপেন্ডেন্ট ড্র্যাগ ক্রাইসিস অ্যান্ড ফ্লাইট রেসপন্স অব দ্য ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ ম্যাচ বল ট্রিওন্ডা’

গবেষণায় উঠে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—‘ড্র্যাগ ক্রাইসিস’। সাধারণত বাতাসে কোনো বল ছুটে গেলে তার গতির বিপরীতে একটি বাধা বা ‘ড্র্যাগ’ কাজ করে, যা বলের গতি ধীরে ধীরে কমিয়ে দেয়। গোলরক্ষকেরা বছরের পর বছর অনুশীলনের মাধ্যমে এই স্বাভাবিক গতিপথ ও গতি সম্পর্কে ধারণা তৈরি করেন।

কিন্তু ট্রিওন্ডা একটি নির্দিষ্ট গতিতে পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি বদলে যায়। তখন বলের চারপাশের বায়ুপ্রবাহ হঠাৎ মসৃণ অবস্থা থেকে উত্তাল বা এলোমেলো অবস্থায় রূপ নেয়। ফলে বলের পেছনে তৈরি হওয়া বায়ু-প্রতিরোধ দ্রুত কমে যায়। যে কারণে বলটি গতি হারানোর বদলে উল্টো আরও দ্রুতগতিতে ছুটে যায়। আর ঠিক এই অপ্রত্যাশিত অতিরিক্ত গতিই গোলরক্ষকদের হিসাব এলোমেলো করে দিচ্ছে।

ট্রিওন্ডার সবচেয়ে আলোচিত বৈশিষ্ট্য হলো এর চার-প্যানেলের নকশা। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের ‘আল রিহলা’ বলে যেখানে ছিল ২০টি প্যানেল, সেখানে এবার মাত্র চারটি প্যানেল ব্যবহার করেছে অ্যাডিডাস। বলের গভীর খাঁজ এবং প্যানেল সংযোগস্থলের নকশার কারণেই তুলনামূলক কম গতিতেও ড্র্যাগ ক্রাইসিস তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন গবেষকেরা। ফলে গোলরক্ষকেরা বলের যে গতি অনুমান করেন, বাস্তবে বল তার চেয়ে অনেক বেশি দ্রুতগতিতে তাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বলের কোন অংশে শট নেওয়া হচ্ছে—খাঁজের অংশে নাকি সমতল প্যানেলে—এবং ম্যাচটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে কত উচ্চতায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তার ওপরও বলের আচরণ পরিবর্তিত হতে পারে। উচ্চতা যত বেশি হবে, ড্র্যাগ ক্রাইসিসের প্রভাব তত কম দেখা যাবে।

অ্যাডিডাসের দাবি, ট্রিওন্ডাকে চূড়ান্ত করার আগে ল্যাবরেটরিতে ৩০০ বারেরও বেশি পরীক্ষা চালানো হয়েছে, যাতে এর গতিপথ আরও অনুমানযোগ্য হয়। তবে মাঠের বাস্তবতা বলছে, গোলরক্ষকদের জন্য এই বল এখনও বড় এক ধাঁধা। বিশ্বকাপ যত নকআউট পর্বের দিকে এগোবে, গোলরক্ষকদের সামনে চ্যালেঞ্জও তত বাড়বে। এখন দেখার বিষয়, ট্রিওন্ডার এই রহস্য ভেদ করে তারা নিজেদের জাল কতটা সুরক্ষিত রাখতে পারেন।

এইচজেএস